kalerkantho

খাসজমির দলিল তৈরি করে দিয়ে প্রতারণা

নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খাসজমির দলিল তৈরি করে দিয়ে প্রতারণা

খাসজমি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে এলাকাবাসীর কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ডুমুরিয়ার ইউনিয়ন পর্যায়ের এক আওয়ামী লীগ নেতা। ভুক্তভোগীরা সম্প্রতি এলাকার চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করলে তিনি এর সত্যতা পেয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে চিঠি দিয়েছেন।

এই ব্যক্তির নাম আবু বকর সরদার। ডুমুরিয়া উপজেলার খরসঙ্গ গ্রামে তাঁর বাড়ি। তিনি মৃত আবদুল হামিদ সরদারের তিন ছেলের মধ্যে দ্বিতীয়। এলাকার মানুষ তাঁকে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা বলে জানে। অবশ্য তিনি নিজেকে একজন প্রভাবশালী 'মুহুরি' (আইনজীবীর সহকারী) বলে পরিচয় দেন। আওয়ামী লীগের ডুমুরিয়া উপজেলা শাখার সহসভাপতি মোস্তফা কামাল খোকন তাঁর চাচাতো ভাই। নিজে দলের রুদাঘরা ইউনিয়নের ওয়ার্ড শাখার সহসভাপতি।

রুদাঘরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সম্প্রতি ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দেওয়া এক চিঠিতে লিখেছেন, আবু বকর ওরফে আলী আকবর সরদার নিজেকে মুহুরি পরিচয়ে এলাকার দরিদ্র অসহায় ভূমিহীনদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এদের মধ্যে মধুগ্রামের বেলায়েত মোল্লার ছেলে হাফিজুর মোল্লার কাছ থেকে ৮০ হাজার, পিপরাইল গ্রামের সওকাত আলী বিশ্বাসের মেয়ে ছটু বুড়ির কাছ থেকে ৭৩ হাজার, রঘুনাথপুর গ্রামের হেতম গাজীর ছেলে মকবুল গাজীর কাছ থেকে ৬০ হাজার, রঘুনাথপুর গ্রামের সুখচান্দ মোড়লের ছেলে জিয়া মোড়লের কাছ থেকে ৩৫ হাজার, মধুগ্রামের মোজাহার বিশ্বাসের ছেলে সালাম বিশ্বাস ও পিপরাইল গ্রামের সওকাত বিশ্বাসের ছেলে আসলাম বিশ্বাসের কাছ থেকে ৬২ হাজার টাকা মিলে তিন লাখ ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

আবু বকর এই টাকার বিনিময়ে ওই সব ব্যক্তিকে খাসজমির দলিল হস্তান্তর করেছেন। সে সব দলিলে চেয়ারম্যান, সহকারী কমিশনার (ভূমি), নির্বাহী কর্মকর্তা, সাব-রেজিস্ট্রার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ (রাজস্ব) সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর এবং সিলমোহরও ব্যবহার করেছেন।

ভুক্তভোগী মধুগ্রামের হাফিজুর মোল্লা বলেন, 'আবু বকর আমাকে খাসজমি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৮০ হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে আমাকে ১০৯৭/১৪ নম্বর কবুলিয়াত, ১২২৪/১৪ নম্বর বন্দোবস্ত মামলা ও জেলা প্রশাসকের ২২৩০/১৪ পত্রের সূত্র সংবলিত মধুগ্রাম মৌজার ৫০ শতাংশ জমি বরাদ্দ দলিল দিয়েছেন। ওই দলিলের নামপত্তনপত্র এবং দাখিলাও বকর আমাকে দেন। সেই দাখিলা নিয়ে আমি তহশিল অফিসে হাল সনের খাজনা পরিশোধ করতে গেলে তহশিলদার জানান, দাখিলাটি সঠিক নয়। আমি বিষয়টি নিয়ে বকরকে জানালে তিনি আমাকে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দেন। পরে আমি খুলনার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৩১৫/১৪ নম্বর মামলা করি।'

আবু বকর বলেন, 'আমি আদালতে উকিলের মুহুরি হিসেবে কাজ করি।' কোন আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ করেন এমন প্রশ্নের তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব দেননি। জাল দলিল ও অর্থ গ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, 'কারো কাছ থেকে আমি অর্থ গ্রহণ করে খাসজমির দলিল দেইনি। এটি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।' তিনি নিজেকে রুদাঘরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড শাখা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বলে দাবি করেন। অবশ্য, আওয়ামী লীগ ডুমুরিয়া উপজেলা শাখার সহসভাপতি ও রুদাঘরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল খোকন বলেন, 'আবু বকর আমার জ্ঞাতি ভাই। তার কর্মকাণ্ড ভালো না। সে আওয়ামী লীগের কোনো পদে নেই।'

রুদাঘরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম আমানুল্লাহ বলেন, অর্থ গ্রহণ করে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে আবু বকর খাসজমির দলিল হস্তান্তর করেছে। ওই সব জমির দলিল জালিয়াতি করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান বলেন, জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে জনৈক আবু বকর বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে খাসজমির দলিল দেওয়ার বিষয়ে হাফিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তি আদালতে মামলা করেছেন।

ডুমুরিযা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ সামছুদ্দৌজা বলেন, 'রুদাঘরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম আমানুল্লাহ জনৈক আবু বকর নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কতিপয় প্রতারিত ব্যক্তির অভিযোগপত্রের সূত্র ধরে একটি দাপ্তরিক পত্র দিয়েছেন। সে আলোকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

 

মন্তব্য