kalerkantho


প্রশ্নপত্র ফাঁস

ম্যাসেঞ্জারে প্রশ্ন চাইলেই মিলে সাড়া

রিমান্ডে ১১ জনের তথ্য, সরবরাহকারীদের খোঁজে গোয়েন্দারা

এস এম আজাদ    

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৭:৫২



ম্যাসেঞ্জারে প্রশ্ন চাইলেই মিলে সাড়া

যারা অনলাইনে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন বিক্রি করছে তাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। তারা প্রশ্নপত্র বা সাজেশন দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পেজ খোলেন। ওই পেজের সূত্রে যোগাযোগের জন্য ফেসবুকের মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো’তে গ্রুপ খোলেন তারা। সেখানে প্রশ্ন দিবে এমন আশ্বাস দেওয়া গ্রুপেও সদস্য হন সেই প্রশ্ন বিক্রেতারা। এরপর পরীক্ষা শুরুর আগের দিন অনলাইনে বসে শত শত গ্রুপও ম্যাসেঞ্জারে যোগাযোগ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে প্রশ্ন বা হাতে লেখা প্রশ্নের ছবি মিলে যায়। এরপর নিজস্ব পেজ ও গ্রুপে ঘোষণা দিয়ে সে প্রশ্ন বিক্রি করে ওই শিক্ষার্থীরা। এ ধরনের অপকর্মে জড়িতরা সবাই তথ্যপ্রযুক্তিতে (আইটি) দক্ষ। যারা প্রশ্ন সরবরাহ করে তাদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চিনেন না বিক্রেতারা। তারা গ্রুপে ঢুকে প্রশ্নের ছবি দিয়ে ‘কাটআউট পদ্ধতিতে’ বেরিয়ে যায়। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত ১১জনকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এমনই তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তাদের মধ্যে চারজন এক দিনের রিমান্ড শেষে আজ মঙ্গলবার আদালতে হাজির করা হয়েছে। সাতজনকে বুধবার রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হবে। 
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত ১৪জন এবং সন্দেহভাজন আরো কয়েকজনের সূত্রে প্রশ্ন সরবরাহ করা অর্ধশতাধিক গ্রুপ শনাক্ত করেছে ডিবি। এসব গ্রুপে ছবি তুলে একজন প্রথমে দেয়। এরপর বিক্রি চলে। স্কুল বা শিক্ষা বিভাগে সম্পৃক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের হাত থেকেই প্রশ্ন ফাঁস হয় বলেই ধারনা করছেন তদন্তকারীরা। এ কারণে প্রযুক্তির পাশাপাশি ম্যানুয়ালি তদন্তও চলছে। গত বছর ছয় শিক্ষককে গ্রেপ্তারের পর পাওয়া তথ্যের সূত্রেও তদন্ত চলছে বলে জানা গেছে।  

ডিবির এক কর্মকর্তা গতকাল পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শেষ ধাপে যেতে চাইছি আমরা। ধরণা করছি, সেখানে শিক্ষক বা প্রেসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী থাকতে পারে। গ্রেপ্তারকৃত ১৪ শিক্ষার্থী বা প্রশ্ন বিক্রেতার যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে তারা নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপ থেকে প্রশ্ন পেয়েছে। এরপর বিক্রি করেছে আলাদা গ্রুপে। বিক্রেতা গ্রুপগুলোর সূত্র ধরেই প্রশ্ন ফাঁসকারীকে খোঁজা হচ্ছে। বেশ কিছু ফেইক (ছদ্ম) নাম পাওয়া গেছে। এগুলো ধরে তদন্ত চলছে।’ 

গত শনিবার ১৪ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় চারটি মামলা হয়। শেরেবাংলানগর থানায় পুলিশের দায়ের করা মামলায় তিন ভাই- আমান উল্লাহ, বরকত উল্লাহ, আহসান উল্লাহ এবং শাহাদাত হোসেন স্বপনকে রবিবার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।যাত্রাবাড়ী থানায় পুলিশের অপর মামলায় রাহাত ইসলাম,  সালাউদ্দিন, সুজন, জাহিদ হোসেন, সুফল রায় শাওন, আল আমিন ও সাইদুল ইসলামের দুই দিনের মঞ্জুর করেন আদালত। এদিকে শনিবার শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় গভমেন্ট ল্যাবটেরি স্কুল কেন্দ্র থেকে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুলের পরীক্ষার্থী তাহসিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। হাজারীবাগ থেকে আরেক পরীক্ষার্থী আবিরকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এই দুই পরীক্ষার্থীর সহযোগী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের রিমান্ড চায়নি পুলিশ। 

ডিবির সূত্র জানায়, ইন্দিরা রোডের মেসে থাকা তিন ভাই ‘এসএসসি এক্সাম কোয়েশ্চেন ২০১৮’ নামে একটি ফেসবুক পেজে ঘোষনা দিয়ে প্রশ্নপত্র বিক্রি করলেও তাদের রয়েছে একাধিক ফেসবুক একাউন্ট। তারা বেশ কয়েকটি গ্রুপে সক্রিয় ছিল। আমান উল্লাহ আইটি ইঞ্জিনিয়ার এবং বরকত উল্লাহও কম্পিউটারে পারদর্শী। সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আহসান উল্লাহ ফেসবুকে পাঁচটি অ্যাকাউন্ট খুলে ফলোয়ার তৈরি করতেন। এতে কয়েক লাখ ফলো তৈরি হয়। অন্যদিকে বেশ কয়েকটি আইডির ফলোয়ার তিনি। তার সঙ্গে সম্পৃক্ত তিনটি আইডির সন্ধান পেয়েছে গোয়েন্দারা।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, আইটিতে দক্ষ কিছু শিক্ষার্থী অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। তারা গ্রুপগুলোতে বার্তা দিয়ে এক পর্যায় নিজেরাই প্রশ্ন পেয়ে যায়। ভুয়া প্রশ্নও পায়। এরপর প্রকৃত প্রশ্ন ফাঁসকারীর সংশ্লিষ্ট ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে সম্পৃক্ত হয়। সেখানে ইমোতে কথাও বলে। পরীক্ষার আগের দিন থেকেই অনলাইনে প্রশ্ন খুঁজতে থাকে তারা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরীক্ষার সকালে যায়। দু-একটি ঘটনায় একদিন আগে হাতে লেখা প্রশ্ন পায় তারা, যা হুবুহু মিলে গেছে।

সূত্র জানায়, যারা প্রশ্ন ফাঁস করছে তারা প্রশ্ন বিক্রি করা এবং প্রশ্ন সরবরাহ করা গ্রুপগুলোর অ্যাডমিন হয় না। তারা সেসব গুপে ঢুকে ছবি দিয়ে চলে যায়। ভুয়া নামে আইডি করেছে তারা। এমন কয়েকটি গ্রুপ ও আইডি নিয়ে কাজ করছে ডিবি। সূত্রমতে, গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসে জড়িত থাকারঅভিযোগে ছয় শিক্ষক ও প্রেস কর্মচারীসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সেই সূত্রে এবারও তদন্ত করা হচ্ছে। 

যাত্রবাড়ীর দক্ষিন কাজলার রাহাত ইসলাম দনিয়া বিশ্ববিদ্যলয় কলেজের অনার্সের ছাত্র। ‘এএসসি এ্যান্ড এইচএসসি এক্সাম ২০১৮ অল বোর্ড রিয়েল কোশ্চেন হেল্পলাইন’, ‘এএসসি এক্সম ২০১৮ অল বোর্ড রিয়েল কোয়েশ্চেন হেল্পলাইন সেন্টার’ এবং ‘ডিগ্রি অনার্স’স রিয়েল কোয়েশ্চন হেল্পলাইন সেন্টার’ নামে পেইজে প্রশ্ন ফাঁস করছিলেন। তিনি প্রশ্ন পেয়েছেন ‘পিএসসি জেএসসি এএসসি এইচএসসি এক্সাম হেল্পলাইন সেন্টার’ ‘‘পিএসসি জেএসসি এএসসি এইচএসসি ডিগ্রি অনার্স মাস্টার্স এডমিশন টেস্ট বিসিএস জব কয়েশ্চেন আউট’ নামের গ্রুপে। এভাবে প্রত্যেকেই আলাদা গ্রুপে প্রশ্ন পেয়েছেন।

জানতে চাইলে ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার গোলাম সাকলাইন বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসে সরাসরি কারা জড়িত তা শনাক্ত করতে আমরাসহ ডিবির একাধিক টিম কাজ করছে। কিছু তথ্যও পাওয়া গেছে। সে সূত্র ধরে আমরা এগুচ্ছি।’



মন্তব্য