kalerkantho


সিপিডির প্রতিবেদন

বন্যায় ক্ষতি ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ অক্টোবর, ২০১৭ ০৬:২৪



বন্যায় ক্ষতি ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে

চলতি বছর এপ্রিলে হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় প্রথম দফা এবং জুনে দ্বিতীয় দফায় ৩২ জেলায় বন্যায় ১৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ক্ষতির পরিমাণ ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

আর জুনের শেষ থেকে আগস্টে ৩২ জেলায় বন্যায় ৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে। তবে হাঁস-মুরগি ও মসজিদ মাদরাসাসহ কয়েকটি খাত বিবেচনায় নিলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।  

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিপিডি। সংস্থাটির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, অর্থনীতিবিদ ড. এম আসাদুজ্জামান ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েটস জাফর সাদিক ও ইশতিয়াক বারী।  

অনুষ্ঠানে পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, বন্যা-পরবর্তী সংস্কার কাজে সারা দেশে মোট বরাদ্দ ৪২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে হাওর এলাকায় রাস্তা সংস্কারে বরাদ্দ মাত্র ২০ কোটি টাকা।

সুতরাং এখানে হরিলুটের সুযোগ নেই।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, হাওর অঞ্চলের ছয় জেলার ৬০টি উপজেলায় বন্যায় ৪৬ লাখ ৬৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এতে ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতির হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে ফসলের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। বোরো মৌসুমে কৃষকের ১৫ দশমিক ৮ লাখ টন ফসল নষ্ট হয়েছে। শতকরা হিসাবে যা বোরো উত্পাদনের ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে চালের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে বন্যার নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

অন্যদিকে জুন থেকে আগস্টে বন্যায় ৩২ জেলার এক হাজার ৩২৪টি উপজেলায় ৮২ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা ওই জেলাগুলোর মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ। আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৯ হাজার ৮শ’ কোটি টাকার। এর মধ্যে ঘর-বাড়ি ভেঙে যাওয়ায় দু’হাজার ৬শ’ কোটি টাকা; রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ও বাঁধ ভেঙে চার হাজার ৫শ’ কোটি টাকা এবং ফসলের ২ হাজার ৭শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।  

বক্তারা বলেন, দ্বিতীয় দফা বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে দশমিক ৪৪ শতাংশের সমান। চলতি বছরে এই পরিমাণ জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমতে পারে। তবে এই ক্ষতির মধ্যে গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, টিউবয়েল ও স্যানিটেশনের ক্ষতি ধরা হয়নি। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির এবং মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে। এগুলোর হিসাব যোগ হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। তবে এবারের বন্যায় মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। দু’দফা বন্যায় মারা যাওয়া ১৫৭ জনের বেশিরভাগেরই আবার মৃত্যু হয়েছে সাপের দংশনে।

মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারের সহায়তা পর্যাপ্ত ছিল না। সরকার ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের ৩০ কেজি করে চাল দিয়েছে। তবে মাত্র ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ এই সহায়তা পেয়েছে। আবার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সহায়তা পৌঁছেলেও তুলনামূলকভাবে কম বন্যা-আক্রান্ত এলাকায় তা পৌঁছেনি। বন্যার ক্ষতি মোকাবেলায় স্বল্প ও মধ্য মেয়াদি কিছু সুপারিশ করেছে সিপিডি। এর মধ্যে শস্য উত্পাদনে প্রণোদনা অন্যতম।  

আইনুন নিশাত বলেন, ‘বন্যা-উপদ্রুত জামালপুর ও শেরপুরে এখনও মানুষ বাঁধের ওপর বসবাস করছে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও বাঁধ সংস্কারের নামে কিছুদিন পরই হরিলুট শুরু হবে। এটি বন্ধ করতে হবে। রাস্তাঘাট নির্মাণসহ সংস্কার কাজ এমন লোকদের দিয়ে করাতে হবে, যাতে এই খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরাসরি ওই লোকগুলোর ওপর প্রভাব পড়ে। ফলে নিজেদের কাজ মনে করে এরা ভালভাবে করবে। আর সংসদ সদস্যদের এই কাজ থেকে দূরে রাখতে হবে। ’

আইনুন নিশাতের বক্তব্যের রেশ ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণে শত শত কোটি টাকা লুটপাটের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হল এই খাতে সারা দেশে মোট বরাদ্দ ৪২০ কোটি টাকা। ফলে এ ধরনের কল্প-কাহিনী সত্য নয়। ’ তিনি বলেন, ‘বাঁধ নির্মাণের পর সেখানে বাড়িঘর নির্মাণ করে মানুষ বসবাস শুরু করে। আর বাড়িঘর হলেই সেখানে ইঁদুর চলে আসে। সেই ইঁদুর বাঁধের ক্ষতি করে। ’

ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু আইনুন নিশাতের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, ‘সংসদ সদস্যরা জনপ্রতিনিধি। তারা এলাকার উন্নয়নে সম্পৃক্ত থাকেন। তাদেরকে উন্নয়নমূলক কাজ থেকে দূরে রাখার কথা কেন এলো বুঝতে পারছি না। ’


মন্তব্য