kalerkantho


এক ‘বিশ্ব প্রতারক’ নাটকীয়ভাবে ধরা

এস এম আজাদ    

১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ১০:৩৭



এক ‘বিশ্ব প্রতারক’ নাটকীয়ভাবে ধরা

প্রকৃত নাম ইব্রাহিম খলিল ওরফে মামুন। তবে ‘সরকারি’ ভিজিটিং কার্ডে নাম আব্দুল আল মামুন। পদবি পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক। কার্ডে নিজের দুটি মোবাইল ফোন নম্বরের সঙ্গে দেওয়া আছে অধিদপ্তরেরই টিঅ্যান্ডটি ল্যান্ডফোনের নম্বর। কেতাদুরস্ত চালচলন। গল্প করার ছলে মন্ত্রীদের নাম বলে বেড়ায়—‘...ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে আসলাম।’ সে জন্য অনেকে তার এই পরিচয় বিশ্বাসও করে ফেলে। আর সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে এই ভয়ংকর প্রতারক ভুয়া পরিচয় দিয়ে কয়েক বছরে নানা কৌশলে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা।

ভুক্তভোগীরা পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করলেও পরিচয় ও ঠিকানা বদলের কারণে তার টিকিটিও খুঁজে পাচ্ছিল না কেউ। অবশেষে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদন্তে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের তৎপরতায় নাটকীয়ভাবে ধরা পড়েছে প্রতারক মামুন। ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গতকাল সোমবার মামুনকে আটক করে তেজগাঁও থানায় সোপর্দ করেছেন। সেখানে পরিবেশ অধিদপ্তর তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগী সেখানে গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মামুনের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আবাসন ব্যবসা, ইটভাটাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে প্রায় অর্ধকোটি টাকা নিয়ে গাঢাকা দেয় মামুন। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা পরিচয়ে কয়েকটি স্বর্ণের দোকান থেকে মূল্যবান অলংকার নিয়ে ভুয়া চেক দিয়েও সটকে পড়ে সে। বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের এক জুয়েলার্সের মালিক তার পরিচয় যাচাই করতে গেলে উল্টো তাঁর বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে বেশি মূল্য রাখার অভিযোগ করে এই প্রতারক।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) সুলতান মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই প্রতারকের ব্যাপারে জানতে পেরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়েছি। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহিন আরা মমতাজ বলেন, মামুন অধিদপ্তরে গিয়ে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের সোনালী জুয়েলার্সের বিরুদ্ধে সোনার দামে তিন হাজার ৪০০ টাকা বেশি রাখার অভিযোগ করে। এরপর নিয়ম অনুযায়ী নোটিশ করা হলে সোনালী জুয়েলার্সের মালিক রোকনুজ্জামান দাবি করেন, তিনিই মামুনের কাছে দুই লাখ টাকা পান। চেক নিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। সে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল আল মামুন পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে বেড়ায়। প্রকৃতপক্ষে তার নাম ইব্রাহিম খলিল মামুন। রোকনুজ্জামান আরো দাবি করেন, প্রতারক মামুন আরো কয়েকজন সোনার দোকানিকে ভুয়া চেক দিয়ে অলংকার হাতিয়ে নিয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে ভোক্তা অধিদপ্তরে প্রেষণে আসা তদন্ত কর্মকর্তা শাহিন আরা মমতাজ এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে পরিবেশ অধিদপ্তরে যোগাযোগ করেন। ওই অধিদপ্তরের পরিচালক রুবিনা ফেরদৌস তাঁকে জানান, আব্দুল আল মামুন নামে তাঁদের কোনো কর্মকর্তা নেই। ভয়ংকর এই প্রতারকের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরে বেশ কিছু অভিযোগ এসেছে। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর মামুনকে ধরিয়ে দিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহায়তা চায়।

শাহিন আরা মমতাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, বসুন্ধরার সোনালী জুয়েলার্সের মতোই মামুন গুলশানের পিংক সিটি শপিং মলের দ্য গোল্ড জুয়েলার্সের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা এবং জাবেরী জুয়েলার্সের কাছ থেকে চার লাখ টাকার অলংকার নিয়ে চেক দেয়। পরে দেখা যায়, তার অ্যাকাউন্টে টাকা নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রথমে কিছু অলংকার কিনে এরপর প্রতারণা করে মামুন। পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীরা মামুনের হদিসও পায়নি। তিনি আরো বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ধার্যকৃত টাকা ছাড় করিয়ে দেওয়ার কথা বলে আবাসন প্রতিষ্ঠান স্বপ্নধারার কাছ থেকে ১৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় মামুন। স্বপ্নধারা কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করাতে সে ভুয়া সুপারিশ বানিয়ে এক লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৬ টাকার বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ভুয়া চালানও দেখায়। এ ছাড়া নওগাঁর মাণ্ডা থানার এফএইচ অটো ব্রিকস নামে এক ইটভাটার মালিকের কাছ থেকে প্রতারণা করে দফায় দফায় ১৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় সে।

তেজগাঁও থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘মামুনের বিরুদ্ধে এখন পরিবেশ অধিদপ্তর একটি মামলা করেছে। অভিযোগকারীরা আসছে। অভিযোগ পেলে আরো মামলা করা হবে।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রতারক মামুনের বাড়ি পিরোজপুর জেলার কাউখালী থানার আইরন গ্রামে। তার বাবা আব্দুল আজিজ মোল্লা গ্রামে একটি ওষুধের দোকান চালান। কয়েক বছর আগে রাজধানীর আদাবর থানার মনসুরাবাদ এলাকার ৩৫/৩৬/৩৭ নম্বর বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকত সে। ভুক্তভোগীরা সেই ঠিকানা জানার পর সে বাসা বদল করে হাজারীবাগ এলাকায় চলে যায়।



মন্তব্য