kalerkantho


'বিএনপি দেশকে সংবিধানের বাইরে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ মার্চ, ২০১৭ ২১:৩২



'বিএনপি দেশকে সংবিধানের বাইরে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে'

রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের কথা বলে অস্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করে দেশকে সংবিধানের বাইরে ঠেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে।
গত ২৪ জানুয়ারি চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব উত্থাপন করলে হুইপ মাহাবুব আরা বেগম গিনি তা সমর্থন করেন।


গত ২২ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের চতুর্দশ অধিবেশন শুরুর দিন সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ সংসদে ভাষণ দেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আজ ২৫তম দিনে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার, হুইপ মো. শাহাব উদ্দিন, সরকারি দলের মোহাম্মদ হাছান মাহ্মুদ, এইচ এন আশিকুর রহমান, মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, শওকত হাচানুর রহমান (রিমন), মামুনুর রশীদ কিরণ ও ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশা আলোচনায় অংশ নেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ এখন সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারায় চলছে। সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ধারায় যে নির্বাচন হচ্ছে তা উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের শত্রু বিএনপি-জামায়াত চক্র কখনো বর্জন করছে আবার কখনো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।  
তিনি বলেন, মত প্রকাশের এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে অবারিত, বিকশিত, মুক্ত ও অবাধ। এত সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও রেডিও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাক্ষী। গণমাধ্যম বিকাশ এমন পর্যায়ে যে গণমাধ্যম সারাদেশকে একটা কাচের ঘরে পরিণত করে দিয়েছে। যেখানে সবকিছু দেখা যায়। সরকার ও প্রশাসনের অন্দর মহলের মধ্যে কি হচ্ছে সবাই তা দেখতে পান।  
ইনু বলেন, সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে অনেকেই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেন। এ গণমাধ্যমের অনেকেই বিরোধীদলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়েছে বলে প্রচার করেছিল। আবার এ গণমাধ্যমই আজকে এক বাক্যে বলছে পদ্মা সেতুতে না কি দুর্নীতি হয়নি। কানাডার আদালতও একই কথা বলেছে। তবে যে যাই বলুক পদ্মা সেতুর দুর্নীতির বিষয়ে যখন অভিযোগ উঠে তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন ‘আমার দেশ দুর্নীতি করেনা এবং বিশ্বব্যাংকে তা প্রমাণ করতে হবে। ’ তাঁর কথা সঠিক হয়েছে এবং এ অভিযোগের কারণে পদ্মা সেতুর কাজ বন্ধ হয়ে যায়নি। আগামী বছর থেকে পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে আমরা দক্ষিণ বঙ্গে যাবো।
বেসরকারি টেলিভিশন টকশো’র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যম এতো স্বাধীন যে রাতে যখন আমরা টকশো দেখি তখন মনে হয় দেশে কোন সরকার নেই। কিন্তু সকালে ওঠে দেখি সরকার আছে। ’ 
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আদালত ও বিচার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিচার বিভাগ অহরহ সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে পর্যালোচনা করছে। দিক-নির্দেশনা ও রায় দিচ্ছে। অনেক মামলায় সরকার হারছে। এমতাবস্থায় দেশে কর্র্তৃত্ববাদী শাসন চলছে বা গণতন্ত্রে খুঁৎ আছে এমন কথা যারা বলে তারা অন্য কিছু করতে চায়।  
তথ্যমন্ত্রী বলেন, বিএনপি এবং তার চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার কখনই নির্বাচনী এজেন্ডা ছিল না। তার এজেন্ডা অন্য কিছু। তা গত ৮ বছরে পরিষ্কার হয়ে গেছে। তার মূল এজেন্ডা ছিল দেশে একটি অস্বাভাবিক অবস্থার সৃষ্টি করা, দেশকে সংবিধানের বাইরে ঠেলে দেয়া, অস্বাভাবিক সরকার আনা এবং যুদ্ধাপরাধীর বিচারসহ দুর্নীতি ও মানুষ পোড়ানো বিচার বন্ধ করে দিয়ে আবার দেশটাকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া।  
তিনি বলেন, বিএনপি এবং বেগম খালেদা জিয়া কখনই নির্বাচন সহ্য করেন না। আইন আদালত মানেন না। নারীর ক্ষমতা সহ্য করতে পারেন না। সংবিধান মানেন না। উন্নয়ন-সমৃদ্ধিতে বাধা দিয়ে মানবতা ও মনুষ্যত্বকে অস্বীকার করেন। খালেদা জিয়ার প্রিয় মডেল তালেবানী শাসন ও সামরিক শাসন। এরা এখন নির্বাচন কমিশন নিয়ে নতুন বিতর্ক করার চেষ্টা করছে এবং নির্বাচন সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দিয়ে নতুন কথা বলার চেষ্টা করছে।
হাসানুল হক ইনু বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী সংসদীয় গণতন্ত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ একটি নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মূলা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। আজকে আবার ওই বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপি যখন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের কথা বলেন, তখন মনে হয় আবার তারা চক্রান্তের জাল বুনছেন। অস্বাভাবিক সরকার তৈরি করতে চাচ্ছেন এবং সংবিধানের বাইরে দেশটাকে ঠেলে দিতে চাচ্ছেন।  
তিনি বলেন, ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সুতরাং অনির্দিষ্ট কোন প্রস্তাব নিয়ে সরকার আলোচনা করতে পারে না। সংবিধানে নির্বাচনকালীন নির্বাচন কমিশন সকল কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। তফসিল ঘোষণার পর যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সে সরকারই নির্বাচন সহায়ক সরকার হয়ে যায় এবং এখানে নির্বাচন কমিশনের বাইরে কোন প্রশাসনের কাজ চলে না, দৈনন্দিন কাজ ছাড়া। এটা সবাই জানেন।  
তথ্যমন্ত্রী বলেন, তারপরও নতুন একটি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাব উত্থাপন মানেই একটি নির্বাচিত সরকারের থেকে আরেকটি নির্বাচিত সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে একটি অনির্বাচিত সরকারের প্রস্তাব নির্বাচন ভন্ডুল, সংবিধান ধ্বংস ও দেশে একটা অরাজকতা তৈরি করার প্রস্তাব। বেগম খালেদা জিয়া বিভ্রান্তির জাল বুনে জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশ আর কোন দিন চক্রান্তের কাছে হার মানবে না। এবার বাংলাদেশ ’৭১-এর মতো স্বাধীনতার অংক মেলাবে।  
তথ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আর কোনদিন আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের ট্রেনে উঠবে না। বাংলাদেশকে বাংলাদেশের পথেই চলতে হবে। সংবিধানের পথেই চলতে হবে। এজন্য সংবিধান অনুযায়ী দেশ চলবে। যথাসময়ে ২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারির আগেই নির্বাচন হবে। কোন ছাড় না দিয়ে জঙ্গি দমন চলবে, দুর্নীতি ও মানুষ পোড়ানোর বিচার চলবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত থাকবে, উন্নয়নের চাকাও চলমান থাকবে। এ ব্যাপারে কোন ছাড় দেয়া যাবে না।
তিনি বলেন, এদেশে আর রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলা চলবে না। একবার রাজাকার, একবার মুক্তিযোদ্ধা এ খেলা বন্ধ করতে হবে। এ খেলা আর চলতে পারে না। আগামীতে বাংলাদেশের মাটিতে শুধু মুক্তিযোদ্ধারাই খেলবেন।  
হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, জঙ্গি, হেফাজত, বিএনপি-জামায়াত, ফ্রিডম পার্টি এদেরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত না করলে রাজনীতিতে সংকট দেখা দিবে, এ কথার সাথে আমি একমত নয়। ’ 
তিনি বলেন, যারা রাজাকার, মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে মিলমিশের ফর্মূলা দেন, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, অতীতে দ্বিজাতি তত্ত্বের যেভাবে কবর দেয়া হয়েছে, তেমনিভাবে বাংলাদেশে এবারই রাজাকার মুক্তিযোদ্ধার মিলমিশের ফর্মূলার কবর দিতে হবে। যাতে কোনদিন এ দেশের মাটিতে রাজাকার যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সঙ্গীরা আস্ফালন করতে না পারে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভালো কাজে সরকারকে বিরোধী দলের সহযোগিতা করা কোনো অনৈতিক কাজ নয়। বরং দেশে বিরোধী দলের সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন ।  
তিনি বর্তমান মহাজোট সরকার আমলের কর্মকান্ডের চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশে গত ৮ বছরে মাথা পিছু আয় ৩গুণ বেড়েছে, খাদ্য উৎপাদনে সকল সময়ের রেকর্ড ভঙ্গ করে দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এমনকি খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিনত হয়েছে। দারিদ্রের হার অনেক কমে গেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প, বিনিয়োগ, যোগাযোগ অবকাঠামো, গ্রামীণ অবকাঠামোসহ আর্থ- সমাজিক ও প্রশাসনিকসহ সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। আর এর ফলে বর্তমানে বাংলাদেশ ক্ষুধা-দারিদ্র্য নিরসনে বিশ্বে রোল মডেল।  
তিনি শ্রমিক কল্যাণে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে বলেন, রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর পোশাক শিল্প একটা সংকটে পড়তে যাচ্ছিল, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ফলে সে সংকট হয়নি। দেশের পোশাক শিল্প খাত বর্তমানে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে সুরক্ষিত। তিনি দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন আগামীতে দেশে আর রানা প্লাজার মতো কোন ঘটনা ঘটবে না। তিনি তার বক্তব্যে শ্রমিকদের বিশেষ করে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের কল্যাণে সরকার এবং তার মন্ত্রণালয়ের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।  
সরকারি দলের সদস্য ড. হাছান মাহমুদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে একটি বাড়ি একটি খামারের আওতায় ক্ষুদ্র অনুদান কর্মসূচি চালু করেছেন। এ কারণে দেশে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে। পৃথিবীর ১৪০টি সুখী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। বিশ্বব্যাংকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বলেছেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্টের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোর বাংলাদেশ থেকে শিক্ষণীয় রয়েছে।  
ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের প্রশংসা করায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সমালোচনা করে বলেন, ড. ইউনুসের ক্ষুদ্র ঋণ সুদের ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই না। তিনি মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাস করেন কি না এ ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। তাকে কখনো শহীদ মিনারে কেউ দেখেনি। সুতরাং তিনি পয়সা দিয়ে কিনে আরো ৫টা নোবেল পুরস্কার আনলেও আমাদের কিছু আসে যায় না।  
এ ব্যাপারে তিনি অর্থমন্ত্রীর একটি সুস্পষ্ট বক্তব্য দাবি করে বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার বিরোধীতা করায় অর্থমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন-বিশ্বব্যাংক উন্নয়ন বান্ধব একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিল করে দুঃসহ অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এদেশে যখন জামায়াত-বিএনপি নৈরাজ্য চালাচ্ছিল, ঠিক ওই সময়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিল করেছে।  
তিনি বলেন, বিনা শুল্কে গাড়ি এনে তা বিক্রি করার মতো দুর্নীতিতে বিশ্বব্যাংক এদেশে প্রথম হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি বিশ্বব্যাংককে অভিনন্দন জানান।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত ন্যায় বিচারের প্রতীক গ্রীক মূর্তি অপসারণ আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজ যদি এ ব্যাপারে আপোষ করা হয় তাহলে তারা একদিন হয়তো অপরাজেয় বাংলাকে মূর্তি বলে তা ভাঙ্গার আব্দার করবে। সুতরাং মৌলবাদীদের সাথে কোন বিষয়ে আপোষ করা ঠিক হবে না।


মন্তব্য