kalerkantho


ভাষাসংগ্রামী তকীয়ূল্লাহ আর নেই, শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ নভেম্বর, ২০১৭ ০৪:১১



ভাষাসংগ্রামী তকীয়ূল্লাহ আর নেই, শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন

ছবি: কালের কণ্ঠ

জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর পুত্র ভাষাসংগ্রামী মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ আর নেই। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা ১০ মিনিটে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। বেশ কয়েকদিন তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা কমিটির প্রকাশ্য টিমের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তকীয়ূল্লাহর মরদেহ হাসপাতাল থেকে ৩টায় তাঁর বাসায় এবং পরে বিকেল ৪টায় সিপিবি'র কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তিভবনে আনা হয়। সেখানে কাস্তে-হাতুড়ি খচিত কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকা দিয়ে প্রয়াতের মরদেহ ঢেকে দেওয়া হয়। এ সময় শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সিপিবি, বাংলা একাডেমি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, যুব ইউনিয়ন, নারী সাংবাদিক কেন্দ্র, গেরিলা ১৯৭১ ফাউন্ডেশন, সাপ্তাহিক একতাসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। শ্রদ্ধা নিবেদন ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে 'কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল' গেয়ে কমরেড তকীয়ূল্লাহকে সিপিবি অফিস মুক্তিভবন থেকে বিদায় জানানো হয়।

মুক্তিভবনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তৃতা করেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান ও তকীয়ূল্লাহর মেয়ে সাংবাদিক শান্তা মারিয়া। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুল্লাহ ক্বাফি রতন।

সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা বলেন, কমরেড তকীয়ূল্লাহ তাঁর জীবন উত্সর্গ করেছেন সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।

ভাষা আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন। গবেষণার ক্ষেত্রেও তাঁর মৌলিক অবদান রয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব থেকে সরে গেলেও আদর্শের প্রতি, পার্টির প্রতি তিনি সব সময় অবিচল ছিলেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও তিনি পার্টির কথা, আদর্শের কথা বলেছেন। এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে তাঁর নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লড়াইকে এগিয়ে নিতে হবে।

তকীয়ূল্লাহর সংক্ষিপ্ত জীবনী : জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর চতুর্থ পুত্র আবুল জামাল মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ। ভাষা আন্দোলনকে যাঁরা সংগঠিত করেছেন এবং এই আন্দোলনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ তাঁদের অন্যতম। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ এবং এলএলবি পড়ার সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৪৮ সালে পাকিসত্মান সেনাবাহিনীতে কমিশন অফিসার হিসেবে নিয়োগের জন্য ইন্টারসার্ভিস সিলেকশন বোর্ড (আইএসএসবি) কর্তৃক নির্বাচিত হন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কারণে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি।

১৯৪৯ সালে রাজনৈতিক কর্মতত্পরতার জন্য তকীয়ূলস্নাহ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন। তাঁর নামে হুলিয়া জারী হওয়ায় আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ভাষার অধিকারসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৫১ সালে গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তিনি তখন কমিউনিস্ট পার্টির ঢাকা জেলা কমিটির প্রকাশ্য টিমের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দি ছিলেন। ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আবার গ্রেপ্তার হন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, তাজউদ্দিন আহমেদ প্রমুখের সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ২৬ নম্বর সেলে বন্দি ছিলেন। পরবর্তীতে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে এসে বিভিন্ন ধরনের গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সূচিত ও বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত বাংলা বর্ষপঞ্জির ব্যাপক সংস্কার করেছেন মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ। সরকার অনুমোদিত এই বর্ষপঞ্জি বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত আছে। তকীয়ূল্লাহ প্রস্তাবিত পদ্ধতিতেই ১৪০২ বঙ্গাব্দ থেকে বাংলা সনের বর্ষপঞ্জির দিন তারিখ গণনা করা হচ্ছে। তিনি চার হাজার বছরের বাংলা, ইংরেজি ও হিজরি ক্যালেন্ডার তৈরি করেছেন। তিনি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবনীর পাশাপাশি জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের বিকাশ সম্পর্কে লেখালেখি করেছেন। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের যে চারটি মাত্র আলোকচিত্র পাওয়া যায় তা তকীয়ূল্লাহর তোলা। তাঁর আত্মজীবনী 'পলাতক জীবনের বাঁকেবাঁকে' ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়।


মন্তব্য