kalerkantho


নিহতদের স্মরণ

তাজরীন ট্রাজেডির পাঁচ বছর: দোষীদের বিচার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)    

২৪ নভেম্বর, ২০১৭ ২০:৩০



তাজরীন ট্রাজেডির পাঁচ বছর: দোষীদের বিচার দাবি

বাংলাদেশের সকল কারখানার পূর্ণ নিরাপত্তা, তাজরীন মালিক দেলোয়ার ও শ্রমিক হত্যায় জড়িতদের বিচারসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ বছর পূর্তি পালন করেছে নিহত শ্রমিকদের স্বজন, আহত শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

আজ শুক্রবার সকাল ৮টায় তাজরীনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কারখানাটির সামনে অস্থায়ী বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের আয়োজনে র‌্যালি ও শ্রমিক সমাবেশ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডে ১১৩ শ্রমিক হত্যার দায়ে অভিযুক্ত কারখানা মালিক দেলোয়ার হোসেন এখন আয়েসি জীবনযাপন করছেন। হত্যার শিকার হওয়া শ্রমিক পরিবারের সসদ্যরা গত পাঁচ বছরেও বিচার পাননি। অভিযুক্ত মালিক দেলোয়ারের বিচার নিয়ে এখনও টালবাহানা চলছে।

অবিলম্বে তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে বক্তারা বলেন, "বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে এবং অর্থনীতিতে যে শ্রমিকদের এত অবদান তাদের জীবন নিয়ে বারবার ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে হবে, কারখানায় কারখানায় তাদের নিরাপদ পরিবেশে কাজ দিতে হবে। আগুনে পুড়ে ভবন ধসিয়ে তাদের অবকাঠামোগত হত্যার শিকার বানানো চলবে না অর্থাৎ হত্যা করা বন্ধ করতে হবে। "

বক্তারা বলেন, স্পেকট্রাম, গরিব অ্যান্ড গরিব, হামীম গ্রুপ, তাজরীন ফ্যাশানস, স্মার্ট গার্মেন্ট ও রানা প্লাজা ইত্যাদি যত কারখানায় যত হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে তারা কি কেবল পরিচয়হীন সংখ্যায় পরিণত হতে থাকবে? তাদের কবরে আজকে শুধু নম্বর প্লেট ঝোলানো। পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। কাজেই একজন অভিযুক্ত মালিকেরও যদি বিচার হতো তাহলে এ হত্যার ধারাবাহিকতা হয়তো বন্ধ হয়ে যেত।

বক্তারা আরো বলেন, অন্তত একজন অপরাধী মালিকের বিচার করুন তাহলে বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানার নিরাপত্তাহীনতার যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তার অবসান ঘটবে এবং বায়াররাও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো যুক্তি খুঁজে পাবে না। তারা বলেন, কারখানা পরিদর্শকের সংখ্যা বাড়িয়ে নিরাপত্তার বলয় তৈরি করুন- উৎপাদনশীলতা বেড়ে যাবে এবং নিরাপদ শ্রম পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে উন্নত শিল্পই সৃষ্টি হবে। তারা তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং প্রত্যেক নিহত শ্রমিক পরিবারকে ৪৮ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানান।

সমাবেশে, ‘আর কোনো তাজরীন নয়, আর কোন রানা প্লাজা নয়। বাংলাদেশের সকল কারখানার পূর্ণ নিরাপত্তা চাই। গার্মেন্ট শিল্পে পর্যাপ্ত কারখানা পরিদর্শক দিয়ে গার্মেন্টে শ্রমিকবান্ধব ও উন্নত শিল্প পরিবেশ সৃষ্টি করুন; শ্রমিকের যথার্থ ট্রেড ইউনিয়ন চাই, ক্ষতিপূরণের আইন বদল করে ও শ্রমিক নিপীড়ন বন্ধ করার গণতান্ত্রিক শ্রম আইন চাই’- এসব দাবি জানিয়ে শ্রমিক ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন প্লাকার্ড প্রদর্শন ও স্লোগান দেন।

সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার লিমা, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট- সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল কমিটির সভাপতি সৌমিত্র কুমার দাশ, বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন, বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি তুহিন চৌধুরী প্রমুখ।

সকাল থেকে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন নিহত শ্রমিকদের স্বজন ও বেঁচে য়াওয়া শ্রমিকদের নিয়ে কারখানাটির বন্ধ থাকা প্রধান ফটকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানান নেতাকর্মীরা। শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরাম, গার্মেন্ট শ্রমিক ফ্রন্ট, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী লীগ, বাংলাদেশ তৃণমূল গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন, বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, টেক্সটাইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশন, স্কপসহ বেশ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ শ্রমিকরা।

সকালে রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানেও পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে, যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তাজরীন ফ্যাশনের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর রাতে তাজরীন ফ্যাশনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১১১ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা ও সুচিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট আমেনা নামের একজন আহত শ্রমিক চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এর আগে একই বছর ২১ মার্চ দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে সুচিকিৎসার অভাবে মারা যান আরো এক আহত শ্রমিক সুমাইয়া খাতুন।

অগ্নিকাণ্ডের সময় গার্মেন্টটিতে প্রায় হাজারখানেক শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। কারখানায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেও ঘটনার দিন একটিও ব্যবহার করা হয়নি। আগুনের সতর্কসংকেত বাজার পরও কারখানার মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপকরা শ্রমিকদের কারখানা ত্যাগে বাধা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া আগুন লাগার তথ্য গোপন করে শত শত শ্রমিককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।


মন্তব্য