kalerkantho


কিশোর প্রেমের অপরাধে ছাত্রকে টিসি!

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১৭:৫৬



কিশোর প্রেমের অপরাধে ছাত্রকে টিসি!

রাজধানীর গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রকে স্কুলছাড়া করতে বিরাট আয়োজন করেছেন প্রধান শিক্ষিকা ফৌজিয়া আহমেদ। ছাত্রের অভিভাবকদের ডেকে এনে জোরপূর্বক আবেদনে সই করানোর চেষ্টা করেই থেমে থাকেননি, অন্যান্য সকল শিক্ষকদের থেকে সই নেওয়া হয়েছে খালি পৃষ্ঠায়। কোনো রকম নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে এবং সভায় সিদ্ধান্ত ছাড়াই খালি পৃষ্ঠায় শিক্ষকদের সই নিয়ে রীতিমত দম্ভ প্রকাশ করছেন এই প্রধান শিক্ষিকা।
যাকে স্কুলছাড়া করতে এত হন্তদন্ত ও আয়োজন, সেই ছাত্রের অপরাধ কিশোর প্রেম। একই শ্রেণির এক ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ওই ছাত্রের। এই নিয়ে ছাত্রীর অভিভাবকদের তরফ থেকেও কোনো অভিযোগ অনুযোগ নেই।
দুই পরিবারের অভিভাবকেরা নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ওঠেন প্রধান শিক্ষিকা। তার দৃষ্টিতে এই কিশোর প্রেম অমার্জনীয় অপরাধ। যার শাস্তি ওদের পেতেই হবে!
প্রধান শিক্ষিকার এমন মনগড়া সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তারা জানান, কিশোর প্রেমের বিষয়টি বাদ দিলে ছেলেটির ব্যাপারে কোনো অভিযোগই নেই।

সে পড়াশোনা, খেলাধুলা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই এগিয়ে। খুবই প্রাণবন্ত এক কিশোর। তাকে কাউন্সিলিং করা যেত। কিন্তু এভাবে স্কুলছাড়া করে দেওয়াটা অনুচিত।
ওই ছাত্রের মা শেফালী বেগম বলেন, ‘আমার ছেলের সঙ্গে ওই মেয়ের যে সম্পর্ক, সেটিকে এভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না। কিশোর বয়সে এসব হতেই পারে। তাই বলে স্কুলছাড়া করে দেওয়া অমানবিক। আমরা ম্যাডামের (প্রধান শিক্ষিকা) কাছে অনুনয় করে বলেছি যে আরেকটিবার সুযোগ দেওয়া হোক। কিন্তু ম্যাডাম কথায় কথায় রাগ দেখান। তার একক সিদ্ধান্তই নাকি চূড়ান্ত। ’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই মেয়ের মায়ের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত কথা হয়। যোগাযোগ হয়। তারা এ ব্যাপারটি নিয়ে এতটা সিরিয়াস নন। তারা এ ব্যাপারে কারও কাছে কোনো অভিযোগও করেননি। তবু প্রধান শিক্ষিকা কেন এত কঠোর সিদ্ধান্ত নেবেন? এটি একতরফা সিদ্ধান্ত হয়ে যাচ্ছে। ’
গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শ্রেণি-শিক্ষক ফারজানা খন্দকার বলেন, ‘ওই ছাত্রের ব্যাপারে আসলে বলার মতো খারাপ কিছু নেই। ও পড়াশোনায় খুবই ভালো। ওর আচরণ কিংবা চাল-চলন নিয়েও কোনদিন কেউ কথা তুলতে পারবে না। প্রেমের যে বিষয়টি উঠেছে, সেটি এই বয়সে হতেই পারে। তার জন্যে এত বড় শাস্তি দিলে ছেলেটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে। এটি তার জীবনে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থাকবে। ’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা জানান, অষ্টম শ্রেণির ওই ছাত্রকে স্কুল থেকে বের করে দিতে প্রধান শিক্ষিকা একটি সভা ডেকেছেন। মূলত সভা হলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তই জানিয়েছেন। অন্যদের কথা তিনি কানেই তুলতে চাননি। সভা শেষে কোনোরকম সিদ্ধান্ত ছাড়াই তিনি রেজুলেশন খাতার খালি পৃষ্ঠায় সবার সই নিয়েছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি এটি অন্যায়।
ওই ছাত্রের বাবা মো. সেলিম মিয়া জানান, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার রেজিষ্ট্রেশনের সময় এখন। প্রধান শিক্ষিকার একতরফা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তার ছেলের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করে দিচ্ছেন। একজন শিক্ষক হয়ে ছাত্রের পড়াশোনায় এত বড় ক্ষতি তিনি কী করে করতে পারেন- প্রশ্ন তার। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে  বলেন, টিসি দিলে ছেলে যদি অন্য কিছু ঘটিয়ে দেয় তাহলে আমার ছেলে আমি পাব কোথায়? প্রধান শিক্ষিকা আমার ছেলেকে কি ফিরিয়ে দিতে পারবে?
এসব ব্যাপারে কথা বলতে গেলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ফৌজিয়া আহমেদ। তিনি যা বলবেন, সেটিই আইন দাবি করে বলেন, ‘স্কুলে আমরা কি করব না করব, তার ব্যাখ্যা আপনাদেরকে কেন দিব? ওই ছেলেকে আমরা টিসি (বদলি-সনদ) দিব। তাতে বাধা দেয়ার সাধ্য কারো নেই। স্কুল থেকে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিব, সেটিই আইন। ’
খবর নিয়ে জানা গেছে, অষ্টম শ্রেণির ছেলেটিকে নিয়ে কিশোর প্রেমের যে প্রসঙ্গ সামনে এসেছে, এ ধরনের ঘটনায় কাউন্সিলিংই আসল সমাধান। তা না করে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বের করে দিতে পারে না। কারণ, শিক্ষার্থীদের এই বয়সে সাজা ভোগ করতে হলে সেটি তাদের গোটা শিক্ষাজীবনকেই ধ্বংস করে দিতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেয়েটির এক আত্মীয় বলেন, ছেলেটির বিরুদ্ধে আমরা লিখিত কিংবা মৌকিখ কোনো অভিযোগই দেইনি। পারিবারিকভাবে মিটকাট করে ফেলেছি।

 


মন্তব্য