kalerkantho


জামিন পেলেও মুক্তি মেলেনি মোজাম্মেলের

‘এসব সেবায়’ না নামতে স্ত্রীর পীড়াপীড়ি শোনেননি তিনি

ওমর ফারুক    

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১১:১০



‘এসব সেবায়’ না নামতে স্ত্রীর পীড়াপীড়ি শোনেননি তিনি

অভাবী সাংবাদিক স্বামীকে ছাড়িয়ে আনার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন স্ত্রী রিজু আক্তার

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার চাঁদাবাজির মামলায় জামিন পেলেও মুক্তি পাননি। কারণ পুলিশ তাঁকে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে রেখেছে। তাঁর স্ত্রী রিজু আক্তার চৌধুরীকে গতকালও দেখা যায় অসহায়ের মতো নানা স্থানে ছুটছেন, এইজন-ওইজনের কাছে জানতে চাচ্ছেন তাঁর স্বামী মুক্তি পাচ্ছেন কি না। 

গতকাল কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধি তাঁর খোঁজে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বাসায় গিয়ে রিজু আক্তারকে পাননি। পরে তাঁকে ঢাকায় পাওয়া যায়। দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, যাত্রীদের কাছ থেকে বাসচালক-হেলপাররা বেশি ভাড়া নেয় এই বিশ্বাস থেকে তাঁর স্বামীর মাথায় কিছু একটা করার চিন্তা আসে। ‘আন্দোলন করে ৫ টাকা করে যদি কমানো যায় তাহলে ১০০ জনের ৫০০ টাকা কমানো যায়’—এ রকম কথা বলতেন তিনি। স্ত্রী জানান, তিনি স্বামীর এসব কর্মকাণ্ড সমর্থন করতেন না। তাঁর পরও মোজাম্মেল পিছপা হননি। তাঁকে উল্টো বলতেন, একদিন লোকজন ঠিকই বুঝবে।

চোখ মুছতে মুছতে রিজু আক্তার বলেন, ‘সেই মোজাম্মেল এখন কারাগারে। আমি কিছু চাই না। আমার স্বামীকে জেলমুক্ত দেখতে চাই। যাত্রীসেবা করে আমার কোনো লাভ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, আমার স্বামীকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দিন। ’

রিজু জানান, তাঁর স্বামী একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে অল্প টাকা বেতনে কাজ করেন। সেই টাকা দিয়ে সংসার চালানো বেশ কষ্ট। ২০১০ সালের দিকে তাঁর স্বামী যাত্রীসেবা নিয়ে কাজ করার দিকে ঝুঁকে পড়েন। প্রায়ই তিনি আক্ষেপ করে বলতেন বাস মালিক, চালক-হেলপাররা মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। এর প্রতিকার হওয়া দরকার। এসব ঝামেলাপূর্ণ কাজে যাওয়া দরকার নেই বলে তিনি প্রায়ই স্বামীকে বলতেন। কিন্তু তিনি থামেননি। ধীরে ধীরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে গড়ে তোলেন একটি সংগঠন। নাম দেন ‘বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি’।

স্ত্রী জানান, এই সমিতিতে যোগ দেয় বেশ কিছু লোক। ২০১৪ সালের ৩ জুলাই সংগঠনটির সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে নিবন্ধনও করান। এর পর থেকে তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করে দুর্ঘটনার বিষয়ে তথ্য দিতে থাকেন সাংবাদিকদের। ধীরে ধীরে আলোচনায় আসতে থাকে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। তিনি জানান, বর্তমানে এ সংগঠনের ৭০-৮০ জন সদস্য রয়েছেন। যখনই কোনো অনুষ্ঠান হয়, তখন সংগঠনের সদস্যরা ৫০ টাকা ১০০ টাকা করে চাঁদা দিয়ে সংবাদ সম্মেলনের জন্য হল ভাড়া নেওয়াসহ নানা কাজ করেন। 

মোজাম্মেল অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিকও
জানা যায়, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর ইমামুরচর গ্রামে মোজাম্মেলের বাড়ি। তিনি তিন সন্তানের জনক। বড় ছেলে জুয়েল হক চৌধুরী অনার্সে, আরেক ছেলে মোন্তাসিরুল হক মাদরাসায় পড়শোনা করছে। সবার ছোট তিন বছরের মেয়ে ফাতেমাতুজ জোহরা। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার একটি বাসায় ভাড়া থাকেন।

স্ত্রী জানান, তাঁর স্বামী চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের ঢাকা অফিসের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। সেখান থেকে যে বেতন পান তা দিয়ে কোনো মতে সংসার চলে তাঁর। আগে তাঁরা কেরানীগঞ্জে থাকতেন। সেখানে বাসা ভাড়া বেশি দিতে হতো। এ কারণে তিনি কম ভাড়ায় থাকার জন্য বছরখানেক আগে সিদ্ধিরগঞ্জে দুই রুমের একটি বাসা ভাড়া নেন। প্রতি মাসে ছয় হাজার টাকা বাসা ভাড়া দেন। 

স্ত্রী জানান, স্বামীকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর কাছে কোনো অর্থ নেই যে তাঁকে ছাড়িয়ে আনার জন্য খরচ করবেন। তাঁর বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের জন্য যাত্রী কল্যণ সমিতির সদস্যরা চাঁদা তুলে তাঁর হাতে দিয়ে সহযোগিতা করছেন। আর মামলা চালাতে গিয়ে টাকা খরচ করতে হচ্ছে না। যাত্রী কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বিনা পয়সায় লড়ছেন তাঁকে মুক্ত করে আনতে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যাত্রী কল্যাণ সমিতি একটি সামাজিক সংগঠন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে অফিস। পরিবহনে যাত্রীদের অধিকার এবং নিরাপত্তা সচেতনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে এই সংগঠন। দুই ঈদে এবং বার্ষিক ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে একজন মন্ত্রী তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন বলে সমিতির এক সদস্য দাবি করেন। এ কারণেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।

মোজাম্মেলকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে সমাজের নানা মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে। তারা বলছে, পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য মোজাম্মেল চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এরপর সম্প্রতি বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থী দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশে এত বড় আন্দোলন হয়ে গেল। সরকার তাদের আন্দোলনকে সাধুবাদ জানিয়েছে। কিন্তু ‘মিথ্যা মামলা’ দিয়ে মোজাম্মেলকে গ্রেপ্তার করানো হলো।  

গত বুধবার গভীর রাতে মিরপুর মডেল থানার পুলিশ মোজাম্মেলকে তাঁর সিদ্ধিরগঞ্জের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। মামলার এজাহারে জনৈক দুলাল দাবি করেছেন, মোজাম্মেল হক তাঁর কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছেন। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা তিনি নিয়েছেন। এজাহারে দুলাল তাঁর পরিচয় হিসেবে মিরপুর রোড সড়ক শ্রমিক কমিটির সড়ক সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বাসার ঠিকানা হিসেবে মিরপুরের শাহআলীর ১৮ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়ির কথা উল্লেখ আছে। এজাহারের নিচে দুলালের যে ফোন নম্বরটির উল্লেখ আছে, সেই নম্বরে গতকাল দিনভর চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সামসুদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে জানান, এটা একটা সাজানো মামলা। এরই মধ্যে মামলার বাদী সাংবাদিকদের কাছে জানিয়েছেন, মামলার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তাঁকে গ্রেপ্তারের সময় মিরপুর থানার পুলিশ প্রথমে মামলার কথা বলেনি। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ বলেছে, ওপরের নির্দেশে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে থানায় নেওয়া হচ্ছে, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হবে। থানায় নেওয়ার পর মোজাম্মেলকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়। মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে আগে কখনো কোনো থানায় জিডি পর্যন্ত হয়নি। সামসুদ্দিন বলেন, তাঁকে অন্য একটি মামলায়ও আসামি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোজাম্মেল হক চৌধুরী জনসেবামূলক কাজ করছেন। আমরা শুনতে পেয়েছি, তাঁকে একটি বানোয়াট মামলায় জেলে নেওয়া হয়েছে। এখন দেখি মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ন্যায়বিচারের অভাবের কারণেই এমন সব ঘটনা ঘটছে।’   

গত সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, যাত্রী কল্যাণ সমিতি সব যাত্রীর পক্ষ থেকে শুধু এটুকুই বলেছে যে রাস্তায় বের হলে যেন তারা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে। এমন নিরীহ একটি সংগঠনের নেতাকে যদি রিমান্ডে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে, তবে হতবাক হতে হয়। অথচ সব ক্ষেত্রে শোনানো হচ্ছে, সরকার গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখছে, তাদের উন্নয়নের কোনো তুলনা নেই।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, মোজাম্মেল হক চৌধুরী যেসব তথ্য উপস্থাপন করতেন, তাতে সড়কের নৈরাজ্য প্রায়ই উন্মোচিত হতো। কয়েক বছর ধরে তিনি লেগে থেকে যে কাজ করে যাচ্ছিলেন, তিনি তো প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এ বিষয়গুলোও সরকার সহ্য করতে পারছে না।

এক মামলায় জামিন
চাঁদাবাজির মামলায় মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে মঙ্গলবার জামিন দিয়েছেন ঢাকার মহানগর হাকিম মাজহারুল ইসলাম।

তবে আরেকটি মামলায় তাঁকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন থাকায় আপাতত তাঁর মুক্তি মিলছে না। তাঁর আইনজীবী জায়েদুর রহমান জানান, আদালত জামিন আবেদনের শুনানি শেষে ১০ হাজার টাকা মুচলেকায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করেছেন। তবে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুলিশ হেফাজতের আবেদন থাকায় তিনি আপাতত ছাড়া পাচ্ছেন না। গত সোমবার ঢাকার কাফরুল থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে একই আদালতে আবেদন জানান কাফরুল থানার এসআই মো. রায়হান। বিচারক আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর এই আবেদনের শুনানির দিন রেখেছেন। 



মন্তব্য