kalerkantho


সড়কে দুর্ঘটনারোধে সরকার গঠিত কমিটি নিয়ে সংসদে প্রশ্ন

'বদিকে দিয়ে মাদক আর শাজাহান খানকে দিয়ে সড়ক নিয়ন্ত্রণ কতটা সক্ষম হবে?'

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৮:২১



'বদিকে দিয়ে মাদক আর শাজাহান খানকে দিয়ে সড়ক নিয়ন্ত্রণ কতটা সক্ষম হবে?'

সড়কে দুর্ঘটনারোধে সুপারিশমালা প্রণয়নে সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানকে প্রধান করে গঠিত ১৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি নিয়েও সংসদে প্রশ্ন ওঠেছে। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য মো. ফখরুল ইমাম সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, ‘বদিকে দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ, শাজাহান খানকে দিয়ে সড়ক নিয়ন্ত্রণ। গতবার শাজাহান খানের একটা হাসি নিয়ে কতকিছু ঘটলো। সেই শাজাহান খানকে প্রধান করে গঠিত কমিটি সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা সক্ষম হবে?’

এই প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, সড়ক দুর্ঘটনারোধে সুপারিশমালা প্রণয়নের জন্য শাজাহান খানকে প্রধান করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল রবিবারের বৈঠকে যখন শাজাহান খানের নাম প্রস্তাব করা হয়, তখন কেউ কিন্তু বিরোধিতা করেননি। তার নেতৃত্বে আরো ১৪ জন সদস্য রয়েছেন। এখানে ব্যক্তি কোনো বিষয় নয়। অতীতে কোনো ব্যক্তির কারণে কোনো সমস্যার উদ্ভব হয়েছে কি না সেটা আমি দেখব না। আমি দেখব সড়কে শৃঙ্খলা আনয়নে ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কমিটি কি সুপারিশ তৈরি করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করবো। 

আজ সোমবার বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এই আলোচনা হয়। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে প্রশ্ন উত্থাপনকারী মো. ফখরুল ইমামের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘দেখুন না, আপনি যতটুকু আশা করছেন তার চেয়েও ভালো রিপোর্ট আসতে পারে।’ পরে সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে সরকার দলীয় এমপি শামীম ওসমান এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘শাজাহান খান একজন সম্মানিত ব্যক্তি। তার হাসির জন্য ঘটনা ঘটেছে নাকি ঘটনা ঘটানো হয়েছিল, সেটা দেখার বিষয়।’

সরকারি দলের সদস্য সাইফুজ্জামানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ডিভাইডারই একমাত্র সমাধান নয়। এখানে চালক, পথচারী ও যাত্রীদের সচেতনতাও জরুরি। কারণ রাস্তায় দেখা যায় ফুটওভার ব্রিজ থাকার পরেও ডিভাইডার দিয়ে লাফ দিয়ে মানুষ রাস্তা পার হচ্ছেন। মহিলারা বাচ্চা কোলে নিয়ে রাস্তা পার হয়। এমনকি ফ্লাইওভারের এপাশ থেকে ওপাশে হামাগুড়ি দিয়ে মানুষ পার হচ্ছে। মানুষ সড়কে শৃঙ্খলা মানছে না। মানুষের বিবেকটা এখানে খুব জরুরি। সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি কমিটিও করা হয়েছে।

একই প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্য যারা ঢাকার রাস্তায় চলাচল করেন তারা দেখবেন মানুষ মোবাইলে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হচ্ছেন। এরমধ্যে গাড়ি এসে চাকায় পিষ্ট করে দিচ্ছে। এখানে কী শুধু চালককে দায়ী করবেন? অনেক গাড়িচালক ট্রাফিক সিগনাল মানেন না। ভিআইপি হয়ে অনেকে রং সাইডে গাড়ি নিয়ে যান। এটা ঠিক নয়। ভিআইপিরা তো অসাধারণ, তারা যদি রং সাইডে চলেন তাহলে সাধারণ মানুষ কেন রং সাইডে যাবে না! মন্ত্রী জানান, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে তার মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন যে, সকল মহাসড়কে ফোরলেনের পাশাপাশি বাইলেন ও ডিভাইডার নির্মাণ করতে হবে। সড়ক মন্ত্রণালয় সেইভাবেই কাজ করছে।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শহিদ ইসলামের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের জানান, প্রধানমনত্রীর নির্দেশনায় বিশেষ উদ্যোগে চলমান ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রান্সজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের উত্তরা ৩য় পর্ব থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশ এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত সম্পূর্ণ অংশ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের নিমিত্ত সংশোধিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সংশোধিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এগিয়ে চলছে।

একই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে উত্তরা ৩য় পর্ব থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ২০ দশমিক ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৬ স্টেশন বিশিষ্ট উভয়দিকে ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহনে সক্ষম আধুনিক, সময় সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ চালিত এলিভেটেড ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট নির্মাণের লক্ষ্যে ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৬) বা বাংলাদেশের প্রথম মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১২-২০২৪ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য গ্রহণ করা হয়। এটা একটি ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত প্রকল্প। তিনি আরো জানান, প্রাক্কলিত মোট প্রকল্প ব্যয় ২১ লাখ ৯৮ হাজার ৫০৭ কোটি ২১ লাখ টাকা। যার মধ্যে জিওবি ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৪৮ কোটি টাকা ও প্রকল্প সাহায্য (পিএ) ১৬ লাখ ৫৯ হাজার ৪৫৯ কোটি ২১ লাখ টাকা।

সরকার দলীয় সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের জানান, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ তে পরিবার প্রতি গাড়ির সংখ্যা সিলিং নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা কোনো ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান বা কোনো এলাকার জন্য মোটরযান রেজিস্ট্রেশনের সংখ্যা বা সীমা নির্ধারণ করতে পারবে। এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মেট্রোরেল, বিআরটি ইত্যাদি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বাস রুট ফ্রাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনা শিগগিরই বাস্তবায়ন হবে। এসব পদ্ধতি চালু হলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যায়।

সরকার দলীয় এমপি শরিফুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের জানান, ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় নগরীতে যাওয়ার প্রধান রাস্তা মহাস্থান-শিবগঞ্জ-আমতলী মহাসড়কটি প্রশস্তকরণের প্রকল্প গ্রহণের সম্ভাব্যতার সমীক্ষার কাজ চলছে। ভারী যানবাহন চলাচলের ফলে সৃষ্ট কম্পন মহাস্থানগড়ের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় এ বিষয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর বিকল্প একটি সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে শিবগঞ্জ উপজেলাকে সদরের সাথে সংযুক্ত করে প্রকল্প গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে।

বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকার প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী জানান,  চার লেন বিশিষ্ট কাঁচপুর ব্রিজ থেকে মেঘনা ব্রীজ পর্যন্ত মহাসড়কের পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য বাই-লেন নির্মাণের পরিকল্পনা ইতোমধ্যে করা হয়েছে। বর্তমানে জরিপের কাজ চলছে। 

প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে রাতে সংসদের কার্যপ্রণালী ২৭৪ বিধিতে ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দিতে গিয়ে সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান জাতীয় পার্টি দলীয় এমপি ফখরুল ইমামের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। একইসঙ্গে তার প্রশ্নকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, মাদক ও সড়ক দুর্ঘটনা এক করে আমার বিষয়ে ফখরুল ইমাম যে বক্তব্য রেখেছেন তা অত্যন্ত নিন্দনীয়।  গত সাড়ে চার বছরে একটা লঞ্চ ডুবি হয়নি। আগে প্রতিবছর হতো। ফখরুল ইমামকে সাহেবকে একদিন এখানে দাঁড়িয়ে বলতে হবে তার বক্তব্য কতবড় ভুল ছিলো বা উদ্দেশ্য প্রণোদিত ছিলো। 

সংসদ সদস্য শাজাহান খান বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে শ্রমিকদের নিয়ে রাজনীতি করি। তাই তাদের নিযে কিছু বললে আমার আঘাত লাগে। তিনি আরো বলেন, ২০১৩ সালে গার্মেন্ট নিয়ে যখন জ্বালাও পোড়াও হচ্ছিলো তখন প্রধানমন্ত্রী আমাকে দায়িত্ব দেন। আমি তখন শ্রমিকদের সংগঠিত করে কাজ করেছি। এর ফলে ২০১৩ সালের পর গার্মেন্টস সেক্টরে বড় ধরণের কোন জ্বালাও পোড়াও হয়নি। 

এসময় জাতীয় পার্টি ও বিএনপি শাসনামলের নানা চিত্র তুলে ধরে সাবেক মন্ত্রী বলেন, দুর্ঘটনা একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে এটা ভাবা ঠিক হবে না। পৃথিবীর কোন দেশে দুর্ঘটনা হয় না এমনটি বলা যাবে না। তবে এখন দুর্ঘটনা অনেক কমে এসেছে। আরো দুর্ঘটনা কমে আসবে। তিনি আরো বলেন, কমিটি গঠিত হয় যে বৈঠকে সেখানে আমাকে দায়িত্ব দেয়ায় কেউ তো প্রতিবাদ করেনি। বৈঠকে অনেক মন্ত্রী বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। কাজ করে আমি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে চাই, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালক দায়ি-এটা ঠিক নয়। আরিচা রোডে সমাজকল্যাণ সচিব সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন। সে রিপোর্ট আমার কাছে আছে। ওই দুর্ঘটনায় চালক দায়ি নয়। তাহলে এই দুর্ঘটনার দায়িত্ব কার হবে। এরপরও যদি ওই চালককে দায়ি করা হয় এটা ঠিক নয়। তিনি ফখরুল ইমামকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করার দাবি জানান। তা না হলে ওই বক্তব্য এক্সপাঞ্চ করার জন্য স্পিকারের প্রতি অনুরোধ জানান।



মন্তব্য