kalerkantho


রাতবিরেতে পুলিশ ও চিকিৎসকের মানবিকতা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ মার্চ, ২০১৭ ১৪:১১



রাতবিরেতে পুলিশ ও চিকিৎসকের মানবিকতা

পুলিশের দোষ নিয়েই যত নাড়াচাড়া কিংবা চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসা নিয়ে কম হইহট্টগোল হয় না। কিন্তু তাদের মানবিকতার খোঁজ কতটুকু রাখেন যারা দোষ ধরেন। তাহলে একজন পুলিশ কর্মকর্তার ফেসবুক পোস্ট পড়ে নিই :

'রাত্রিকালীন ডিউটি তদারকিকালে হঠাৎ দেখছি দ্রুত পায়ে হেটে আসছেন এক দম্পতি। ভোর আনুমানিক পৌনে চারটার দিকে নিরব নিস্তব্ধ মেরাজনগর বাজারের রাস্তা দিয়ে অন্ধকারে এভাবে আসতে দেখে নিশ্চয় কোনও সমস্যা বুঝতে পেরে গাড়িটা স্লো করতেই এগিয়ে আসলেন দম্পতি। পুরুষ ভদ্রলোকের কোলে একটি শিশুকে দেখতে পেলাম। দেখেই বুঝলাম কোন বিপদ, সহযোগীতা দরকার। বললেন বাচ্চাটা খুব অসুস্থ। বুঝলাম শিশুটিকে জরুরি হাসপাতালে নেয়া প্রয়োজন।

রাতের নির্জন রাস্তায় কোন রিকশা বা গাড়ি নেই। উনাদের কথা শেষ হবার আগেই গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বললাম উঠে পড়েন। গাড়িটা ঘুরিয়ে মাতুয়াইল হাসপাতালের দিকে নিলাম।

আমার পাশেই বসেছে কোলে নিয়ে থাকা শিশুটির বাবা আর তার পাশে মা। শিশুটির প্রচণ্ড খিচুনি আর গোঙানির শব্দ পাচ্ছিলাম অবিরত। সেইসাথে ঘনঘন নিশ্বাসের তপ্ত বাতাস গায়ে এসে পড়ছিল। আর মা বলে কথা! ওর মায়ের দোয়া ইউনুসসহ বিভিন্ন দোয়া দরুদের ভিন্ন ভিন্ন রকমের উচ্চারণ তো আছেই। মনটা ভারি হয়ে গেল, যেতে যেতে ভাবছি কত তাড়াতাড়ি হাসপাতালে পৌঁছাবো।

ডাক্তারদের সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক কথা শুনি। কিন্তু আজ স্বচক্ষে যা দেখলাম তা উনাদের সম্পর্কে শুধু প্রশংসাই যথেষ্ট হবে না। মাতুয়াইল শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটউটের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত তরুণ ডাক্তার (নামটা জানা হয়নি) দ্রুত জান্নাতুল নূর নামের শিশুটির চিকিৎসা শুরু করলেন, অক্সিজেন দিলেন। অত্যন্ত আন্তরিক নাম না জানা এই ডাক্তার ভদ্রলোকের জরুরি চিকিৎসায় কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুটি অনেকটা সুস্থ হলো। কিছুটা শেষ হলো ওর মায়ের দাপাদাপি, স্বস্তি পেলাম আমরাও। এবার ভর্তি হবার পালা। দোতলায় যেয়ে আরেক তরুণ ডাক্তার। এই ভদ্রলোক অনেকক্ষণ যাবৎ ধৈর্য সহকারে রোগী দেখে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন। ভর্তির ব্যবস্থা করলেন। তবে বিনয়ের সাথে বললেন, কেবিনের ব্যবস্থা হয়েছে, কিন্তু দুঃখিত, বিছানার চাদর দিতে পারছি না। উনাদের আচরণ আর ব্যবহারে আমরা এত বেশি আপ্লুত যে, চাদরের চাহিদা আমাদের কাছে একেবারে তুচ্ছ মনে হলো (পরে অবশ্য চাদর পাওয়া গেছে)। ডাক্তার ভদ্রলোক রোগ সম্পর্কে অনেক কথা বললেন, বললেন, এটা মেনিনজাইটিস হতে পারে বা অন্যকিছু। এই ডাক্তার সাহেবের তৎপরতা আর আচরণে সত্যিই ভীষণ মুগ্ধ হলাম। ওনাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা আর অফুরন্ত ভালোবাসা। মনে মনে দোয়া করলাম, আল্লাহ, এই তরুণ ডাক্তারদ্বয়ের মতো দুনিয়ার সব ডাক্তাররা যেন হয়। কারণ অসুখে পড়লে মানুষ কতটা অসহায় হয়ে যে ডাক্তারের কাছে যেয়ে সেবা চায়, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানে। তখন আল্লাহপাক আর ডাক্তাররা ছাড়া কিছুই ভাল লাগে না।

ছয় মাস বয়সী জান্নাতুল নূরের বাবা ফার্নিচার ব্যবসায়ীর আরও দুটো ছেলে সন্তান আছে। একমাত্র মেয়ে হিসেবে ওর কদর যে একটু বেশি তা ওর বাবা-মায়ের আহাজারিতে বোঝা গেল। উনাদের দেখে মনে হলো মেয়ে আসলে শুধু মেয়ে নয়, মেয়ে মানে বাবা-মায়ের আত্মা, বাবা-মায়ের কলিজা, বাবা-মায়ের কান্না আর এক বর্ণনাহীন ভাললাগা। হাসপাতালে এসব ভাবতে ভাবতেই মাইকে ভেসে উঠলো আজানের সুমধুর আওয়াজ, আস সালাতু খাইরুম মিনান নউম। এবার যে যাবার পালা, নুরের বাবাকে ফোন নম্বর দিয়ে বলে আসা, আর্থিকসহ যেকোন ধরনের সহযোগিতায় প্রয়োজনে যেন আওয়াজ পাই। দোয়া করি সবাই, ভাল থাকুক জান্নাতুল নূর, সুস্হ হয়ে উঠুক ও তাড়াতাড়ি, ওর হাসি মুখ দেখি সবাই। '

কাজী ওয়াজেদের ফেসবুক পোস্টটি সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ ও  চিকিৎসকের এই মানবিকতার ঘটনাটি সত্যি হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। এমনটাই লিখেছেন একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী।


মন্তব্য