kalerkantho


মগবাজারে ‘উত্তরণ কর্ম-সংস্থান প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচি উদ্ধোধন

হিজড়া সম্প্রদায়কে আলোর পথ দেখাতে হবে : ডিআইজি হাবিব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ আগস্ট, ২০১৮ ২০:২৩



হিজড়া সম্প্রদায়কে আলোর পথ দেখাতে হবে : ডিআইজি হাবিব

হিজড়া সম্প্রদায়কে আলোর পথ দেখাতে হবে, যথাযথ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। রাস্তায় মানুষের কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতলে কখনো সম্মান আসবে না, সম্মানের জন্য প্রয়োজন গ্রহনযোগ্য একটি সামাজিক অবস্থান ও আর্থিক সক্ষমতা, সেটা অর্জন হবে তখনই যখন আপনারা সকলে কাজের মাধ্যমে নিজেদের যার যার অবস্থান তৈরি করে নেবেন। আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর মগবাজারের একটি বাড়িতে হিজড়া ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবন-মান উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘উত্তরণ কর্ম-সংস্থান প্রশিক্ষণ’ কর্মসূচি উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) এবং উত্তরণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান। 

জানা গেছে, উক্ত কার্যক্রমের আওতায় প্রথমিকভাবে তৃতীয় লিঙ্গের ১০ জন সদস্যকে পছন্দ মোতাবেক সেলাই, ব্লক, বাটিক, এমব্রয়ডারী, রান্না ও বিউটি পার্লারের কাজ শেখানো হবে। পরবর্তীতে তাদের কর্ম-দক্ষতা বিবেচনাপূর্বক যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

ডিআইজি হাবিবুর রহমান বলেন, সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকেও সমানতালে এগিয়ে নিতে হবে। তাদের নানাভাবে কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। হিজডা সম্প্রদায় আমাদের মতই রক্ত-মাংসের মানুষ। তারা প্রকৃতপক্ষে মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত। জীবনধারণের সঠিক দিক নির্দেশনা না পাওয়ায় শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে এবং আমাদের বিরাগভাজনের শিকার হচ্ছে। এজন্য তাদেরকে আলোর পথ দেখাতে হবে, যথাযথ কর্ম-সংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। 

তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে উত্তরণ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আমরা উত্তরায় আপন হিজড়ার নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্টরি ও টেইলার্স করে দিয়েছি যেখানে ২৫ জন হিজড়া নিয়মিত কাজ করছে, যারা প্রত্যেকেই এখন নিজের পায়ে দাড়াতে শুরু করেছে। এছাড়া আশুলিয়া, সাভার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ৩টি পার্লার করে দিয়েছি যেখানে অনন্যা, শাম্মী, সোহাগী ও মনিষা হিজড়ার নেতৃত্বে ১৫ জন সদস্য কাজ করছে। আমরা উত্তরায় কচি হিজড়ার নেতৃত্বে একটি ডেইরি ফার্ম করে দিয়েছি সেটাও বেশ ভাল করছে। এর বাইরেও আমরা মানিকগঞ্জ ও রাজবাড়ীতে খুব শীঘ্রই দুটি পার্লার চালু করার চিন্তা করছি। আমরা বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের হিজড়াদের সাথে একটি সু-সম্পর্ক তৈরি করেছি এবং প্রতিনিয়ত তাদের কর্মমুখী হবার আগ্রহের বিষয়টি আমাদের অনুপ্রাণিত করছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতায় এবং আমাদের সীমিত ব্যবস্থাপনায় যতদূর পারি চেষ্টা করছি। আমাদের গৃহীত এই উদ্যোগগুলো সমাজের জন্য তথা রাষ্ট্রের জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে কিন্তু সকলে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে না আসলে এই জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি পুনর্বাসন করা সম্ভব নয়। 

হাবিবুর রহমান বলেন, দেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। সংবিধানে সকলের জন্য সে অধিকার রেখে গেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও সেই ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে কাজ করে চলেছেন। আপনাদের সকলের সহায়তা পেলে উত্তরণ ফাউন্ডেশনও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিশন বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা রাখি। 

তিনি উপস্থিত সকল হিজড়ারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আল্লাহ পাক আমাকে যদি সুস্থভাবে সম্মানের সাথে বাঁচিয়ে রাখেন তাহলে আপনারাও সম্মানের সাথে বেচে থাকবেন-ইনশাল্লাহ। মনে রাখবেন, রাস্তায় মানুষের কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতলে কখনো সম্মান আসবে না, সম্মানের জন্য প্রয়োজন গ্রহণযোগ্য একটি সামাজিক অবস্থান ও আর্থিক সক্ষমতা, সেটা অর্জন হবে তখনই যখন আপনারা সকলে কাজের মাধ্যমে নিজেদের যার যার অবস্থান তৈরি করে নেবেন। 

পাঞ্জেরী পাবলিকেশনের চেয়ারম্যান ও উত্তরণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান শায়ক বলেন, মানুষ মানুষের জন্য। এই ব্রতকে বুকে ধারণ করে আমরা সবাই ডিআইজি হাবিবুর রহমানের মত একজন নীতিবান ও মানব দরদীর নেতৃত্বে উত্তরণ ফাউন্ডেশনকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তথা বেদে ও  হিজড়া সম্প্রদায়ের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। আজকে ঝুমা ও সজীব হিজড়ার নেতৃত্বে যে কর্ম-সংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ উদ্বোধন করা হচ্ছে এটির সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যত রয়েছে, এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক হিজড়া সরাসরি উপকৃত হলেও পরোক্ষভাবে অনেক হিজড়াকে কর্মমূখী হবার প্রেরণা যুগাবে, যা সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতিতে অবদান রাখবে। ইতিপূর্বে, উত্তরণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে যতগুলো কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে সেখানে আমাদের শতভাগ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আমি মনে করি, একটি মানুষ চিন্তা ও চেতনায় সৎ থাকলে তার কোনো উদ্যোগই বৃথা যায় না, উত্তরণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও ডিআইজি হাবিব ভাই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সাফল্য পেয়েছে। আশা করি আজকের উদ্যোগও অচিরেই সফল হবে। 

এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন, উত্তরণ ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী এম এম মাহবুব হাসান, প্রশিক্ষক সোনিয়া জামান, আর্টিসান আউটফিটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আহমেদ রাসেল, ইউনিট্রেড ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল করিম। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফ্যাশন-১ এর চেয়ারম্যান মলয় কুমার দেবদাস, ব্যবসায়ী চয়ন সিকদার, চিত্র পরিচালক ইরানী বিশ্বাস, হিজড়াদের গুরুমা দিপালী হিজড়া, অনন্যা হিজড়া, আপন হিজড়া, সজীব হিজড়া, ঝুমা হিজড়া এবং শাম্মী হিজড়াসহ প্রমূখ।

উল্লেখ্য, ডিআইজি হাবিবুর রহমান তাঁর উত্তরণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ঢাকাস্থ সাভার ও মুন্সীগঞ্জের বেদে সম্প্রদায়ের জন্য সেলাই প্রশিক্ষণ, বুটিক, কম্পিউটার ট্রেনিং, স্কুল, ফ্যাশন হাউস ও আবাসন প্রকল্পসহ নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন, যা ইতোমধ্যে পুরো বেদে সম্প্রদায়কে প্রায় সাড়ে চারশ বছরের অচ্ছুত ও গ্লানিময় জীবন থেকে মুক্তি দিতে চলেছে।



মন্তব্য