kalerkantho


পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে

প্রশ্ন ফাঁসে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত, ৬৩০০০ প্রার্থী ভোগান্তিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী   

২১ জুলাই, ২০১৮ ১১:১৯



প্রশ্ন ফাঁসে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত, ৬৩০০০ প্রার্থী ভোগান্তিতে

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের টিকিট কালেক্টর গ্রেড-২ পদে নিয়োগ পরীক্ষা হঠাৎ করে স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ঘটনায় স্থগিত করা হয়। এ নিয়ে গতকাল দুপুরে বিক্ষোভ করেছে চাকরিপ্রত্যাশী পরীক্ষার্থীরা। পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় অন্তত ৬৩ হাজার পরীক্ষার্থী ভোগান্তিতে পড়ে। দূরদূরান্ত থেকে আসা পরীক্ষার্থীদের মধ্যে নেমে আসে হতাশা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের টিকিট কালেক্টর গ্রেড-২ পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা ছিল গতকাল। বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল এ পরীক্ষা। কিন্তু পরীক্ষার কিছুক্ষণ আগে স্থগিত করা হয়। এতে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পরীক্ষার্থীরা দুর্ভোগে পড়ে। হঠাৎ করেই পরীক্ষা স্থগিত করায় দূরদূরান্ত থেকে আসা পরীক্ষার্থীরা পশ্চিমাঞ্চল রেল ভবনের (রাজশাহী) সামনে গিয়ে দুপুরে দুই দফা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এ সময় পুলিশ দিয়ে প্রার্থীদের গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও পরীক্ষার জন্য আসা প্রার্থীরা অভিযোগ করেছে।

বিষয়টি জানতে চাইলে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চিফ সিগন্যাল অ্যান্ড টেলিকম অফিসার অসীম কুমার তালুকদার বলেন, ‘পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়টি নিয়ে আমাদের করার কিছু নেই। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের টিকিট কালেক্টর গ্রেড-২ পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা বাধ্য হয়েই স্থগিত করা হয়েছে।

তিনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিতব্য পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে ঈদুল আজহার আগেই স্থগিত হওয়া এ পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। প্রশ্নপত্র নতুনভাবে তৈরির পরই তারিখ নির্ধারণ করা হবে। ওই সময় পরীক্ষার তারিখ জানিয়ে পত্রিকায় আবারও বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রার্থীদের নামে আবারও পরীক্ষার কার্ড পাঠানো হবে।

জানা গেছে, সারা দেশ থেকে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী রাজশাহীতে এ পরীক্ষা দিতে এসেছিল। এর মধ্যে বরিশাল থেকে ১৪ হাজার, দিনাজপুর থেকে ছয় হাজার এবং নওগাঁ থেকে দুই হাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৩৩ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নিতে এসেছিল। এ ছাড়া চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নিতে আরো প্রায় ৩০ হাজার পরীক্ষার্থী গিয়েছিল ওই অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার পরীক্ষার্থীরা। কিন্তু পরীক্ষা শুরু হওয়ার মাত্র আধাঘণ্টা আগে তারা জানতে পারে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এতে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে পরীক্ষার্থীরা।

পশ্চিমাঞ্চল রেওলওয়ের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তা (সিপিও) শহিদুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট কালেক্টর গ্রেড-২ পদের জন্য রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল থেকে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়া হয় গত বছরের নভেম্বর মাসে। ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সারা দেশ থেকে ৬৫ হাজার ৫৬টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ৬৩ হাজার ১২৫ জনকে পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করে কার্ড পাঠানো হয়। তবে গতকালের পরীক্ষার দু-একদিন আগ থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বলে খবর আসতে থাকে।

শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসের খবর পাওয়ার পর থেকে আমরা নানাভাবে সেটির খোঁজ নিতে থাকি। এরই মধ্যে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চিফ সিগন্যাল অ্যান্ড টেলিকম অফিসার অসীম কুমার তালুকদারের ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে একজন প্রশ্নপত্রের একটি কপি পাঠিয়ে দেয়। তাতে দেখা যায়, পুরো প্রশ্নপত্রের সঙ্গে এর মিল রয়েছে। এরপরই আমরা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিই।’

এদিকে পটুয়াখালী থেকে রাজশাহীতে রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা শামীম হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘ ৯ মাস পর আমাদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষা দেওয়ার জন্য দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চলে এসেছি। আমাদের এখানে থাকা-খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। এখানে এসে শুনছি এ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। আমরা তো আর ক্লাস এইটে পড়ি না যে আমাদের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে। এই অনিয়মের কোনো প্রতিকার কি রেলওয়ে বা সরকার দিতে পারবে?’

ঢাকার নবীনগর থেকে আসা আরেক পরীক্ষার্থী রুবেল ইসলাম বলেন, ‘এখানে আসতেও অনেক অর্থ, শ্রম আমাদের দিতে হয়েছে। আমাদের ভিটাবাড়ি বেচে তো নিয়োগ নিতে পারব না। যাদের ১৫ বা ২০ লাখ টাকা আছে তাদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রশ্ন ফাঁস করা হয়েছিল। এরপর রেলওয়ের কর্মকর্তারাই সেটি আবার হুট করে স্থগিত করেছেন। তাঁরাই জড়িত এই প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে।’

এদিকে রেলওয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের একটি বড় চক্র জড়িত। এ চক্রটি এর আগেও রেলওয়ের এসআই পদসহ বিভিন্ন পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তাসহ একটি সংগঠনের কয়েকজন নেতাও জড়িত। যাঁরা বছরের পর বছর ধরে এই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে অবস্থান করে প্রশ্নপত্র ফাঁস বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। সম্প্রতি রেলওয়ের নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের ঘটনায় দুদকও তদন্ত শুরু করেছে। এরই মধ্যে ঘটল আরেকটি বড় ঘটনা। 



মন্তব্য