kalerkantho


অপপ্রচার চালিয়ে জঙ্গি তাণ্ডব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২ মার্চ, ২০১৭ ২২:৩৪



অপপ্রচার চালিয়ে জঙ্গি তাণ্ডব

গুজব ছড়িয়ে বুধবার গভীর রাতে ও আজ সকালে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তাণ্ডব চালায় 'মুখোশ পরা বহিরাগত জঙ্গিরা'। ছবি : কালের কণ্ঠ

গুলশানে রক্তাক্ত জঙ্গি হামলাসহ বেশ কয়েকটি ঘটনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীর জড়িত থাকার প্রমাণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার তথ্য পাওয়ায় র‍্যাব-পুলিশ-গোয়েন্দারের পক্ষ থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে আগেই। পাশাপাশি রাজধানীর বারিধারায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকাটির কয়েকটি গেট রাতে বন্ধ রাখা এবং নিয়মিত তল্লাশিসহ বেশ কিছু নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উগ্রপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীর ভয়ংকর তাণ্ডবের শিকার হয়েছে রাজধানীর শান্তিপূর্ণ অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরা। পরে র‍্যাব-পুলিশ এবং বসুন্ধরা গ্রুপের সতর্ক তৎপরতায় আরেকটি পরিকল্পিত বড় ধরনের জঙ্গি হামলার অপচেষ্টা রুখে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।  

সরেজমিনে জানা যায়, বুধবার মধ্যরাতে তপু নামে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মোটারসাইকেল নিয়ে এ্যাপোলো হাসপাতালের পাশের গেট দিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ঢুকতে চাইলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্যের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায় তাঁরা উভয়ই মারামারিতে জড়িয়ে আহত হন। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর দুজনই সুস্থ হয়ে ওঠেন। অথচ এই ঘটনাকে একজন শিক্ষার্থীর ওপর বসুন্ধরা গ্রুপের নিরাপত্তাকর্মীদের হামলা এবং ওই শিক্ষার্থীর অবস্থা মুমুর্ষু বলে অপপ্রচার চালিয়ে ওই রাতেই আবাসিক এলাকায় ব্যাপক ভাংচুর চালায় কিছু যুবক। পরে ফেসবুকে ব্যাপক প্রচারণাও চালানো হয়। পরদিনও ক্ষান্ত হয়নি চক্রান্তকারী মহলটি। কথিত ওই শিক্ষার্থীদের পরিকল্পনায় আজ বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী ব্যাপক তাণ্ডব চলে। বিক্ষোভের নামে তারা বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক, প্রতিষ্ঠানে হামলা ভাংচুর করে প্রগতি সড়ক অবরোধ করে রাখে। দুপুরে তারা বসুন্ধরা গ্রুপের করপোরেট অফিস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেডকোয়ার্টার্স ভাংচুর, বাবা রাফি নামের চারটি রেস্টুরেন্ট, এক ডজন গাড়ি ও ব্যাংক বুথে হামলা ও ভাংচুর চালায়।  

এদিকে বুধবার রাত থেকেই বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কথা শোনে এবং তাদের দাবির কথা মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেয়। পুলিশও ধৈর্য্য ধরে শিক্ষার্থীদের দাবি সমাধানের আশ্বাস দেয়। এর পরও বিনা উস্কানিতে তাণ্ডবের ঘটনায় জঙ্গি গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র সবার সামনে প্রকট হয়ে ওঠে। আজ পুলিশ কোনো রকম লাঠিচার্জ না করলেও কিছু যুবক পুলিশের ওপর হামলা চালায়।  

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে উগ্রবাদী জঙ্গি গোষ্ঠী বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রশাসন ও পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ জন্য তারা ফেসবুকে অপপ্রচার চালিয়ে তুচ্ছ ঘটনাকে বড় করে তোলে। তাদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে কিছু সাধারণ শিক্ষার্থীও ভুল আন্দোলনে যোগ দেয়। পরে যারা ঘটনা বুঝতে পারে তারা ওই তাণ্ডব থেকে সরে যায়। পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এই ঘটনাটি তারা খতিয়ে দেখছেন। হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।  

এদিকে নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, যারা এই  হামলা চালিয়েছে, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রই না। আন্দোলনে যারা হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে তারা বহিরাগত। সেখানে জঙ্গি তত্পরতার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃতদেরও দেখা গেছে।  

আজ বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে কালের কণ্ঠকে বলেন, রাতে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখানে হাতাহাতি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। বসুন্ধরার অফিসসহ বেশ কিছু সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছে। এটি একটি আসাসিক এলাকা। এখানে কাউকে অরাজকতা করতে দেওয়া হবে না। আমরা সারাদিন ধৈর্য্য ধরে হামলাকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেছি। বিকেলে তারা আবার আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা চাই, প্রকৃত ছাত্ররা আইন মান্য করে ক্যাম্পাসের মধ্যেই থাকবেন। '

হামলাকারীদের ব্যাপারে জানতে চাইলেন তিনি বলেন, 'এখন আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করছি। হামলাকারীদের বিভিন্নভাবে দেখা গেছে। তারা ছাত্র কি না, কেন হামলা করল-সব বিষয়ই খতিয়ে দেখা হবে। এখনে আমাদের বিভিন্ন সূত্র আছে। কেউ অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ' 

এদিকে যে শিক্ষার্থীর অবস্থা সংকটাপন্ন বলে ফেসবুকে অপপ্রচার চালানো হয়, আঁকে রাতেই বাসায় যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র দিতে চায় এ্যাপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে গেলে আজ ওই শিক্ষার্থীর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা এক ডাক্তার বলেন, তাঁর কোনো অর্গান ডেমেজ নেই। ফ্র্যাকচার নেই বডিতে। এখন আপাতত ব্যথা আছে।  

ঘটনার সূত্রপাত : 
সরেজমিনে জানা যায়, বুধবার রাত আনুমানিক ১২টার দিকে এ্যাপোলো হসপিটালের সামনে তপু নামে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মোটরসাইকেল নিয়ে আসেন। এই সময় আনসারের এক সদস্য বাধা দেন। এই নিয়ে দুইজনের বাকবিতণ্ডা চলে। পরে ওই ছাত্র ক্ষপ্তি হয়ে আনসার সদস্যকে গালাগাল করতে থাকেন। ওই আনসার সদস্য প্রতিবাদ করেন। এক পর্যায়ে তাঁকে মারতে এলে আনসার সদস্য ছাত্রকে ধাক্কা দেন। ওই ছাত্র তাঁর কয়েকজন সহপাঠীকে ফোন করে ঘটনাস্থলে নিয়ে আসেন। সবাই মিলে আনসার সদস্যকে মারতে থাকেন। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে ছাত্র পরিচয়ধারীরা তাদের ওপরও হামলা চালানোর চষ্টো করে। এমনকি আনসার সদস্যের রাইফেল পর্যন্ত কেড়ে নেওয়ার চষ্টো করে। পরে বসুন্ধারা কর্তৃপক্ষ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ছাত্রকে এ্যাপোলো হসপিটালে ভর্তি করা হলেও তাঁর আঘাত গুরুতর না হওয়ায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।  

সব কিছু যখন শান্ত হয়ে আসছিল তখন একদল নামধারী ছাত্র এ্যাপোলো হসপিটালের পশ্চিম পাশের রাস্তার কোনায় জড়ো হয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে। খবর পেয়ে পুলিশ ও র্যাব ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। তাঁরা যুবকদের বুঝিয়ে স্থান ত্যাগ করার অনুরোধ করেন। কিন্তু সমবেতরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক শ্লোগান দিতে থাকে। তাদের কর্মকাণ্ড ও আচরণ দেখে সংশ্লিষ্টরা তাদেরতে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে। রাত সাড়ে ১২টার দিকে চিহ্নিত জঙ্গিরা মিছিল বের করে তিন শ ফুট রাস্তার দিকে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। আবারো র‍্যাব-পুলিশ বাধা দিলে তাদেরও অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করে তারা বিক্ষোভ করতে থাকে। রাস্তার মধ্যে থাকা ডিভাইডারগুলো ভেঙ্গে সামনে যা পায় তাই ভাংচুর করে লুট করার চেষ্টা করে। এই সময় পুরো এলাকায় আতংক তৈরি হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ও এর আশপাশের সড়কগুলোর ডিভাইডার উপড়ে ফেল। কয়েকটি রাস্তায় ব্যানার ও টায়ার জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। দেয়ালগুলো থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়। নানা শ্লোগান দিয়ে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করে তোলে।  

এ পর্যায়ে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‍্যাব সদস্য বাড়ানো হয়। পুলিশ ও র‍্যাবের উপস্থিতি বৃদ্ধি দেখে জঙ্গিরা বসুন্ধরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল (২) অফিসে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষতি করে। ওই অফিসের সামনে দুটি ব্যাংকের বুথেও হামলা চালায় তারা। সাজানো ফুলের টব ভেঙ্গে চুরমার করে। তাদের এই তাণ্ডব বুধবার রাত সোয়া ৩টা পর্যন্ত চলে। পুলিশের গুলশান ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার ও র‍্যাব-১ এর পরিচালক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কামরুল ইসলাম ও বসুন্ধারা গ্রুপের কয়েকজন কর্মকর্তা আবারো যুবকদের অনুরোধ করে সসিহংতার পথ পরিহার করতে বলেন। কিন্তু কয়েকজন অতি উত্সাহী যুবক তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। তারা দাবি করে, যে আনসার সদস্য নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে মারধর করেছে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এই সময় র‍্যাব ও পুলিশের দুই কর্মকর্তা জানান, তদন্ত করে অব্যশই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই জন্য আমাদের সময় দিতে হবে। কিন্তু যুবকদের সাফ কথা, এখনই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর না হয় আমাদের আন্দোলন চলতে থাকবে। পরে প্রক্টর কামরুল ইসলাম অনেকটা রাগান্বিত হয়ে বলতে থাকেন, 'তাহলে তোমরা সাবোটাজই করতে থাকবে?' 

এই সময় শশ্রূমণ্ডিত এক যুবক চিৎকার করতে বলতে থাকে, বসুন্ধারা গ্রুপকে আর ছাড় দেয়া হবে না। এ কথা বলার পরপরই অন্য যুবকরা করতালি দিয়ে 'বিচার চাই বিচার চাই' বলে শ্লোগান দিতে থাকে। র‍্যাব-পুলিশ ধৈর্য্যের পরিচয় দিতে থাকে। পুলিশের উপ কমিশনার ও র‍্যাব সিও যুবকদের বলতে থাকেন, 'তাহলে তোমরা বৃহস্পতিবার সকালে বৈঠকে বসো। এখানে আমরাসহ বসুন্ধরা গ্রুপ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রতিনিধি যোগ দেবেন। ' এক পর্যায়ে তারা রাজি হয়ে বলে, সকাল ১০টার দিকে বসতে হবে। তাতে সবাই সম্মত হলে রাত সাড়ে ৩টার দিকে যুবকরা রাস্তা ছেড়ে চলে যায়। রাতে এসব হামলা ও অপতত্পরতার সময় কয়েকজন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা যুবককে দেখা যায়। হামলাকারীদের সবার হাতে লাঠি ও রড ছিল।  
বুধবার রাতে যখন তাণ্ডবলীলা চলছিল তখন আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের অনেকে ভয়ে ভবনের ছাদে উঠে পড়েন।  


মন্তব্য