kalerkantho


পরিকল্পনা কমিশনকে শক্তিশালী করার তাগিদ

দুই ক্যাডার একীভূত হওয়া ঝুলে গেল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৫:০৯



দুই ক্যাডার একীভূত হওয়া ঝুলে গেল

সভায় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ অন্য অতিথিরা

ফের ঝুলে গেল বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) প্রশাসনের সঙ্গে ইকোনমিক ক্যাডারের একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াটি। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে দুই ক্যাডার যে একীভূত হচ্ছে না, তা অনেকটা নিশ্চিত। এমনকি নির্বাচনের পরও দুই ক্যাডার একীভূত হবে কি না তা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। গত বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলানগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে বিসিএস ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষ সাধারণ সভায় (ইজিএম) সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারকের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলল, সহসা আসছে না সিদ্ধান্তটি।

কারণ, দুই ক্যাডারকে একীভূত করাসংক্রান্ত ফাইলটি হারিয়ে গেছে, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ দুই ক্যাডারের একীভূত হওয়ার সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ছিল। দুই ক্যাডার একীভূত করার পর নাম কী হবে, সেটিও চূড়ান্ত ছিল। নতুন নামকরণ দেওয়া হয়েছিল ‘প্রশাসন ও উন্নয়ন’ ক্যাডার। বিএসএস ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল গত বছর। সবাই অপেক্ষায় ছিল, কখন আসবে বহুপ্রতীক্ষিত ঘোষণাটি। কিন্তু ফাইল হারিয়ে যাওয়ায় প্রক্রিয়াটি আবার ঝুলে গেল। সভায় পরিকল্পনা কমিশনকে শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন সবাই। ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষ সাধারণ সভায় উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, এসডিজি বাস্তবায়ন বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব জিয়াউল ইসলাম, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সভাপতি ও তথ্যসচিব আব্দুল মালেক, বিসিএস ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী জাহাঙ্গীর আলমসহ অন্যরা। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফরিদ আজিজ।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান বলেন, ‘দুই ক্যাডারকে একীভূত করাসংক্রান্ত নথিটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ফাইলটি হারিয়ে গেছে। অবশ্য জনপ্রশাসন থেকে নথি হারিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। নথিটি পেতে হবে। নথিটি কোথায় আছে, তা জানা যাচ্ছে না। তারপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। আমি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে বলেছি, ফের ফাইলটি প্রক্রিয়া করতে।’ নজিবুর রহমান বলেন, দুই ক্যাডার একীভূত হলে কী হতে পারে, সে বিষয়ে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসোসিয়েশন ও ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব পর্যায়ে বসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। দুই ক্যাডার কিভাবে সমানভাবে লাভবান হতে পারে, সেটি দেখতে হবে। তবে আমরা হতাশ হব না। তিনি বলেন, ‘ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এমনও হয়েছে, কোনো সভাতে ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা আসছে না, আমি বলেছি ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা এলে সভা শুরু হবে। তবে তাঁরা অন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত, সেগুলো দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বাস্তবায়নবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকারের যেকোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা জড়িত। তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে যে পরিকল্পনা শাখা আছে, সেটিকে শক্তিশালী করা জরুরি। ৫৪টি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখাকে শক্তিশালী করতে পারলে পরিকল্পনা কমিশনের কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। দুই ক্যাডারকে একীভূত করার চেয়ে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখাকে শক্তিশালী করার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। তবে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘ফাইল হারিয়ে যাওয়া কোনো বিষয় নয়। অনেক ফাইল হারিয়ে যায়। দুই ক্যাডার একীভূত হচ্ছে না সদিচ্ছার অভাবে। দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তাবটি পড়ে আছে। সদিচ্ছা ছাড়া দুই ক্যাডার একীভূত করা সম্ভব নয়।’ আর পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তাঁর বক্তব্যে বলেন, ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা সরকারের স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সব পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকারের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, ডেল্টা প্ল্যান, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের কৌশল এসবই তৈরি করেছেন ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তবে তাঁরা অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দুই ক্যাডার একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

মূল প্রবন্ধে ফরিদ আজিজ বলেন, ‘দুই ক্যাডারকে একীভূত করতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল এক বছর আগে। তবে দীর্ঘ এক বছর এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারের সদস্যদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় ইকোনমিক ক্যাডারের অন্য সব যৌক্তিক দাবি-দাওয়া পূরণ করতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে।’ বিশেষ সাধারণ সভায় বেশ কিছু দাবি তুলে ধরে ফরিদ আজিজ বলেন, সরকারের উপসচিবদের গাড়ির প্রাধিকারভুক্ত করার পর তাঁদের গাড়ি কেনা বাবদ ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারদেরও প্রচলিত নিয়মের ধারাবাহিকতায় উপপ্রধানদের (উপসচিব পদমর্যাদা) গাড়ি কেনা বাবদ ঋণ সহায়তা দিতে হবে। তিনি বলেন, ইকোনমিক ক্যাডারদের পদোন্নতি খুবই নাজুক অবস্থানে রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে পদোন্নতি ঝুলে আছে। এই ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পর কোনো ব্যাচের কর্মকর্তা এখনো উপপ্রধান পদে পদোন্নতি পাননি। অথচ অন্য সব ক্যাডারে কাছাকাছি ব্যাচ শুধু নয়, অনেক জুনিয়র ব্যাচের কর্মকর্তাও পঞ্চম গ্রেড পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। দীর্ঘ ২০ বছরেও পদোন্নতি না পেয়ে ইকোনমিক ক্যাডারের মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

ফরিদ আজিজ বলেন, ইকোনমিক ক্যাডারের সর্বোচ্চ ‘প্রধান’ পদটি এখনো দ্বিতীয় গ্রেডের। দীর্ঘদিন ধরেই বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা ‘প্রধান’ পদটিকে গ্রেড-১ করার দাবি জানিয়ে আসছে। ২০১৫ সালে বেতন স্কেল ঘোষণার সময় প্রতিটি ক্যাডারে গ্রেড-১ পদ সৃষ্টির বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকলেও বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারের দাবি মেনে এখন পর্যন্ত পদটি গ্রেড-১ করা হয়নি। অথচ জনপ্রশাসনের অধিকাংশ ক্যাডারেই একাধিক গ্রেড-১ পদ রয়েছে। ইকোনমিক ক্যাডারের ৯টি ‘প্রধান’ পদকে গ্রেড-১ এ উন্নীত করার দাবি জানান তিনি। ফরিদ আজিজ বলেন, পরিকল্পনা কমিশনে ‘সদস্য’ (সচিব পদমর্যাদা) পদটি উন্নয়ন প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ। অথচ এই পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। সারা জীবন পরিকল্পনা কমিশনে কাজ করে আমাদের কর্মকর্তারা পরিকল্পনা কমিশনের ‘সদস্য’ পদে পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন না। এমন বাস্তবতায় বিসিএস ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আমরা পরিকল্পনা কমিশনের ‘সদস্য’ পদে বিসিএস (ইকোনমিক) ক্যাডারের সিডিউলভুক্ত করার দাবি করছি।

গত বুধবার সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে এমন বক্তব্য আসার পর সভায় অনেক ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চেহারায় হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। একাধিক ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ‘অনেক হয়েছে। আমরা অনেক অপেক্ষা করেছি একীভূত হওয়ার। অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গেল, দুই ক্যাডার একীভূত হচ্ছে না। এখন আমাদের উচিত হবে নিজেদের মতো করে চিন্তাভাবনা শুরু করা। অন্যের দিকে না তাকিয়ে থেকে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করা।’

বিশেষ সাধারণ সভায় বক্তারা বলেন, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র ৬.৩ বিলিয়ন ডলারের। যেটি এখন ২৭৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭২ সালে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ছিল ৫০১ কোটি টাকা। যেটি এ বছর এক লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। 



মন্তব্য