kalerkantho


সাবেক স্ত্রীকে হত্যার পর ফেসবুকে অন্যদের হুমকি! কে এই রবিন?

আহ্সান কবীর   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ২০:০০



সাবেক স্ত্রীকে হত্যার পর ফেসবুকে অন্যদের হুমকি! কে এই রবিন?

“একটা আয়ানাতে একা আমিই ছিলাম,

হাত থেকে পড়ে শত শত আমি হলাম। ”

এটি একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস।

স্ট্যাটাস যিনি দিয়েছিলেন, তিনি শত অংশে বিভক্ত হননি, কিন্তু প্রাণহীন হয়ে পড়ে ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে।  

গত ৯ ফেব্রুয়ারি নিজের ফেসবুক ওয়ালে ওপরের স্ট্যাটাসটি কাভার ফটো হিসেবে দিয়েছিলেন তরুণী ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফা জামান ওরফে আরিফুন্নেছা (২৭)। আজ ১৬ মার্চ (বৃহস্পতিবার) তাকে হত্যা করে তার সাবেক স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিন নিজের ফেসবুক ওয়ালে স্ট্যাটাস দেন এভাবে “বলেছিলাম বাঁচতে দে... জীবন নষ্ট করিস না... এখন বুজো? অনিক, তানজিনা, শিল্পী, রিয়াদ, পলাশ, মাসুদ দেখা হবে মনে রাখিস। । । ” 

খান এফআইরবিন নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নিহতের স্বজন বন্ধুদের উদ্দেশ্যে দেওয়া রবিনের হুমকি

নিহত আরিফা জামান ওরফে আরিফুন্নেছা আরিফা  যমুনা ব্যাংকের পল্টন শাখায় চাকরি করতেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সেন্ট্রাল রোড আইডিয়াল কলেজের সামনে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে রবিন। এ ঘটনা ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি করে এলাকায়।  

রবিনের ব্যাপারে তাৎক্ষণিক খোঁজ-খবরে জানা গেছে, জামালপুরের সদর উপজেলার বাসিন্দা এই ঘাতক মাদকাসক্ত এবং উগ্র মেজাজী।

তার বাবা বেঁচে নাই। তবে মা আছেন। তার বড় ভাই লেলিন একটি ব্যাংকে চাকরি করেন।

সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে জামালপুরে বসবাসরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিহতের এক জ্ঞাতি বোন কালের কণ্ঠকে জানান, আরিফা-রবিনের বিয়েটা ছিল প্রেমঘটিত। তবে বনিবনা না হওয়ায় মাস চারেক আগে তাদের বিচ্ছেদ হয়।

শত কষ্ট লুকিয়ে হাস্যোজ্জ্বল ‍মুখে বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর করতে হবে না আরিফাকে। তার ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া ছবি

নিহত আরিফা জামালপুর সদর উপজেলার আলিমুজ্জামান হেলালের মেয়ে।

নিহতের বান্ধবীর স্বামী ব্যারিস্টার ফিরোজ মোর্শেদ কালের কণ্ঠকে জানান, আরিফা আর রবিন দুজনেই জামালপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা। আরিফা পড়তো জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আর রবিন  জামালপুর জিলা স্কুলে। একইসঙ্গে তারা কোচিংও করতো। সে সূত্রে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু বিয়ের পর রবিনের আচার-আচরণ আরিফাকে হতাশ করে এবং সে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে আসে।  

নিহতের ভাই আহমেদ আলামিন বুলবুল জানান, ৪ বছর আগে রবিনের সঙ্গে আরিফার বিয়ে হয়। ৩ মাস আগে তাদের ডিভোর্স হয়। ডিভোর্স হওয়ার পরও রবিন প্রায়ই তাকে বিরক্ত করত। আজ সকালে আইডিয়াল কলেজের সামনে পৌঁছালে রবিন তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়।

আরিফার সর্বশেষ ‘ফেসবুক কাভার ছবি’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিহতের এক বান্ধবী কালের কণ্ঠকে বলেন, আরিফা ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী ছিল। আটবছরের প্রেমের সম্পর্কের পর চার বছর আগে রবিন-আরিফা বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়।  কিন্তু স্বামীর বাড়িতে যাওয়ার পর বনিবনা না হওয়ায় মাস তিনেকের মধ্যে সে বাপের বাড়ি ফিরে যায়। এরপর সে ঢাকায় এসে ফের পড়ালেখা শুরু করে। সে ইডেন থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে।  

বছরখানেক আগে আরিফা যমুনা ব্যাংকে চাকরিতে যোগ দেয়। ধানমণ্ডির সেন্ট্রাল রোডে আইডিয়াল কলেজের পাশের এক বাসায় সাবলেট থাকা শুরু করে। এর মাঝে আরিফা আর রবিন একবার নিজেদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করে। তবে তা সফল হয়নি।

ঘাতক ফখরুল ইসলাম রবিনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করা হোক- স্বজনদের এটাই দাবি 

রবিনের উগ্রতায় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে মাস তিনেক আগে তাকে তালাক দেয় আরিফা। এটা সে মেনে নিতে পারছিল না।

তিনি আরও জানান, ডিভোর্সের পরও মাদকাসক্ত এবং উগ্র মেজাজের রবিন নিয়মিত বিরক্ত করে আসছিল আরিফাকে। বান্ধবী চাইছিল চাকরি করার পাশাপাশি নিজেকে সামলে নিতে- ফের নতুন করে জীবনকে চালিত করতে। কিন্তু রবিন তা হতে দিচ্ছিল না। বারবার বিরক্ত করায় আরিফা একপর্যায়ে থানায় জিডিও করেছিল।  

এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে আরিফা কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ওৎ পেতে থাকা রবিন ছুরি নিয়ে হামলে পড়ে তার ওপর এবং গলায় আঘাত করে খুঁচিয়ে মারাত্মক আহত করে। উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নেওয়ার পর দুপুর পৌনে ১২টার দিকে মারা যান আরিফা।

সাবেক স্ত্রীকে হত্যার পর রবিন নিজের ফেসবুক ওয়ালের পোস্টে কিছু নামোল্লেখ করে। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে আরিফার বান্ধবী বলেন, এখানে আরিফার দুই ভাই পলাশ ও মাসুদসহ তার খালাতো বোন শিল্পীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া তানজিনা, অনিক, রিয়াদের নাম লিখেছে সে। এরাও কেউ বান্ধবী, কেউ আত্মীয় বা বন্ধু। উগ্র মেজাজের রবিন এর মাধ্যমে তাদেরকেও হুমকি দিয়েছে বলে তিনি জানান।  

তবে স্ট্যাটাসটি কিছুক্ষণ পর রবিনের ওয়াল থেকে মুছে ফেলা হয়।  

কিন্তু মুছে ফেলা হলেও ভয়াবহ ঘাতক রবিনের এমন হুমকিতে তারা শঙ্কায় আছেন বলে জানান। ঘাতককে যেন দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী- এই অনুরোধ করেন তিনি।

ফখরুল ইসলাম রবিন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। তার কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।

ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. জেসমিন নাহার জানান, ঘাড়ে বড় ধরনের আঘাতের কারণে আরিফার মৃত্যু হয়েছে।  

কে এই রবিন

নিহতের বান্ধবীর স্বামী ব্যারিস্টার ফিরোজ মোর্শেদ কালের কণ্ঠকে জানান, আরিফা আর রবিন দুজনেই জামালপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা। আরিফা পড়তো জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আর রবিন  জামালপুর জিলা স্কুলে। রবিনের বাবা আখতারুজ্জামান মুকা মারা গেছেন, তবে মা খেলনা বেগম বেঁচে আছেন। পরিবারে দুই ভাই এক বোনের মধ্যে রবিন দ্বিতীয়। তাদের বাড়ি জামালপুরের বাজারিপাড়ায় সকালবাজার এলাকায়। ২০০৭সালে এসএসসি পাসের পর পরে অ্যাকাউন্টিংয়ে অনার্স করে। সর্বশেষ একটি সিমেন্ট কোম্পানিতে মার্কেটিং বিভাগে চাকরি করতো সে। তবে সেই চাকরি ছেড়ে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে এমবিএতে ভর্তি হয়েছিল।

ঢামেক পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এস আই বাচ্চু মিয়া কালের কণ্ঠকে জানান, সন্ধ্যার দিকে লাশ ময়না তদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হন্তান্তর করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় এখনও মামলা না হলেও ডিবি পুলিশ, র‌্যাব ও কলাবাগন থানার ওসি তদন্তে নেমেছেন। রবিনকে ধরার সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।

এদিকে, সর্বশেষ খবরে (সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা) জানা গেছে, কলাবাগান থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে।

আরও পড়ুন > সাবেক স্বামীর ছুরিকাঘাতে ব্যাংক কর্মকর্তা নিহত


মন্তব্য