kalerkantho


গার্মেন্ট শ্রমিকদের ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেতন দেয়ার সুপারিশ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১০ মার্চ, ২০১৭ ০২:৪৩



গার্মেন্ট শ্রমিকদের ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেতন দেয়ার সুপারিশ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের এখন থেকে নগদের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাৎ মোবাইল মানি বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বেতন দেওয়ার সুপারিশ করেছে পোশাকের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হেনস অ্যান্ড মরিৎজ (এইচ অ্যান্ড এম)। মাস গেলে শ্রমিকদের যেন লাইনে দাঁড়িয়ে বেতনের টাকা গুনে নিতে না হয় সেটাই তাদের চাওয়া।

এই সুপারিশের পেছনে আছে জাতিসংঘের সহযোগিতায় অ্যাডভোকেসি গ্রুপ বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স-এর প্রস্তুত করা একটি প্রতিবেদন। ফ্যাশন ব্র্যান্ড এইচ অ্যান্ড এম ইতোমধ্যেই অ্যাডভোকেসি গ্রুপটিতে নিজেদের শামিল করেছে। এটাই প্রথম আন্তর্জাতিক কোনও ব্র্যান্ড, যারা শ্রমিকদের ডিজিটাল পেমেন্টের পক্ষে সরব হলো।

সুইডেনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচ অ্যান্ড এম-এর সোশ্যাল সাসটেইনেবিলিটি ম্যানেজার গুস্তাভ লোভেন এখন ভারতের দিল্লিতে। এখানেই তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বাংলাদেশ-সহ সব দেশেই যাতে পোশাক-শ্রমিকদের ডিজিটালি বেতন দেওয়া হয় সেজন্য তারা তাদের সাপ্লায়ারদের (পোশাক প্রস্তুতকারী কারখানা) উৎসাহিত করবেন। তিনি বলেছেন, শ্রমিকরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেতন পেলে স্বচ্ছতা বাড়বে, তাদের শোষণের ঘটনা কমবে এবং নারীর ক্ষমতায়নও হবে বলে আমরা মনে করি।

এইচ অ্যান্ড এম আরও জানিয়েছে, শ্রীলঙ্কা বা ভিয়েতনামের মতো পোশাক প্রস্তুতকারী অনেক দেশেই শ্রমিকদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু হয়ে গেছে। এমনকি, ভারতেও গত নভেম্বরে সরকার বড় অঙ্কের পুরনো নোট বাতিল করার পর যে ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ গড়ার কথা বলছে তার ধাক্কায় অনেক শ্রমিক এখন নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতন পেতে শুরু করেছেন।

ফলে এইচ অ্যান্ড এম-এর এই সুপারিশের আসল লক্ষ্য স্পষ্টতই বাংলাদেশ।

এখানে বেশিরভাগ শ্রমিককে এখনও মাস গেলে তাদের রোজগারের নোটগুলো হাতেই গুনে নিতে হয়। ডিজিটাল পেমেন্ট নিয়ে বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স যে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে, তাতেও মূল ফোকাস ছিল বাংলাদেশ।

এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শ্রমিকদের কীভাবে বেতন দেওয়া হয় তা নিয়ে বেশ কয়েকটি বিশ্লেষণধর্মী তথ্য উঠে এসেছে:
১. বাংলাদেশে একজন গার্মেন্ট শ্রমিককে নগদে নিজের বেতন নিতে গড়ে প্রতি মাসে ১৮ মিনিটের মতো ব্যয় করতে হয়। শ্রমিকরা প্রোডাকশন লাইন থেকে এত সময় দূরে থাকলে আড়াই হাজার কর্মী আছে এমন একেকটি কারখানায় প্রতি মাসে অন্তত ৭৫০ ঘণ্টার উৎপাদন নষ্ট হয়।
২. গার্মেন্ট কারখানার প্রশাসনিক কর্মীরাও প্রতিটি শ্রমিকের বেতন দেওয়ার পেছনে প্রতি মাসে অন্তত ১৩ মিনিট ব্যয় করেন। তাদের বেতনের স্লিপ তৈরি করা, নগদ টাকা গুনে রাখা বা বেতন বিলি করতেই এই সময় খরচ হয়। গড়পড়তা একটি কারখানায় এ কাজে মাসে অন্তত ৫৪২ ঘণ্টা সময় লাগে।
৩. এছাড়া নগদে বেতন দেওয়া বা টাকা আনা-নেওয়ার জন্য আলাদা নিরাপত্তা বা রক্ষীও রাখতে হয়। সব মিলিয়ে প্রত্যেক শ্রমিকের হাতে নগদে বেতন দিতে কারখানাগুলোর মাসে মাথাপিছু অন্তত ৪৪ মার্কিন সেন্টস (প্রায় ৩৬ টাকা) খরচ হয়।

তাছাড়া নগদের বদলে মোবাইল বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেতন পাঠিয়ে দিলে অন্যরকম কিছু সুবিধাও আছে। যেমন:

১. নারী শ্রমিকদের হাতে টাকা তুলে দেওয়া হলে পরিবারে কীভাবে তা খরচ হবে সেটা অনেক ক্ষেত্রেই স্থির করার অধিকার তার থাকে না। কিন্তু ডিজিটালি টাকা পাঠালে তা অন্য কেউ কব্জা করার আশঙ্কা থাকে কম।

২. বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্স তাদের প্রতিবেদনে আরও বলেছে, নগদে বেতন দিলে তা হারানো বা খোয়া যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। নগদ বেতনের রেকর্ড রাখার ঝক্কিও অনেক, তাতে ভুলভ্রান্তি (হিউম্যান এরর) হয় বেশি।

এসব যুক্তির সঙ্গে এইচ অ্যান্ড এম একমত হয়েছে বলেই তারা শ্রমিকদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট চালু করার আন্দোলনে নিজেদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকপক্ষ (বিজিএমইএ) এই প্রস্তাবে কীভাবে সাড়া দেন সেটাই দেখার বিষয়।


মন্তব্য