kalerkantho


নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তায় সম্পন্ন হল অমর একুশে বইমেলা

মো. আছাদুজ্জামান মিয়া    

৪ মার্চ, ২০১৭ ১৯:৩২



নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তায় সম্পন্ন হল অমর একুশে বইমেলা

সদ্যসাঙ্গ হল বাঙালির প্রাণের মেলা অমর একুশে বইমেলা ২০১৭। নতুন কেনা বইয়ের মোড়কের সুবাস এখনো হয়তো রয়েছে পাতার ভাঁজে ভাঁজে।

ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চলা একুশে বইমেলার আনন্দযজ্ঞে শামিল হয়েছিল শিশুকিশোরসহ নানান বয়সী মানুষ। গেল বছরের কিছু অনাকাঙি্ক্ষত ঘটনার প্রেক্ষিতে বইমেলা শুরুর প্রাক্কালে এ আয়োজনকে ঘিরে বাতাসে উড়ছিল কিছু শংকার মেঘ। কিন্তু সমস্ত ভয় আর শংকাকে উড়িয়ে দিয়ে নগরবাসীর স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সফলভাবে শেষ হল বইমেলা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়ে আনন্দঘন ও প্রাণোচ্ছ্বল পরিবেশে অমর একুশে বইমেলা উদযাপনেঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ছিল নিরন্তর আন্তরিক প্রচেষ্টা।
এই কর্মপ্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান- মেলার উভয় অংশেই স্থাপন করা হয়েছিল পুলিশ কন্ট্রোল রুম। কোন অপশক্তি যেন কোন ধরণের নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটাতে পারে এজন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশেরপক্ষ থেকে বইমেলাকে ঘিরে নেয়া হয়েছিল তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। টিএসসি মোড় এবং দোয়েল চত্বরে স্থাপন করা হয়েছিল পর্যাপ্ত ব্যারিকেড যাতে কোন ধরণের যানবাহন মেলাপ্রাঙ্গণের সামনের রাস্তায় অযাচিত প্রবেশ করে দর্শণার্থী চলাচল বাধাগ্রস্থ করতে না পারে। রাস্তা জুড়ে উভয়পাশে পুলিশ সদস্যরা লাইনিং এর মাধ্যমে অবস্থান নিয়ে সদাপ্রস্তুত ছিল যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলার। এবারে দর্শণার্থীদের কাছে প্রশংসাকুড়িয়েছে বইমেলায় প্রবেশের জন্য পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা প্রবেশ গেইটের ব্যবস্থা। তারা জানিয়েছেন এতে একদিকে যেমন অনেক হয়রানি ও ভোগান্তি এড়ানো গেছে তেমনি মেলায় প্রবেশ করাও গেছে সহজে। শুধু তাই নয় প্রতিটি প্রবেশ গেটে স্থাপন করা হয়েছিল আর্চওয়ে। ধৈর্য্য ধরে সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে সবাই প্রবেশ করেছেন বইমেলায়। আর্চওয়ে পেরনোর পর আবারো প্রত্যেক দর্শনার্থীর দেহ ও সাথে থাকা ব্যাগ মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশী করে বইমেলায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে। লক্ষ্যনীয় বিষয় ছিল বারবার চেকিং এর কারণেও কারো মধ্যে কোন বিরক্তির অভিব্যক্তি চোখে পড়েনি।
মেলাপ্রাঙ্গন ও তার আশেপাশের এলাকা ছিল সার্বক্ষনিক সিসি ক্যামেরার আওতায়। একই সাথে ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমেও ছিল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। ইউনিফর্মধারী ছাড়াও পুলিশ মেলার ভিতরে ও বাহিরে নিরাপত্তা দায়িত্ব নিয়োজিত ছিল সাদা পোষাকের পুলিশ। মেলার চারপাশের এলাকায় ফুট পেট্রোল, গাড়ি ও মোটরসাইকেলে পুলিশের সার্বক্ষণিক টহলও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে করেছিল আরো সুদৃঢ়। প্রতিদিন মেলা শুরুর আগে বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও ডগ স্কোয়াড দ্বারা মেলা প্রাঙ্গণ ও তার আশপাশে সুইপিং কার্যক্রম ছাড়াও যেকোন জরুরী  প্রয়োজনে  ষ্ট্যান্ডবাই ছিল সোয়াট টিম। মেলাপ্রাঙ্গণে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম হতে সব ধরণের নিরাপত্তা সহায়তা প্রদানেরব্যাপারে পুলিশ সদস্যরা ছিল সক্রিয়।
মেলায় ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে ইভটিজিং, ছিনতাই, অজ্ঞান ও মলম পার্টি প্রতিরোধে সদা প্রস্তুত ছিল পুলিশের বিশেষ টিম। সুখের কথা এই যে এবার তেমন কোন বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আরো সুস্পষ্টকরে বলা যায় কাউকে এমন ঘটনা ঘটানোর কোন সুযোগ দেয়নি আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনী।
শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নয়, সমন্বয়ের মাধ্যমে আনন্দঘন বইমেলা উদযাপনে কাজ করেছে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিশন কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। অগ্নি দূর্ঘটনা এড়াতে প্রতিটি স্টলে একটি করে অগ্নি নির্বাপন যন্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। মোতায়েন ছিলপ্রয়োজনীয় সংখ্যক ফায়ার সার্ভিসের এ্যাম্বুলেন্স ও আগুন নিয়ন্ত্রনের জন্য পানির গাড়িও। পাশাপাশি মেলাপ্রাঙ্গণে ও বাহিরে সার্বক্ষণিক পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাসহ নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহের জন্য বিকল্প জেনারেটরেরও ব্যবস্থা রেখেছিল কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবারের মত এবারও নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি জনসাধারণের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। যার একটি বইমেলায় আগত দর্শনার্থীদের বিনামূল্যে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা। আর অন্যটি হল বইমেলায় পুলিশ ব্লাড ব্যাংক স্থাপন। ব্লাড ব্যাংকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দর্শণার্থী। এছাড়াও মেলাপ্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছিল লস্ট এন্ড ফাউন্ড সেন্টার।
যে মাসে বর্ণমালার জন্য বাঙালি দিয়েছিল বুকের তাজা রক্ত আর বীজ বুনেছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সে মাসে সমস্ত অপশক্তির হুমকি প্রতিরোধ করে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হল বইমেলার আয়োজন। এই সাফল্যের পেছনে নিঃসন্দেহে বড় অবদান সাধারণ মানুষ আর তাদের হার না মানা আবেগের। চেতনার স্ফুরণে সকল আশঙ্কা পেছনে ফেলে জনতা মিলেছিল প্রাণের মেলায়। সেই মিলনের আয়োজন সুসম্পন্ন করার মাধ্যমে জনগণের আস্থা আর ভরসার জায়গাটি সুসংহত করাই বলা যেতে পারে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এবারের সবচেয়ে বড় অর্জন।

- মো. আছাদুজ্জামান মিয়া 
কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ


মন্তব্য