kalerkantho


রোহিঙ্গা সংকটে অনেকের লাভ!

মেহেদী হাসান    

২০ জানুয়ারি, ২০১৮ ১৫:০৬



রোহিঙ্গা সংকটে অনেকের লাভ!

ফাইল ফটো

বিবৃতি আর নিন্দা জানানোর মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর কিছুটা চাপ প্রয়োগ করা ছাড়া রোহিঙ্গা গণহত্যা ঠেকাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নিতে পারেনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি করিয়েছে মিয়ানমারকে। স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের বিষয়েও সমঝোতায় এসেছে দেশটি। কিন্তু সেই সমঝোতা অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন উদ্যোগ শুরু হওয়ার পর এ নিয়ে উদ্বেগ জানাতে শুরু করেছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠীও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করাতে চাইছে।

স্থানীয় কূটনীতিকরা বলছেন, তাঁদের এ উদ্বেগে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে প্রকারান্তরে নিরুৎসাহ করতে পারে। রোহিঙ্গারা যদি মিয়ানমারে ফিরে না যায় তবে কখনই এ সংকটের সমাধান হবে না।

আরো পড়ুন: অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেবে না ঢাবি

মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিয়ানমারের বোঝা বাংলাদেশের ওপর চেপেই আছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিয়ে এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনেকে উদ্বেগ জানাচ্ছে। কিন্তু তারা কি কোনো সমাধান দিতে পারছে?’ সাবেক ওই রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই। এ কারণেই প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়াটা জরুরি। সীমিত সংখ্যায় হলেও যাওয়া শুরু হলে আমরা বুঝতে পারব যে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে। তখন সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া যাবে।’

সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা বলেন, রোহিঙ্গাদের যে মূল সংকট অর্থাৎ তাদের নাগরিকত্বহীনতা, নাগরিক ও সামাজিক সুবিধা থেকে বঞ্চনা—এগুলোর সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে। অতীত সময়ে এগুলো সমাধানের কোনো রূপরেখা ছিল না। অং সান সু চির সরকার প্রথমবারের মতো এ সমস্যার সমাধানে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি কমিশন গঠন করেছে এবং তাঁদের সুপারিশও তারা গ্রহণ করেছে। মিয়ানমার সরকার সেই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। বাংলাদেশও মিয়ানমারকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের যে উদ্যোগ তা আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গোষ্ঠী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করাতে চায়। তারা রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ মর্যাদা ও তৃতীয় কোনো দেশে (বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বাইরে অন্য কোনো দেশে) পাঠাতে চায়। এর পেছনে বিরাট এক কায়েমি স্বার্থ আছে। তিনি আরো বলেন, ‘এ দেশেরও অনেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)—যাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, তারাও এ ইসু্যুতে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। আমি মনে করি, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা দরকার। শুরু না হলে তারা অজুহাত পেয়ে যাবে।’ এম শাহীদুজ্জামানও মনে করেন, তৃতীয় সব পক্ষেরই নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। তাদের কেউ তো কোনো সমাধান দিতে পারছে না।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের ওপর চাপ বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ক্রমাগত অনুরোধ জানিয়ে আসছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গত সপ্তাহে নয়াদিল্লি সফরের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা করেন এবং সমর্থন চান।

আরো পড়ুন: জাতীয়করণের দাবিতে শিক্ষকদের অনশন অব্যাহত

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রোহিঙ্গা গণহত্যা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সবাই সংকটের সমাধান চায়। এ নিয়ে চীন এবং ভারতও মিয়ানমারকে সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এবং তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া দেখতে চায় বলেই শরণার্থী হিসেবে প্রাপ্য প্রায় সব সুবিধা দেওয়ার পরও তাদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলাদেশ মনে করে, এতে তাদের ফিরে যাওয়া নিয়ে আরো অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করছে।

রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, অতীতেও এমন সংকটের সময় তাদের ভূমিকা তেমন নিরপেক্ষ ছিল না। রোহিঙ্গারা যাতে মিয়ানমারে নাগরিক সুবিধা নিয়ে থাকতে পারে এ বিষয়ে তারা ওই দেশটিকে তেমন কোনো চাপ দেয়নি। অথচ মিয়ানমারের রাখাইনে কোনো সমস্যা হলেই রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিতে বাংলাদেশকে চাপ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শরণার্থী বা শরণার্থীর মতো পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপদ স্থানে আনা এবং পরবর্তী সময়ে তাদের প্রত্যাবাসন করা—এ দুটি তাদের কর্মপরিধির অংশ। কিন্তু তারা রোহিঙ্গাদের আনতে যতটা আগ্রহী, ফেরত পাঠাতে ততটা আগ্রহ দেখায় না। রোহিঙ্গা না থাকলে তাদের কাজের সুযোগ থাকবে না।

ওই কূটনীতিক আরো বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢল নামার ফলে দেশি-বিদেশি অনেক সংস্থার বিশাল কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা অনেক বেসরকারি সংস্থা রাতারাতি মানবিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বিদেশিদের সহযোগিতা আসছে বেসরকারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে। যত দিন রোহিঙ্গারা থাকবে তত দিন তাদের নিয়ে ওই সংস্থাগুলোর কাজের সুযোগ থাকবে। 


মন্তব্য