kalerkantho


মার্চের মধ্যে গণশুনানির দাবি

স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি ২৭ পরিবারের

নিজস্ব প্রতিবেদক    

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:১৮



স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি ২৭ পরিবারের

কারো সন্তান, কারো বাবা, কারো বা স্বামী নিখোঁজ রয়েছেন দীর্ঘদিন। স্বজনদের এমন অনুপস্থিতির বেদনা বুকে নিয়ে গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে জমায়েত হয়েছিলেন অনেকেই। ছবি : কালের কণ্ঠ

তাদের স্বজন নিখোঁজ হয়েছেন চার বছর আগে। পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষায় আছে প্রিয়জনের ফিরে আসার। কিন্তু কারো সন্তান, কারো ভাই, কারো স্বামী আর ফিরে আসে না। দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে সেই স্বজনরা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে গতকাল রবিবার সকালে জড়ো হয়েছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের হলরুমে। সেখানে তারা নিখোঁজ বা গুম হওয়া স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানায়। তাদের ব্যানারে লেখা ছিল ‘সন্তানহারা মাদের চার বছর অতিবাহিত; অপেক্ষার শেষ কোথায়? মায়ের ডাক—সন্তানদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দাও। ’ ওই সময় অনেকের কোলে শিশুদেরও দেখা যায়। অনেকের হাতে ছিল হারানো স্বজনের ছবি।

অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ক্ষেত্রে আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন চার বছর আগে নিখোঁজ হওয়া সাজেদুল ইসলামের মা হাজেরা খাতুন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পরিচালক সি আর আবরার, মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন, মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের পরিচালক নাসিরউদ্দিন এলান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে আগামী মার্চ মাসের মধ্যে গণশুনানির দাবি জানানো হয়েছে।

সাজেদুল ইসলামের মা হাজেরা খাতুন বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছেলেটাকে ফেরত চাই। আমি আমার মৃত্যুর আগে ছেলেটাকে দেখতে চাই। ’ ওই সময় অন্যরাও কান্নায় ভেঙে পড়ে।

লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান নিখোঁজ সাজেদুল ইসলামের বোন মারুফা ইসলাম। তিনি বলেন, ‘‘পরিবারের সামনে থেকে আমাদের ভাইদের, সন্তানদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রশাসন তুলে নিয়ে গেলেও তারা বলছে, ‘কিছু জানি না। ’ আমরা যেন পরের বছরও একই দাবিতে সমবেত না হই, এ জন্য সরকারের আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করছি। ’’ তিনি আরো বলেন, ‘আজ আমাদের গুম পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিত হতে হচ্ছে। এই বিচার চাইতে গুম হওয়া মুন্নার বাবা, পারভেজের বাবা মারা গেছেন। পিন্টুর মা ও আমার মা অসুস্থ। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারের আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করছি। ’

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানান, ফরহাদ মজহারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে তিনি বুঝতে পেরেছেন পুলিশ ও র্যাবের সক্রিয়তার কারণে তাঁকে ফেরত পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ‘ফরহাদ মজহারের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে অন্য কোনো শক্তি কাজ করেছিল। তাই পুলিশ ও র্যাবকে সক্রিয় থাকার জন্য জোর অনুরোধ জানাচ্ছি। ’

মাহমুদুর রহমান মান্না দেশে গুম অস্বীকার করার সংস্কৃতি গড়ে উঠছে জানিয়ে বলেন, প্রতিবছর এভাবে শোকবিহ্বল পরিবেশে গুমের শিকার পরিবারগুলো সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানায়। কিন্তু এই আহ্বান কারও কানে পৌঁছায় না। এসব গুম রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতেই করা হচ্ছে।

একটি ভয়ের আবহাওয়া ও পরিস্থিতি নিয়ে স্বজন হারানো মানুষজন এখানে এসেছে বলে মন্তব্য করেন সি আর আববার। তিনি বলেন, ‘যারা গুমের পেছনে জড়িত, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক। গুম পরিবারগুলোর যে অভিযোগ রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার জবাব দেওয়া। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে তারাই এখন নীরব। ’

নূর খান লিটন বলেন, ‘আমরা বিচারের নায্যতায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সেই পরিস্থিতিতে আমরা মার্চ মাসের মধ্যে গণশুনানির দাবি জানাচ্ছি। ’

নাসিরউদ্দিন এলান বলেন, ‘গুমের ট্রেন্ড চেঞ্জ হয়েছে। ২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত দেখা যেত প্রশাসন পরিচয় দিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। এখন উধাও হয়ে যাচ্ছে। নিখোঁজ না মারা গেল, নাকি গুম তা বোঝা যায় না। ’

সাংবাদিক উত্পল দাস না ফিরলে আন্দোলন সাংবাদিক উত্পল দাস নিখোঁজ হওয়ার দুই মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল। দুই মাসেও তাঁকে উদ্ধার করতে না পারায় সাংবাদিক নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, প্রয়োজনে হরতাল আহ্বান করা হবে। গতকাল দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) কার্যালয় চত্বরে আয়োজিত এক মানববন্ধনে অংশ নিয়ে তাঁরা এ কথা বলেন। এতে অংশ নেন ডিআরইউ, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নসহ (বিএফইউজে) বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতা ও সদস্যরা।

ডিআরইউ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের উত্পল আজ দুই মাস ধরে নিখোঁজ, আমরা প্রতিদিন তাঁর জন্য দাঁড়াচ্ছি। আমাদের একটাই দাবি, আমাদের মাঝে উত্পল দাসকে ফিরিয়ে দিন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনার দায়িত্ব অনেক, আপনি দায়িত্বহীনভাবে কাজ করছেন। সাংবাদিক উত্পলের মতো নিখোঁজের ঘটনায় সরকার প্রশ্নবিদ্ধ। আপনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে দ্রুত তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ’

ডিআরইউর সাধারণ সম্পাদক শুক্কুর আলী শুভ বলেন, ‘আমরা উত্পলকে ফিরে পেতে চাই। এভাবে উত্পলকে আমরা হারাতে চাই না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের এজেন্সিগুলোর কাছে আমাদের অনুরোধ, উত্পলকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন। ’

বিএফইউজের যুগ্ম মহাসচিব অমিয় ঘটক পুলক বলেন, ‘প্রয়োজনে এক দিন অন্তত এক ঘণ্টার জন্য হলেও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় আমরা হরতাল পালন করব। প্রয়োজনে আইজির কার্যালয় ঘেরাও করব। আপনারা ভাববেন না, আমরা এই রকম কর্মসূচি অতি শিগগিরই দেব। ’

 

 


মন্তব্য