kalerkantho


প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই শিশু ধর্ষিত হচ্ছে : ব্র্যাক

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৪ মার্চ, ২০১৭ ২০:৪৫



প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই শিশু ধর্ষিত হচ্ছে : ব্র্যাক

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক প্রতিবেদনে এ দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, নির্যাতনের শিকার নারীদের ৩৯ শতাংশ মামলা বা আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রক্রিয়াধীন ছিল; মাত্র ২৬ শতাংশ কেইস ফাইল হয়েছিল, ৭ শতাংশ মামলা শালিসের মাধ্যমে মীমাংসা হয় এবং ২৮ শতাংশ কেইসে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে এই প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়নের কর্মসূচির (সিইপি) কর্মসূচি প্রধান ফারহানা হাফিজ।

তিনি বলেন, “নারী নির্যাতনের ধরণ যেমন পাল্টাচ্ছে, তেমনি এর সহিংসতাও দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রে এর ভয়াবহতা আরও বেশি। ”

বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শঙ্কিত হওয়ার কথা বলছেন খোদ মহিলা ও শিশু বিষক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদা শারমীন বেনু। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে অনেক আইন রয়েছে, যা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে নেই। এছাড়াও নানা জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি রয়েছে।

বেনু আরও বলেন, “কিন্তু তারপরও প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললে যে নারী নির্যাতনের চিত্র দেখি, তা আমাদের শঙ্কিত করে। আগের চেয়ে নারী নির্যাতনের ধরণও পাল্টেছে, আর সংখ্যাটাও উদ্বেগজনক। ”

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “নারী নির্যাতন শুধু একা নারীদের সমস্যা নয়, এটা পুরুষদেরও সমস্যা।

এখানে নারী-পুরুষ সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এ দিকটি মাথায় রেখে আমরা এখন প্রতিটি ইউনিয়নে কিশোর-কিশোরী ক্লাব গঠনের উদ্যোগ নিয়েছি। এর পাশাপাশি সরকার নারীদের আত্মনির্ভরশীল করতে ৪৯০টি উপজেলায় স্থানীয় চাহিদার অনুযায়ী ১৮ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে নারীদের সহযোগিতা দিচ্ছে। ”

এ সময় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নারীদের আরো বেশি সোচ্চার হওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, “নারী নির্যাতন রোধে আমাদের ভালো আইন আছে ঠিকই। কিন্তু অনেক নারী আছেন যারা এ ধরনের আইন সম্পর্কে জানেন না। এখন আমাদের আইন সম্পর্কে জানানোর জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। ”

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমাজ-রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আয়েশা খানম বলেন, “নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ব্র্যাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে ‘ভালো আইন প্রণয়নে’ সাফল্য এসেছে। এখন সময় এসেছে এগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ ও সঠিক মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ, সুশীল সমাজ, বেসরকারি সংস্থা ও সরকারের সহযোগিতায় একটি একক প্ল্যাটফর্ম গঠন করা। ”

এতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সহজ হবে আশা প্রকাশ করে সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর জোর দেন তিনি।

তিনি বলেন, “সমগ্র রাষ্ট্র, সমাজ, নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক করতে হবে। বিচারের জায়গাটায় অনেক সমস্যা আছে, তবে আগের চেয়ে অনেক পরিবর্তন এসেছে। অজামিনযোগ্য অপরাধ হলে, ওপরের নির্দেশে তারা জামিন পাচ্ছে কিভাবে?”

আয়েশা খানম বলেন, “আমরা এখনও এনাফ সেনসেটিভ হইনি, পরিবার, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সব জায়গায় জেন্ডার সেনসেটিভ ও মানবাধিকারের বিষয়টি ঢুকাতে হবে। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায়। "

তিনি আরো বলেন, “আমি অবাক হই, সংসদীয় কমিটির কাছে যখন শুনি, ধর্ষণ তো হবেই, জামা-কাপড় তো থাকে না। মনে রাখতে হবে, নারী পরিপূর্ণ মানবসন্তান। তাকে পূর্ণ মানবাধিকার দিতে হবে। ”

এ ছাড়াও বৈঠকে নারী ও শিশু নির্যাতন নিয়ে বক্তব্য রাখেন ডেপুটি কমিশনার (উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন) ও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের প্রধান ফরিদা ইয়াসমীন। তিনি মনে করেন, আইনের ফাঁক-ফোকড়ে অপরাধীদের বেরিয়ে যাওয়ার কারণে আইন দিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

ফরিদা ইয়াসমীন বলেন, “আমি বুঝি না যে, ৯(৩) ধারার আসামি কী করে বেইল নিয়ে বের হয়ে যায়? শুধু আইন দিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ অসম্ভব। এখনও আমাদের সমাজে প্রতিদিন নিগৃহীত হচ্ছেন নারীরা। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের আইন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার পাশাপাশি প্রতিটি ব্যক্তি, পরিবার, বেসরকারি সংস্থা, সুশীল সমাজসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ”

বৈঠকে বক্তারা নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, নির্যাতন প্রতিরোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতা, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা ও মামলার দীর্ঘসূত্রিতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেও উল্লেখ করেন।

তা ছাড়াও অনুষ্ঠান থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হলেও প্রথাগত সামাজিক মূল্যবোধ ও পরিবারের ‘সম্মান’, পুনরায় নির্যাতনের ভয়, উপযোগী পরিবেশ না পাওয়া ইত্যাদি কারণে নারীরা তা প্রকাশ করতে চান না। শুধুমাত্র গুরুতর শারীরিক ও যৌন নির্যাতন ছাড়া অন্যান্য নির্যাতনগুলো প্রকাশিত হয় না। ফলে নির্যাতনের যে চিত্র পাওয়া যায় তা বাস্তব ঘটনার চেয়ে অনেক কম।

ব্র্যাকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গড়ে প্রতি মাসে ৬২৪টি, প্রতিদিন ২০.৫টি এবং প্রতি জেলায় মাসে ১১.৩৫টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। প্রায়ই এসব নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও পারিবারিক, সামাজিক ও মামলার দীর্ঘ সূত্রিতার কারণে অধিকাংশ নারী আইনি পদক্ষেপে যেতে চান না।

ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেইঞ্জের পরিচালক কে এ এম মোর্শেদের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন আইসিডিডিআরবির জেষ্ঠ্য গবেষক ড. রুচিরা তাবাসসুম নভেদ, একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু।


মন্তব্য