kalerkantho


স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার শপথ

তায়েফুর রহমান, সাভার   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার শপথ

মহান স্বাধীনতা দিবসে গতকাল জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার শপথ। ছবি : মঞ্জুরুল করিম

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার শপথের মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার ৪৬তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদ্‌যাপন করেছে বাঙালি জাতি। সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার দ্রুত সম্পন্ন ও স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবি গতকালও ছিল সবার মুখে মুখে।

গৌরবের এই দিনে জাতি সশ্রদ্ধচিত্তে একাত্তরের শহীদদের স্মরণ ও ফুল দিয়ে তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। পাশাপাশি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া সব জাতীয় নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের প্রতি।

স্বাধীনতা দিবস পালনের মূল কেন্দ্র সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ছিল হাতে হাতে লাল-সবুজের পতাকা, রং-বেরঙের ফুল এবং পতাকার রঙের পোশাক পরা মানুষের ঢল। ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনার পর রক্তিম সূর্য পূর্ব আকাশে উঁকি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

ভোর ৫টা ৫৬ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শহীদ বেদিতে ফুল দেওয়ার সময় বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। তিন বাহিনীর সুসজ্জিত একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেয়। এ সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

এরপর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে স্মৃতিসৌধ ও বঙ্গবন্ধু স্থাপিত জাতীয় স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর ফলকে শ্রদ্ধা জানান শেখ হাসিনা।

পরে প্রধান বিচারপতি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, সাত বীরশ্রেষ্ঠর পরিবারের সদস্য, কূটনীতিক ও সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খুলে দেওয়া হয় স্মৃতিসৌধ এলাকার মূল ফটক। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদি।

সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে নেতাকর্মীদের নিয়ে স্মৃতিসৌধের মূল বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এ সময় তাঁর সঙ্গে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

গত বছরের ৩ জানুয়ারি থেকে টানা তিন মাস অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি দিয়ে গুলশানের কার্যালয়ে অবস্থানের সময় স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধ যাননি খালেদা জিয়া। গত বছর তাঁর পক্ষে দলের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ফুল দেওয়া হয়েছিল।

ভাই জি এম কাদেরসহ দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘দেশ মুক্তিযুদ্ধের ধারা থেকে দূরে চলে গেছে। দেশ এখন সাম্রাজ্যবাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ব্যাংকেও এখন লুটপাট হচ্ছে। ’

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘আমরা যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে যুদ্ধ করেছি, দেশ স্বাধীন করেছি, সেই লক্ষ্যের দিকে দেশ এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যেও এক শ্রেণির রাজনৈতিক দল পাকিস্তানপন্থী রাজনীতি করছে। ’ শ্রদ্ধা জানাতে আসা মুক্তিযোদ্ধা লুত্ফর রহমান বলেন, ‘যে প্রত্যাশা নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম, সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সব দল একত্র হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। ’

শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। কিন্তু দেশে এখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়নি। ’

মহাসচিব ওমর ফারুকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং একাংশের সভাপতি শাবান মাহমুদের নেতৃত্বে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে।

সকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে গণকল্যাণ ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ও সীমা জেনারেল হাসপাতালের সহযোগিতায় বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি প্রফেসর ডা. ইকবাল আর্সলান।

ভোর থেকে শুরু হয়ে বিকেল পর্যন্ত জাতীয় স্মৃতিসৌধে ছিল লাখো মানুষের ঢল। স্মৃতিসৌধের শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, গণবিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মজীবী নারী, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ইত্যাদি।


মন্তব্য