kalerkantho


রাজনৈতিক আশ্রয়েই গড়ে উঠেছে উত্তরার ‘কিশোর গ্যাং’ গ্রুপ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০৩:০৪



রাজনৈতিক আশ্রয়েই গড়ে উঠেছে উত্তরার ‘কিশোর গ্যাং’ গ্রুপ

রাজধানীর উত্তরায় স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া কিশোরদের যেসব গ্যাং গ্রুপ রয়েছে তার নেপথ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রশ্রয় রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে নিহত আদনান কবীরের বাবা কবির হোসেন। তিনি বলেন, এমন ঘটনার পেছনে অভিভাবকদেরও দায় রয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। মঙ্গলবার দুপুরে এক সাক্ষাৎকারে কবির হোসেন এসব কথা বলেন।

গত ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর রোডে ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবিরকে খেলার মাঠে পিটিয়ে এবং কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে অপর একটি কিশোর গ্রুপ। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উত্তরার একটি হাসপাতালে নিলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ ঘটনার পর জানতে পারে উত্তরায় পশ্চিমা গ্যাং সংস্কৃতি ও আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরেই এই হত্যাকাণ্ড।
ঘটনার একমাস পর নিহতের বাবা এই গ্যাং প্রথার বিষয়ে রাজনৈতিক ছত্রছায়াকেও দায়ী কর বলেন, উত্তরায় যত গ্যাং গ্রুপ আছে তার পেছনে কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের ইন্ধন রয়েছে। তরুণদের দিয়ে তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করায়। এলাকার অনেক শান্ত ছেলেদের গ্রুপে জোড় করে ভিড়ায় তারা। স্কুলের সবাই বলে, আমার ছেলে অনেক শান্ত ছিলো।

তাকেও জোড় করে গ্রুপে ভিড়ানো হয়।

তিনি আরও বলেন, আমি গতবছর হঠাৎ ছেলের ভেতরে পরিবর্তন লক্ষ্য করি। এরপর আমি বিষয়টি জানার চেষ্টা করি। তখন সে মাইলস্টোনে পড়তো। তার সঙ্গে স্কুলে গিয়ে দেখি তার অনেক সহপাঠি স্কুলে বাইরে বসে দল বেঁধে সিগারেট টানছে। কেউ স্কুল ফাঁকি দিচ্ছে। তারা আদনানকেও দলে নিতে চায়। রাজী না হওয়ায় আমার ছেলেকে তারা বয়লার মুরগী ডাকতো। এরপর আমি ছেলেকে কিছুদিন স্কুলে আনা নেওয়া করি। পরবর্তীতে তার স্কুল পরিবর্তন করে ফেলি। এরপরও ছেলেটাকে বাঁচাতে পারলাম না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে কবির হোসেন বলেন, গ্রুপগুলোর শক্তির উৎস রাজনৈতিক দল। তারা রাজনৈতিকভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এরকম হয়ে যাচ্ছে। তারা এলাকার কাউকে মানছে না। তাদের কেউ প্রতিরোধ করতে আসলেই তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। এমনকি স্কুল শিক্ষকদেরও তারা শাসায়।

আদনার হত্যার পর তার বাবা বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ১০/১২ জন তরুণ ও কিশোরকে আসামি করা হয়। ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে এখন পর্যন্ত সাতজন করে মোট ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এদের মধ্যে এজাহারভুক্ত ও এজাহারের বাইরের আসামিও রয়েছে। ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্ধি দিয়েছে। জবানবন্ধিতে হত্যায় জড়িত ১২ জনের নাম পেয়েছে পুলিশ। যারা এই হত্যা ও গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে জড়িত।

নিহত আদনানের বাবা পুলিশের তদন্তে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এখন পর্যন্ত আমি খুশি। তবে আরও খুশি হবো সবাই বিচারের আওতায় আসলে। আর যেন কোনও বাবা-মাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিধান ত্রিপুরা জানিয়েছেন, মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাচ্ছি। এরা গ্যাং গ্রুপ করে থাকে মূলত হিরোইজম দেখানোর জন্য। বৃহত্তর উত্তরার স্কুল ও কোচিং সেন্টারের পাশাপশি পরিচিতরা মিলে এই গ্যাং গ্রুপ চালিয়ে আসছিলো। এখানে সবশ্রেণির পরিবারের সন্তানরা রয়েছে। উত্তরার ডিসকো বয়েস, নাইন স্টার গ্রুড, সেভেন স্টার গ্রুপ, নাইন এমএম বয়েজ, বিগবস ইত্যাদি গ্রুপ তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর আমরা সব গ্রুপগুলোর তথ্য পেয়েছি। গ্রুপগুলোর কিছু সদস্যদের আমরা গ্রেপ্তার করেছি। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আমরা স্কুল চলাকালে ফাঁকি দিয়ে কাউকে দলবেধে আড্ডা দিতে দেখলে তাদের থানায় নিয়ে আসি। এরপর অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছি। ফলে গ্যাংদের কার্যক্রম উত্তরায় এখন নেই।


মন্তব্য