kalerkantho


যে কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়

দুর্যোগে স্বজনদের সুরক্ষায় মনোযোগ আর ক্ষমতায়নের অভাব

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৯ মার্চ, ২০১৮ ০৩:০৫



যে কারণে জলবায়ু পরিবর্তনে নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়

জলবায়ু পরিবর্তন পুরুষদের তুলনায় নারীদের বেশি ক্ষতি করে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা গবেষণায় একই ফল পাওয়া গেছে। কিন্তু কেন নারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়? গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, শিশু ও স্বজনদের রক্ষায় বেশি মনোযোগী এবং আর্থ-সামাজিকভাবে ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাবের কারণে নারীরা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। একাধিক গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্বাস্তু মানুষের মধ্যে ৮০ শতাংশই নারী। ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। নারীরা যে জলবায়ু পরিবর্তনে অতুলনীয় ক্ষতির শিকার হবে, চুক্তিতে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।  

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হতে পারে বিখ্যাত হ্রদ 'লেক চাদ'। সাহারা মরুভূমির এক পাশে অবস্থিত আফ্রিকার চাদ, ক্যামেরুন, নাইজার ও নাইজেরিয়া নিয়ে বিস্তৃত এই হ্রদের ৯০ শতাংশই এখন আর নেই। এর ফলে বেশি বিপদে পড়েছে স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নারীরা। হ্রদটি শুকিয়ে যাওয়ায় পানি আনতে এখন নারীদের বহুদূর হেঁটে যেতে হয়।

চাদের স্থানীয় আদিবাসী নারীদের নিয়ে কর্মরত সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইনডিজিনাস উইমেন অ্যান্ড পিপল অব চাদের (এএফপিএটি) সমন্বয়কারী হিনদাও আওমারাও ইব্রাহিম বিবিসিকে বলেন, শুকনো মৌসুমে এখানকার পুরুষরা সব শহরে চলে যায়। পরিবারের লোকদের দেখার জন্য নারীদের রেখে যায় তারা। কিন্তু শুকনো মৌসুম যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে পরিবারের সদস্যদের আহার জোগাড় ও দেখভাল করতে গিয়ে নারীদের অনেক বেশি কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু এ সময় তারা পুরুষদের সহযোগিতা পায় না। আওমারাও ইব্রাহিম বলেন, 'তখন তাদের (নারীদের) জীবন হয়ে ওঠে আরো ঝুঁকিপূর্ণ।...এটা খুবই কঠিন কাজ।'

সমস্যাটা বৈশ্বিক : বিবিসির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, এটা কেবলই গ্রামীণ এলাকায় নারীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনা বিষয় নয়, বিশ্বজুড়েই পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি দারিদ্র্যের শিকার এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষমতায় পিছিয়ে। এই বৈষম্যের কারণে কোনো দুর্যোগে যখন অবকাঠামো, ঘরবাড়ি বা কাজের ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন নারীদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় ২০০৫ সালে হ্যারিকেন ক্যাটরিনার আঘাতও নারীর ওপরই বেশি পড়তে দেখা গেছে। ওই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আফ্রিকান আমেরিকান নারীরা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় নিউ অরলিনসের মতো নিম্নাঞ্চলের শহরগুলো উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে আছে।
রুতগার্স ইউনিভার্সিটির উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জ্যাকুলিন লিট বলেন, 'ক্যাটরিনার আগে নিউ অরলিনসে আফ্রিকান আমেরিকান জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যের হার ছিল প্রকট। তাদের মধ্যে শহরটির অর্ধেকের বেশি দরিদ্র পরিবার চলছে একজন করে অবিবাহিত মায়ের অধীনে। তারা প্রতিটি দিন বেঁচে থাকার জন্য কমিউনিটি নেটওয়ার্ক ও সম্পদের ওপর নির্ভরশীল থাকে। কিন্তু ক্যাটরিনার আঘাতের পর তারা বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়লে সেই নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই দুর্যোগ তাদের ও তাদের শিশুদের আরো বেশি পরিমাণে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।'

দেখা গেছে, যেকোনো দুর্যোগের প্রথম শিকারই হয় নারী। কিন্তু নারীদের জন্য জরুরি আশ্রয় সেভাবে থাকে না। ক্যাটরিনার পরও দেখা গেছে, পর্যাপ্ত স্যানিটারি পণ্যের অভাবসহ নানা বিড়ম্বনার শিকার বেশি হয় নারীরা। দুর্যোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি যেৌন হয়রানি, ধর্ষণের মতো সহিংসতাও বেড়ে যেতে দেখা গেছে।

বিষয়টা আসলেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ? : বেশির ভাগ জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনাই মানবিক কার্যক্রমের ফল, কিন্তু কোনো দুর্যোগের প্রভাবই নারী-পুরুষ ভেদে সমানভাবে পড়ে না। ২০০৪ সালের সুনামির পর আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সুনামিতে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ায় পুরুষরাই বেশি বেঁচে যেতে সক্ষম হয়। নারী-পুরুষের এই বেঁচে যাওয়ার অনুপাত ছিল ৩:১। মূলত দুর্যোগে শিশু ও আত্মীয়দের রক্ষা করতে গিয়ে নারীরা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার মতো সময় পায় না বলেই তারা দুর্যোগের শিকার হয় বেশি। তবে যেখানে নারীরা আর্থ-সামাজিকভাবে অধিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত, সেখানে দুর্যোগ পরিস্থিতিতে পুরুষের তুলনায় নারীরা অধিক পরিমাণে আত্মরক্ষা করতে পারে।

তারা কিন্তু পৃথিবীর অর্ধেক : এই বৈষম্যকে স্বীকৃতি দিয়ে সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় নীতিনির্ধারণ ও পরিকল্পনায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে নারীদের অংশগ্রহণের হার এখনো মাত্র ৩০ শতাংশ। এ ব্যাপারে পরিবেশবিজ্ঞানী ও জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্ত সরকারের প্যানেলের (আইপিসিসি) সদস্য ডায়না লিভারম্যান বলেন, নারীরা পৃথিবীর অর্ধেক। সুতরাং সব প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ থাকা জরুরি।



মন্তব্য