kalerkantho


সংসদে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার চিত্র প্রদর্শন, কাঁদলেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ মার্চ, ২০১৭ ২১:২৬



সংসদে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার চিত্র প্রদর্শন, কাঁদলেন প্রধানমন্ত্রী

জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে পিনপতন নিরবতা। অধিবেশন কক্ষের বড় পর্দায় একের পর এক ভেসে উঠছে একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার ছবি।

পানিতে ভাসছে অসংখ্য নারী-পুরুষের লাশ। আবেগে আপ্লুত বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে চোখ মুছতে দেখা গেল। অধিবেশন কক্ষের ভারি বাতাস কাতর করে তুলেছে সকলকেই। একে একে অনেকেই বারবার চোখ মুছছিলেন, আর বর্বরতার চিত্র দেখছিলেন। মাত্র ১৮ মিনিটের এই প্রামাণ্য চিত্রে সংসদ ভবনে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এটা ছিলো আজ শনিবার বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনের চিত্র।  

অধিবেশনে পাকিস্তানের গণহত্যা নিয়ে সাধারণ আলোচনার আগে একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে এবং যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম বর্বরতার ‘সচিত্র প্রতিবেদন’ দেখানো হয়। ১৪৭ বিধিতে জাসদের সংসদ সদস্য শিরীন আখতার পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতায় নিহতদের স্মরণে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের প্রস্তাব উত্থাপন করার পর একাত্তরের ওই ভয়াল চিত্র সংসদে উপস্থাপনের জন্য স্পিকারের অনুমতি চান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২৫ মার্চই শুধু নয়।

এর পথ ধরেই দেশে যে গণহত্যা শুরু হয়েছিল... অনেক সংসদ সদস্য আছেন এখানে যারা যুবক, একাত্তরের সেই ভয়াল চিত্র তারা দেখেননি। এখানে আলোচনা হবে। মাননীয় স্পিকার আপনার অনুমতি নিয়ে আমি ওই সময়কার কিছু ছবি-ভিডিও দেখাতে চাই, যেগুলো ওই সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। এরপর সংসদ কক্ষে রাখা বড় পর্দায় একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মমতার বিভিন্ন চিত্র, ভিডিও দেখানো হয়।  

এরপর দীর্ঘ আলোচনা শেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সংঘটিত গণহত্যাকাণ্ডের দিনটি জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে এই দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।  

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রস্তাবটির ওপর দীর্ঘ ৪ ঘণ্টার সাধারণ আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় অর্ধশত সংসদ সদস্য অংশ নেন। তবে শিরীন আখতারের প্রস্তাবের ওপর সামান্য সংশোধনী আনেন সরকার দলীয় চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ। সংশোধনীতে তিনি বলেন, মূল প্রস্তাবের ২য় পংক্তিতে অবস্থিত আন্তর্জাতিকভাবে শব্দটির পূর্বে জাতিসংঘসহ শব্দটি সন্নিবেশ করা হউক। আলোচনায় পহেলা ডিসেম্বরকে মুক্তিযোদ্ধা দিবস ও সিমলা চুক্তি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে পাকিস্তানি ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিচারও দাবি জানানো হয়।  

আলোচনার শুরুতে সংসদ নেতা শেখ হাসিনার প্রস্তাবক্রমে একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে সংঘটিত পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক নারকীয় গণহত্যাকাণ্ড তৈরিকৃত প্রামাণ্য ও স্থিরচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার, ভয়াল গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, ২৫ মার্চ গণহত্যা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্ট, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের গণহত্যা নিয়ে বক্তব্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও ইপিআরে গণহত্যার চিত্র স্থান পায়।  

আলোচনায় অংশ নিয়ে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ২৫ মার্চ কালো রাত্রেই পাকিস্তানি বাহিনী প্রায় এক লাখ বাঙালির ওপর গুলি চালায় বলে ওই সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, পরাজিত অপশক্তি ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছে। খালেদা জিয়া মনেপ্রাণে পাকিস্তানি, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তিনি অবমাননা করেছেন। এখনও উনি দেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেননি। শেখ হাসিনা সাহসের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। সিমলা চূক্তি অনুযায়ী তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে ১৯৫ পাকিস্তানি সেনা যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচারের দাবি জানান।  

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, খালেদা জিয়ার দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলাম একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে। তারা সংসদকে কলুষিত করেছে। খালেদা জিয়া ও অপশক্তিকে চিরতরে অপসারণ করতে হবে।

জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, বাঙালিদের জীবনে দুটি কালো রাত এসেছে। একটি ২৫ মার্চ গণহত্যা, অপরটি ১৫ আগস্ট জাতির জনকের হত্যাকাণ্ড। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদাররা নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। এক রাতেই লাখো বাঙালিকে তারা হত্যা করে। সারা দেশকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চেয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। তাই ২৫ মার্চ জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি ওইদিনে সরকারি ছুটির দাবি জানান তিনি।

ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর বলেন, পৃথিবীর কোন দেশের ইতিহাসে এ ধরনের পশুত্ব দেখা যায়নি। হানাদার বাহিনী যে অত্যাচার, অবিচার ও নৃশংসা করেছে তা নজিরবিহীন। প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, এরই মধ্যে জাতিসংঘ ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বরকে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আমরা ২৫শে মার্চকে গণহত্যা স্বরণদিবস হিসেবে পালন করতে পারি।  

কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশে গণহত্যা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে পাকিস্তানের পরিচালিত গণহত্যা ছিল ইতিহাসের মধ্যে ভয়ঙ্করতম। বাংলাদেশে এখনও পাকিস্তানিদের দোসররা রয়েছে। বাংলাদেশে বসে খালেদা জিয়া শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের দোসরদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা.দীপু মনি বলেন, বাংলাদেশে গণহত্যা বিংশ শতাব্দীর ৫টি গণহত্যার মধ্যে অন্যতম। ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করব।
 
সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষার জন্য বিএনপির সৃষ্টি হয়েছিলো। পাকিস্তানের মদদপুষ্ট জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছাড়া বেঁধে বিএনপি এদেশ ধ্বংসের চক্রান্ত করছে। সেই ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে।

নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে এই গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি পাবো বলে আমরা আশা করি। পাকিস্তানিরা এখনও আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা করছে। তিনি আরো বলেন, একাত্তর সালে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের ওপর যা করেছে জাতি হিসেবে আমরা তা ভুলতে পারি না। তাদের সঙ্গে আমাদের রয়েছে আদর্শিক লড়াই। এ চেতনায় নিজেদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পাকিস্তানের কাছে আমাদের পাওনা ৩৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।  

জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, সারা বিশ্বকে জানাতে হবে এতো দাম দিয়ে কোন জাতি স্বাধীনতা কেনেনি। তাই পাকিস্তানিদের দোসরদের বিষয়ে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জেনারেল জিয়া ২৬ মার্চ পাকিস্তানিদের পক্ষে সারাদিন বোয়ালখালিতে ছিলেন, আক্রান্ত সৈনিক বা মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচাতে একচুলও সাহায্য করেননি।  

ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, পাকিস্তানের আইএসআই’র টাকায় এখনও দেশের ভেতরে অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে। স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিতে পারে এই ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। এই ইতিহাস কেউ মুছে ফেলতে পারবে না।

আবদুল মান্নান বলেন, পাকিস্তান আগেও একটি বর্বর জাতি ছিল, এখনও আছে। প্রধানমন্ত্রী যে স্থির ও ভিডিও চিত্র দেখিয়েছেন তাতে পাকিস্তান বর্বর ছিলো তা আরো শক্তভাবে প্রমাণিত হলো। খালেদা জিয়া শহীদের সংখ্যা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে প্রমাণ হয় তারা এখনও পাকিস্তানি প্রেতাত্মা হিসেবে এদেশে টিকে থাকতে চায়।  

অধ্যাপক আলী আশরাফ বলেন, প্রজেক্টরে যে দৃশ্য দেখানো হলো তাতে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। এটা একটি অকাট্য সত্য। ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করে আমরা পৃথিবীকে আবারো দেখিয়ে দেবো জাতির জনক যে স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ গড়তে লড়াই করেছিলেন তা সফল হয়েছে।  

এ ছাড়াও বক্তৃতা করেন দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, ডাক ও টেলিযোগ প্রতিমন্ত্রী বেগম তারানা হালিম, আওয়ামী লীগের বজলুল হক হারুণ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিম, নুরুল ইসলাম সুজন, সাগুফতা ইয়াসমিন, মো. মনিরুল ইসলাম, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, এ টি এম ওয়াহাব, নুরজাহান বেগম ও কাজী রোজী, তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বাসার মাইজভান্ডারী, বিএনএফ-এর আবুল কালাম আজাদ, জাতীয় পার্টির সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ও মো. ফখরুল ইমাম এবং স্বতন্ত্র সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী।

এর আগে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে টিক্কা খানের নেতৃত্বে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের সামরিক অভিযানে সংগঠিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হিংস্রতা ও বর্বরতা চিত্র তুলে ধরে দিনটিকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতির জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করে স্পিকার শিরীন আখতার বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙ্গালির জীবনে এক ভয়াবহ দিন। সেই কালো রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কাপুরুষের মতো রাতের অন্ধকারে পাশবিক হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত বাঙ্গালির ওপর। সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার নির্দেশে জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামের সামরিক অভিযানে সংগঠিত হয় ইতিহাসের জঘন্যতম নির্মম গণহত্যা। তাই অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে এই দিনটি শুধু আমাদের কাছেই নয়, বিশ্বের গণহত্যার ইতিহাসেরও এক উদাহরণ যোগ্য স্মরণীয় দিন।  

তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানি  সেনাবাহিনী, নিরস্ত্র বাঙ্গালিদের ওপর সশস্ত্র হামলা করে এবং দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের সহযোগিতায় জামায়াতে ইসলামী নামক দলের গঠিত রাজাকার, আল শামস, আলবদর বাহিনী যৌথভাবে ৩০ লাখ বাঙ্গালিকে হত্যা করে এবং ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হানি করে। বিষয়টি সংসদে আলোচনা করে প্রস্তাব আকারে তা গ্রহণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান তিনি।


মন্তব্য