kalerkantho


সংসদে প্রধানমন্ত্রী

কোটা সংস্কার করব, হাইকোর্টের রায়ও মানতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক    

১৩ জুলাই, ২০১৮ ১০:৪৭



কোটা সংস্কার করব, হাইকোর্টের রায়ও মানতে হবে

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আন্দোলনের নামে যারা ভিসির বাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছে তাদের তো ছাড়া হবে না। তাদের ছাড়া যায় না। আন্দোলনের নামে উচ্ছৃঙ্খলা তো বরদাশত করা যায় না। যতই আন্দোলন করুক, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। এসব কাজ কোনো শিক্ষার্থী করতে পারে না। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘কোটা সংস্কার আমরা করব। আমি তো বললাম সব বাদ দিতে। কিন্তু হাইকোর্টের রায় রয়েছে। হাইকোর্টের রায় আমি অবমাননা করলে তখন তো আমি আদালত অবমাননায় পড়ে যাব। এটা কেউ করতে পারবে না। আমরা মন্ত্রিপরিষদসচিবকে দিয়ে একটা কমিটি করে দিয়েছি। তাহলে এদের অসুবিধাটা কোথায় আমার সেটাই প্রশ্ন।’ তিনি বলেন, কোটা নিয়ে যারা আন্দোলন করছে তারা যে কী চায় বারবার জিজ্ঞেস করা হয়েছে, সেটা কিন্তু সঠিকভাবে তারা বলতে পারে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বুধবারই বলেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায় রয়েছে। যেখানে হাইকোর্টের রায় আছে, মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা ওইভাবে সংরক্ষণ থাকবে। আমরা হাইকোর্টের রায় কিভাবে লঙ্ঘন করব। কিভাবে হাইকোর্টের রায় বাদ দেব? সেটা তো আমরা করতে পারি না। তবে তো হাইকোর্টের রায় অবমাননা হবে। তবে কোটা যেটাই থাকুক, কোটা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে যে জায়গায় খালি থাকবে সেখানে মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা হবে এবং সেটাই করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোটা নিয়ে আন্দোলন করছে ভালো কথা, কিন্তু ভিসির বাড়িতে আক্রমণ করে জ্বালিয়ে দেওয়া, গাড়িতে আগুন দেওয়া, বাড়িতে আগুন দেওয়া, ভাঙচুর এবং লুটপাট করা, এটা কি কোনো শিক্ষার্থীর কাজ? এটা কি কোনো শিক্ষার্থী করতে পারে? ভিসির পরিবার আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। তিনি বলেন, আজকে তারা কথায় কথায় আন্দোলনের নামে ক্লাসে তালা দেয়, ক্লাস করবে না, পরীক্ষা দেবে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কে হবে? সেশনজট আগে অনেক ছিল, অন্তত আমরা ক্ষমতায় আসার পর সেশনজট দূর করেছি। কিন্তু এখন তাদের (আন্দোলনকারী) কারণেই আবার সেশনজট সৃষ্টি হচ্ছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদ নেতা বলেন, মাত্র ১৫ টাকা হলের সিট ভাড়া, আর ৩০ টাকায় খাবার পৃথিবীর কোথায় আছে? আজকে যারা হলে থাকে, তাদের জন্য নতুন নতুন হল বানিয়েছি। তারা হলের গেট ভেঙে ফেলবে, মধ্য রাতে ছাত্রীরা বের হয়ে যাবে—এটা কী আন্দোলন? উচ্ছৃঙ্খলা তো বরদাশত করা যায় না।

শেখ হাসিনা বলেন, ভিসির বাড়িতে সিসি ক্যামেরা ছিল, হামলার সময় সেটা ভেঙে ফেলেছে। চিপটা পর্যন্ত নিয়ে গেছে যেন হামলাকারীদের দেখা না যায়। কিন্তু তারা জানত না আশপাশে আরো অনেক ক্যামেরা ছিল। ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় ক্যামেরা ছিল, সেই  ক্যামেরার ফুটেজ দেখে একটা একটা করে হামলাকারীদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। এখানে যারা ভাঙচুর করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, তাদের তো ছাড়া হবে না। তাদের ছাড়া যায় না। জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তদন্ত করা হচ্ছে। অনেকে স্বীকারও করেছে। যেখানেই যারা থাকবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে, তারা যতই আন্দোলর করুক। তিনি আরো বলেন, চাকরিতে কোটার নীতিমালা তো সরকার করবে। সেটা আমাদের দেখার বিষয়, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করবে। অনেক জায়গায় পোস্ট খালি আছে, যারা মেধা তালিকায় থাকছে, কেউই বাদ যাচ্ছে না। যারাই মেধাবী তারা কোনো না কোনোভাবে চাকরি পাচ্ছে।

সংসদ নেতা শেখ হাসিনা দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সহযোগিতা কামনা করে বলেন, আর্থ-সামাজিক সকল সূচকে এবং সব দিক থেকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। দেশের মানুষ একটু সুখের মুখ দেখেছে। কোনো অশুভ শক্তি দেশের জনগণের এই সুখটা যাতে কেড়ে না নিতে পারে সে জন্য দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানাব। দেশে যেন আবারও মারামারি, খিস্তিখেউর, আগুন দিয়ে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার মতো পরিবেশ ফিরে না আসে। তিনি আরো বলেন, দেশবাসী যদি মনে করে তারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে ভুল করেনি, তারা দেশকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করছে—তাহলে দেশের জনগণ আগামী নির্বাচনেও নৌকায় ভোট দিয়ে আবারও তাদের সেবা করার সুযোগ দেবে। আমাদের বিরোধী দল এবং যারা আছে আমি আশা করি সকলে নির্বাচনে অংশ নেবেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশকে আমরা বিশ্বের দরবারে যে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছি সেটা আমরা ধরে রেখে এগিয়ে যাব। জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলব।

বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারের সংসদে ভদ্র, সুন্দর, সহনশীল পরিবেশ ছিল। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যেটা হওয়ার কথা ছিল মূলত সেটাই হয়েছে। অতীতে সংসদে খিস্তিখেউর, জনপ্রতিনিধি হলেও ফাইল ছোড়াছুড়ি, টেলিভিশনের ক্যামেরা ভাঙচুর, অভদ্র কথাবার্তায় এমন বিব্রত পরিস্থিতিতে পড়ে যেতাম, যাতে জাতির কাছে লজ্জিত হতাম। এবারের সংসদ ২০১৪ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠন হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে কোনো অশালীন ঘটনা হয়নি। বিরোধী দল সংসদে থেকে প্রত্যেকটা বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনা করেছে। তিনি বলেন, বাজেট অধিবেশনে দেশের ইতিহাসে সবচাইতে বড় বাজেট আমরা দিয়েছি। কারণ আমাদের একটাই লক্ষ্য তা হচ্ছে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। আমরা প্রতিটি বছর প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ ভাগে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উপনীত হয়েছি। বিশ্বের কেউ বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করতে পারবে না।

বর্তমান সরকারের আমলে গ্রামীণ অর্থনীতির ব্যাপক পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন আর কোনো দিক থেকে পিছিয়ে নেই। আমরা ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। বিশ্বব্যাপী আজ বাংলাদেশ সমাদৃত। আমাদের লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ করা। তিনি বলেন, আমরা সারা দেশে খাদ্য নিরাপত্তা গড়ে তুলেছি। রোজার সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাদ্যশস্য পাঠাই। কিন্তু অনেক স্থানে এখন খাদ্য নেওয়ার মতো লোক নেই। সবাই বলে আমাদের ঘরে খাবার আছে, ভিক্ষার চাল নিব না। কারণ তাদের ঘরে খাদ্য আছে, ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। তিনি বলেন, আমরা যেমন খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি, পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করেছি। শুধু খাদ্য নয়, মাছ, তরিতরকারি ও মাংস উৎপাদনেও আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। আমরা পুষ্টি ও আমিষ দিতে পেরেছি বলেই মানুষের আয়ুষ্কাল বেড়েছে। পুরুষদের ৭১ এবং মেয়েদের আয়ুষ্কাল ৭২ থেকে ৭৩ হয়েছে।

বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিলিটারি ডিক্টেটররা ক্ষমতা দখল করে উপকারের বদলে দেশের সর্বনাশ করে গেছে। মতিঝিলে একসময় ঝিল ছিল। আইয়ুব খান তা বন্ধ করে দেয়। সেগুনবাগিচা ও পান্থপথে আগে খাল ছিল। জেনারেল এরশাদ সাহেব এসে সেই খাল বন্ধ করে দিয়ে বক্স কালভার্ট নির্মাণ করেন। এতে করে পানি এখন আরা নামতে পারে না। জিয়া এয়ারপোর্ট থেকে দীর্ঘ রাস্তার দুই ধারে থাকা সব কৃষ্ণচূড়াগাছ কেটে ফেলে। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হলে ক্ষমতায় আসতে পারলে আমরা সব বক্স কালভার্ট ভেঙে ফেলে নিচে খাল এবং ওপর দিয়ে এলিভেটেড রাস্তা করে দেব।

সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরো ২৫ বছর বৃদ্ধির সমালোচনাকারীদের উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের কারণে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরো ২৫ বছর বৃদ্ধি করতে সংসদে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। এতে করে কোনো নারীর সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হয়ে আসার পথে কোনো বাধা হবে না। কিন্তু এটা নিয়েও নারী আন্দোলনের অনেকে সমালোচনা করেন। তাদের বলব, এত কথা না বলে আগামী নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিন, জনগণের কাছে যান, ভোট নিয়ে সংসদে আসুন। কিন্তু ভালো একটা কাজ করার পরও কেন জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন?

২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর শতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে পালনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কৃষক-শ্রমিক, কামার-কুমার, বেদে-হিজড়া, নৃগোষ্ঠীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে কাজ করে যাচ্ছি। আগামীতে দেশের একটি মানুষ দরিদ্র্য থাকবে না, একটি মানুষও অবহেলিত ও গৃহহারা থাকবে না। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলবই। 



মন্তব্য