kalerkantho


রোহিঙ্গা গণহত্যায় জড়িত কারা?

সিডও কমিটির প্রশ্নবাণে চুপ মিয়ানমার

মেহেদী হাসান    

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১০:৫১



সিডও কমিটির প্রশ্নবাণে চুপ মিয়ানমার

রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা কারা চালিয়েছে, নির্মূল অভিযানে মিয়ানমারের কোন কোন সামরিক ইউনিট অংশ নিয়েছে এবং তাদের অধিনায়কদের নাম-পরিচয় কী? মিয়ানমারকে এসব প্রশ্নের মুখোমুখি করেছেন ‘নারীর প্রতি সহিংসতা বিলোপবিষয়ক কমিটির (সিডও)’ বিশেষজ্ঞরা। গতকাল শুক্রবার রাত ৮টা থেকে টানা তিন ঘণ্টা জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে চলা সিডও কমিটির অধিবেশনে এসব প্রশ্নবাণের জবাবে রীতিমতো মিথ্যাচার করেছে মিয়ানমার প্রতিনিধিদল।

মিয়ানমার প্রতিনিধিদলের নেতা মিয়াত আয়ে বলেন, ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ (নির্মূল অভিযান) রুটিন কাজ। আমি সামরিক বাহিনীর লোক নই। এ বিষয়ে তথ্য জানার সুযোগও আমাদের নেই। আর এ বিষয়টি সিডওর সঙ্গে সম্পৃক্তও নয়।’

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে জেনেভায় জাতিসংঘের দপ্তরগুলোতে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি চ মো টো বলেন, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান রাখাইনে ‘গণহত্যা’ শব্দটি সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। গণহত্যা কি না এটি বলতে পারেন আদালত।

রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন প্রসঙ্গে মিয়ানমারের প্রতিনিধি বলেন, ‘এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছে। তাদের জুলাইয়ের মধ্যে তথ্য দিতে হবে। এখন তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। সরকার ওই কমিশনের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে।’

অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে সিডও কমিটির বিশেষজ্ঞ এন হায়দার এল আদাল মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের উদ্দেশে বলেন, ওই দলে সামরিক বাহিনীর সদস্য আছেন। তিনি এ বিষয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে পারেন।

এরপর মিয়ানমার প্রতিনিধিদলের নেতা ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী মিয়াত আয়ে প্রশ্নগুলো লিখিত আকারে চাইলে সিডও কমিটির সভাপতি জানান, অধিবেশনে মুখে প্রশ্ন করাই রীতি। মিয়ানমার প্রতিনিধিদলের নেতা তাঁর সমাপনী বক্তব্যে সিডও সদস্য ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাঁর দেশের বেসামরিক সরকারের সীমাবদ্ধতা বোঝার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানে সীমাবদ্ধতা আছে।

সিডও কমিটির বিশেষজ্ঞদের অনেক মন্তব্যকে ‘অভিযোগ’ ও ‘অতিরঞ্জিত’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব প্রশ্ন মিয়ানমার গ্রহণ করতে পারে না। সিডও কমিটির বিশেষজ্ঞ অরুণা দেবী নারায়ণের প্রশ্ন ছিল, মিয়ানমারের বিচারব্যবস্থা কতটা স্বাধীন? বেসামরিক আদালত কি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর আদৌ বিচার করতে পারে? মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা ইতিবাচক উত্তর দেন।

সিডও কমিটির বিশেষজ্ঞ বি রানা রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চান। মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক সান সান আয়ে বলেন, নারী হিসেবে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তাঁর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ষণ প্রমাণের জন্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডাক্তারি পরীক্ষা করতে হয়। তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ করা হচ্ছে। 

সিডও কমিটির বিশেষজ্ঞ ডি লেইনারটে বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকার কী করছে সে বিষয়ে তিনি জানতে চান। সিডও কমিটির বিশেষজ্ঞ এল শালাল বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ব্যাপক বিধিনিষেধের শিকার হতে হয়। বিশেষজ্ঞ হায়দার এল আদাল বলেন, ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইনে আরো অন্তত দুই লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর এমন সহিংসতা গত তিন দশকে অন্তত আরো দুবার হলেও সেগুলোর সুরাহা হয়নি।

হায়দার এল আদাল বলেন, নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করা হয়েছে। নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমার যে উত্তর দিয়েছে তা যথার্থ নয়। চলাফেরার অধিকার না থাকা নিয়ে উদ্বেগ জানানো যৌক্তিক। মিয়ানমার বলেছে, আইন অনুযায়ী তাদের সব নাগরিক অধিকার পায়। মিয়ানমার প্রতিনিধিদল শুরুতে তাদের দেশের সবার সমান অধিকার, শান্তি, সম্প্রীতির বিবরণ দিলেও বিশেজ্ঞদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছে। কখনো তারা প্রশ্ন এড়ানোর চেষ্টা করেছে সময়স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে। আবার কখনো বলেছে, প্রস্তুতি নিয়ে আসেনি তারা। তবে গত রাতের পুরো অধিবেশনে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের বদলে ‘মুসলমান’ বলেছেন মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা।



মন্তব্য