kalerkantho

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনে ক্লিপ খুলছে দুর্বৃত্তরা

আনসাররা 'নিধিরাম সর্দার'

আবদুর রহমান, কুমিল্লা (দক্ষিণ)   

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আনসাররা 'নিধিরাম সর্দার'

লাকসাম-চট্টগ্রাম রেললাইনের বেশির ভাগ ক্লিপ এভাবেই রাতের আঁধারে খুলে রাখে দুর্বৃত্তরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লার লাকসাম ও নাঙ্গলকোট অংশে লাইনের স্লিপারের ক্লিপ খুলে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। গত বছরের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে এবং চলতি রাজনৈতিক অস্থিরতায় ওই অংশে অন্তত দুই হাজার ক্লিপ খোলা হয়েছে। চলতি বছর দুটি এবং গত বছর পাঁচটি রেলের বেশ কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। লাকসাম অঞ্চলের প্রায় ২০০ কিলোমিটার রেলপথ পাহারায় ৮৭২ জন আনসার সদস্য নিয়োগ করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে আনসার সদস্যরা জানিয়েছেন, লাঠি ও বাঁশি নিয়ে তাঁরা নিজেরাই নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছেন।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের লাকসাম জংশন সূত্রে জানা গেছে, লাকসাম, নাওটি, নাঙ্গলকোট, হাসানপুর, গুণবতী, শর্শদি, ফেনী, মিরসরাইসহ বিভিন্ন স্থানে রাতের অন্ধকারে রেললাইনের স্লিপারের ক্লিপ, ফিশপ্লেটের নাট-বল্টু খুলে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। তবে সবচেয়ে বেশি ক্লিপ খুলে নেওয়া হয়েছে এ রুটের লাকসাম, নাঙ্গলকোট অংশে। গত বছর ও চলতি বছরে অন্তত দুই হাজার ক্লিপ খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। এতে প্রতিদিন ওই পথে চলাচলকারী কয়েক হাজার যাত্রী রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকিতে। গত বছরে নাঙ্গলকোট ও লাকসাম এলাকায় দুটি যাত্রীবাহী ও তিনটি মালবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। গত ১০ জানুয়ারি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট রেলস্টেশনের অদূরে দুর্বৃত্তরা স্লিপারের ক্লিপ না থাকায় রেললাইন কেটে ফেলে। এতে মহানগর গোধূলি ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়। গত রবিবার রাত ৩টার দিকে লাকসাম-চট্টগ্রাম রুটের মিরসরাই এলাকায় ১২৬ ফুট রেলপথের ক্লিপ খুলে ফেলায় ময়মনসিংহ থেকে চট্টগ্রামগামী নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন ও দুটি বগির লাইনচ্যুতি ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন যাত্রী আহত হয়।

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, দেশে হরতাল-অবরোধের নামে নাশকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এ রেলপথের বিভিন্ন স্থানে ক্লিপগুলো খুলে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। আবার এক শ্রেণির টোকাই, স্থানীয় ভাঙারি ব্যবসায়ীদের লোকজন রেললাইনে ব্যবহৃত লোহার ক্লিপ ও নাট-বল্টু খুলে নিচ্ছে।

নাঙ্গলকোট উপজেলার হাসানপুর গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় সাংবাদিক আলাউদ্দীন বলেন, 'রেললাইনে ক্লিপ না থাকার বিষয়ে স্থানীয় স্টেশনমাস্টারসহ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বেশ কয়েকবার অবহিত করেছি; কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক যুবক বলেন, 'গত বছর থেকে দেশব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতায় রেলে নাশকতার জন্য এই বিশাল এলাকাজুড়ে রেললাইনের ক্লিপগুলো খুলে ফেলছে দুর্বৃত্তরা।'

লাকসাম রেলওয়ে জংশন সূত্র জানায়, লাকসাম রেলওয়ে থানা অঞ্চলের অধীনে চট্টগ্রাম মিরসরাইয়ের দুমব্রিজ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শালদা নদী, লাকসাম-নোয়াখালী এবং লাকসাম-চাঁদপুর পর্যন্ত প্রায় ২০০ কিলোমিটার রেললাইন। অবরোধে এই রেলপথে নাশকতা ঠেকাতে ৮৭২ জন আনসার সদস্য নিয়োগ করা হয়েছে। এ আনসার সদস্যরা প্রতি রাতে পালা করে রেলপথ পাহারা দিচ্ছেন। আনসার সদস্যদের তদারকিতে রয়েছে লাকসাম রেলওয়ে পুলিশ। তবে আনসার বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রধারী কোনো বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করা হয়নি। এতে রেলে নাশকতা রোধে কাজ করা আনসার সদস্যরা নিজেরাই রয়েছেন মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকিতে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে লাকসাম-নোয়াখালী ও লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলপথ পাহারায় নিয়োজিত কয়েকজন আনসার সদস্য বলেন, 'আমাদের সঙ্গে কোনো অস্ত্র নেই। শুধু বাঁশের লাঠি ও বাঁশি হলো একমাত্র সম্বল। তাই রাতে ডিউটি করার সময় কিছুটা আতঙ্কে থাকি। তবে পুলিশের কোনো সদস্য আমাদের সঙ্গে থাকলে ডিউটি করতে ভালো লাগত।'

এ ব্যাপারে লাকসাম রেলওয়ে থানার ওসি আহসান হাবিব বলেন, 'পুরো এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করে নাশকতা ঠেকাতে রেলওয়ে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। তবে আনসার সদস্যদের সঙ্গে অস্ত্রধারী কোনো সদস্য না থাকায় তারা কিছুটা ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছে।' স্লিপারের ক্লিপ খুলে নেওয়ার প্রসঙ্গে লাকসাম রেলওয়ে জংশনের সিনিয়র উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) লেয়াকত আলী মজুমদার বলেন, 'গত বছর দেশজুড়ে নাশকতার সময় লাকসাম-চট্টগ্রাম রুটের বিভিন্ন স্থানে ক্লিপগুলো দুর্বৃত্তরা খুলে ফেলেছিল। পরে আমরা ওয়েল্ডিং করে বা ক্লিপ লাগিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছি।'

 

মন্তব্য