kalerkantho


সংসদে সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ নভেম্বর, ২০১৭ ২১:৩৪



সংসদে সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী

ফাইল ছবি

বিএনপি-জামায়াত জোটের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, যারা জ্যান্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে, জনগণের টাকা চুরি করে বিদেশে পাচার করে, যাদের দুর্নীতিতে আগাগোড়া মোড়া। তাদের জনগণ কেন ভোট দেবে? তারা ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে কীভাবে? যাদের বিবেক আছে তারা অনত্মত ওদের (বিএনপি-জামায়াত) কোনোদিন ভোট দেবে না, ভোট দিতে পারে না।

তাদের ভোট দিয়ে আর অশান্তি টেনে আনবে না। এই আপদকে ফিরিয়ে আনবে না। তাই ওদের স্বপ্ন দেখে কোন লাভ নেই, বড় বড় কথা বলেও লাভ নেই।

আজ বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদের ১৮তম অধিবেশনে সমাপনী ভাষণে তিনি একথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে তিনি আরো বলেন, বলেন, মানুষ শান্তি চায়, উন্নতি চায়। আজ দেশের মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নত হয়েছে, মানুষ শান্তিতে আছে। তাই যারা (খালেদা জিয়া) এতিমের টাকা চুরি করে খায়, দেশকে পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে, অন্তত জনগণ তাদের ভোট দেবে না, দিতে পারে না। এটাই হলো বাস্তবতা।

গুম-খুন প্রসঙ্গে বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুম-খুন নানাভাবেই হচ্ছে, আবার যারা নিখোঁজ হচ্ছে তাদের অনেকে আবার ফেরতও আসছে।

এটা কী শুধু বাংলাদেশে হচ্ছে? যুক্তরাজ্যে ২ লাখ ৪৫ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক গুম হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা আরও ভয়াবহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশে ১৬ কোটির ওপরে জনগণ বাস করে। আমরা এতো মানুষের সেবা করে যাচ্ছি। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর জনসংখ্যা কতো? উন্নতি প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরও তাদের দেশে এতো গুম হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা যখনই অভিযোগ পাচ্ছি তা খতিয়ে দেখছি। দেশে একজন স্বনামধন্য আঁতেল (ফরহাদ মাযহার) আছেন তিনি নাকি গুম হয়ে গেলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তিনি খুলনায় নিউ মার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনা তো অহরহই ঘটছে। তিনি আরো বলেন, আগে দেশের অবস্থা কী ছিল? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছিল অস্ত্রের ঝনঝনানি। আমরা সেই অবস্থার পরিবর্তন করেছি।

বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের নাম উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিতে তাঁর কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে আরেকটি দল আছে (বিএনপি), তারা নির্বাচনে আসেনি। এখন রাসত্মায় রাস্তায় চিত্কার করে বেড়াচ্ছে। বলছে তারা সরকারকে নাকি টেনেই নামাবেন। এটা এমন একজন লোক বললেন তাঁর (মওদুদ) চরিত্র কী? ছাত্রাবস্থায় অন্য একটি দল করতো। ব্যারিস্টারি করে দেশে ফেরার পর দেখলাম আমাদের বাড়ি থেকে নড়েন না। আঁঠার মতো পড়ে থাকেন। তখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর পিএ মোহাম্মদ হানিফ ছিলেন, তার পিএ হিসেবেও এই লোকটা কিছুদিন কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর তিনি বিএনপিতে গেলেন। এরপর গেলেন জাতীয় পার্টিতে। তিনি দুর্নীতির দায়ে অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। আবার জেনারেল এরশাদ চলে যাওয়ার পর আবারও গেল বিএনপিতে। তিনি বনানীতে চিটিং করে অবৈধভাবে একটি বাড়ি দখল করেছিলেন। আদালতের রায়ে সেই বাড়িটি হারিয়েছেন। এখন সেই ব্যক্তিটিই ঘোষণা দেন সরকারকে নাকি টেনেই নামাবেন। যিনি নিজেই মাটিতে পড়ে আছেন, তিনি কীভাবে টেনে নামাবেন?

বিএনপি-জামায়াতের সরকার উত্খাত ও নির্বাচন বানচালের নামে দেশজুড়ে ভয়াল নাশকতার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারকে পতন না ঘটিয়ে তিনি ঘরে ফিরে যাবে না। ৯২ দিন ধরে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। নির্বাচন ঠেকানোর নামে ৫৮২টি শিড়্গা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়েছে, ২৭ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে হত্যা করেছে। জনগণের বাধায় বাধ্য হয়ে শুধু ঘরেই ফিরে যাননি, আদালতে আত্মসমর্পণ করে ঘরে ফিরেছেন। তিনি বলেন, যারা এভাবে মানুষ খুন করেছেন, যাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে অর্থ পাচারের ঘটনা প্রমাণ হয়েছে, যিনি নিজে এতিমের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। যাদের দুর্নীতিতে আগাগোড়া মোড়া, জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করেছে, যারা সারাদেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছিল ক্ষমতায় থাকতে। যাদের এতো গুণ তাদের জনগণ ভোট দেবে কেন? জনগণকে কী ভোট দিয়ে জ্যানত্ম মানুষকে যারা পুড়িয়ে হত্যা করে সেই আপদকে আবার ফিরিয়ে আনবে? মানুষের জীবনকে আবার দুর্বিষহ করে তুলবে?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তখনই আইপিইউ ও সিপিইউ মতো সারাবিশ্বের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। তাঁরা এই দুটি বৃহৎ সংস্থায় বাংলাদেশের দু'জন সংসদ সদস্যকে সভাপতি নির্বাচিত করেছেন, এটা একটা বিরল ঘটনা। আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি, সেটা বিশ্বের জনপ্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এসে দেখে গেছেন। অনেকে বলে নির্বাচন অবৈধ। এটা শুনে মনে হয়, যারা একথা বলে শুধু তাদেরই জ্ঞানের ভান্ডার আছে। আর বিশ্বের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যারা আমাদের দু'জনকে নির্বাচিত করলেন তাদের মনে হয় কোনো জ্ঞান নেই। তারা যেন না জেনেই বাংলাদেশকে ভোট দিয়ে গেলেন। দুটি সম্মেলনই অত্যন্ত সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সারাবিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি বাংলাদেশে কীভাবে গণতন্ত্রের চর্চা হয়। বিশ্বের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও তা দেখে গেছেন, তা দেখে গেছেন।

রোহিঙ্গা সমস্যা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার স্বীকার করেছে তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে। সমঝোতা সাক্ষর হয়েছে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে যেৌক্তিক কারণে সমস্যার সমাধান করছি। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছি। সারাবিশ্ব অবাক প্রায় ১০ লাখ মানুষের খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা করতে পেরেছি। সারাবিশ্ব আমাদের পক্ষে এবং সমর্থন দিচ্ছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে, একটি মানুষ গৃহহীন থাকবে না, প্রত্যেকে পেটভরে খাবে, উন্নত জীবন পাবে- সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ২০২১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে আমরা গড়ে তুলবোই।

সরকরের উন্নয়ন ও সফলতা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, দেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। হতদরিদ্র্যের হারও কমে গেছে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছি বলেই সুফল জনগণ পাচ্ছে। ৮ বছরের মধ্যে ২৫ হাজার কিলোমিটার রাস্তা করেছি, পদ্মাসহ ৪৮টি বৃহৎ সেতু নির্মাণ করেছি। কর্ণফুলীর নিচে ট্যানেল নির্মাণ করছি। রেলকে আমরা নতুনভাবে জীবন দিয়েছি। খাদ্য উত্পাদনে বিশ্বের তৃতীয় এবং মিঠা মাছ উত্পাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। দেশে বেকারত্ব হ্রাস পেয়েছে, দেশে-বিদেশে দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। সমগ্র বাংলাদেশকে আমরা ইন্টারনেটের আওতায় নিয়ে এসেছি।

বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, পরমাণু বিদু্যত কেন্দ্র অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন। বর্জযটা রাশিয়া নিয়ে যাবে, এটা নিয়ে দুঃচিন্তার কোনো কারণ নেই। জার্মানির শহরের ভেতরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। পরিবেশের কোনো ক্ষতি হলে আমরা তা করতাম না। আমাদের দেশে কিছু মানুষ আছে, তারা সবকিছুই বাঁকা চোখে দেখে, কোনো কিছুই তাদের ভালো লাগে না। এরা কী বললো, তাদের কথা শুনে তো দেশের উন্নয়ন বন্ধ করে দিতে পারি না। দেশের মানুষকে আমাদের বিদ্যুৎ দিতে হবে। দেশের ৮০ ভাগ মানুষ এখন বিদ্যুৎ পাচ্ছে। শতভাগ মানুষের বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার যে জনগণের সেবক সেটা আমরা প্রতিষ্ঠ করতে সক্ষম হয়েছি। গত ৮ বছরে বাংলাদেশকে আমরা আর্থ-সামাজিকভাবে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি, বাংলাদেশকে আর ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে দেখে না। বরং সারাবিশ্বে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। জনগণের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস থাকতে হবে। ক্ষমতাটা যদি ভোগের বস্তু হয় তারা জাতিকে কিছু দিতে পারে। আমাদের কাছে ক্ষমতা ভোগের নয়, বরং কল্যাণে কাজ করছি বলেই দেশের এমন অগ্রগতি হয়েছে।  


মন্তব্য