kalerkantho


তাহারেই পড়ে মনে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ১১:৩৪



তাহারেই পড়ে মনে

এবারও ফুটেছে কৃষ্ণচূড়া। গাছে গাছে শিমুল পলাশ।

কমতি নেই মানুষের বাসন্তী আয়োজন আর উচ্ছ্বাসে। ঋতুরাজকে নিয়ে চারদিকে উৎসবের আমেজ। ফুল পাখি আর মানুষের মন রাঙিয়ে বয়ে যাচ্ছে রোমান্টিক লালাভ বাতাস।

এসব আয়োজনের মধ্যেও বিমূর্ত ভেসে ওঠে একটি ঘর, একটি প্রতিষ্ঠান আর একটি আসনের ছবি। সেখানে এখন কেবল খা খা শূন্যতার রূপায়ন। ঘরটি হয়ত এখন আর শূন্য নেই, তবু অসংখ্য ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীর কল্পনায় একটি রিক্ত ঘর ঠিকই হাতছানি দেয়। প্রতিষ্ঠানটি এফডিসি। সেখানেও তাঁর অনুপস্থিতির সাক্ষর। আর আসনটিও একইরকম নিবর্স্তুক হয়ে দৃশ্যমান- সেখানে নীরবে নিভৃতে একাকিত্বে লুকিয়ে রয়েছে এক অশরীরী শরীর যেন।

কে তাঁর কুশল জানে!

২০১২ সালের পয়লা ফাল্গুন। বসন্তবরণে ব্যস্ত ছিল সবাই। হঠাৎ বেদনার খবরটি আসে তখনই 'হুমায়ুন ফরীদি আর নেই'। মুহূর্তে বসন্তের রং মলিন হয়ে যায়। সেই থেকে পয়লা ফাল্গুন ফরীদিভক্তদের জন্য বেদনার হয়ে আছে আজও। সবাই যখন বসন্তকে বরণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ফরীদি ভক্ততো বটেই, এ দেশের অসংখ্য চলচ্চিত্রমোদী বেদনার্ত হয়ে ওঠেন দেশের এই গুণী শিল্পীর চিরতরে বিদায়ের কথা ভেবে।

পাঁচ বছর পর আজও মলিন মনে হয় ফুলের রং, আয়োজনে থেকে যায় অপূর্ণতা। প্রকৃতিতে বসন্ত এলেও তাকে বরণ করতে নিরুৎসাহ জাগে। বিষাদময় রিক্ততার যে  সুর ধ্বনিত হয়, তারই অনুরণন বসন্তের সৌন্দর্য শোভার অন্তরালে। একজন মানুষের চলে যাওয়ার মর্মজ্বালা। শীতের কুয়াশাঢাকা পরিবেশে আমরা হারাই তাঁকে। প্রিয় অভিনেতাকে। অসংখ্য কলা-কুশলী-বন্ধু-ভক্ত-অনুরাগীকে চিরতরে একাকী রেখে পরপারে চলে যান। ফলে অনেকের জীবনেও নেমে আসে সেই বিষণ্নতা। মনকে আচ্ছন্ন করে রিক্ততার হাহাকারে।

তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। চলচ্চিত্র, মঞ্চ ও টেলিভিশনে তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। তাকে বলা হতো অভিনয় কারিগর। বাংলাদেশের নাট্য ও সিনেমা জগতে তিনি অসাধারণ ও অবিসংবাদিত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন।

ফরীদি ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম এ টি এম নূরুল ইসলাম ও মা বেগম ফরিদা ইসলাম। ইউনাইটেড ইসলামিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি। মাধ্যমিক স্তর উত্তীর্ণর পর চাঁদপুর সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক (সম্মান) অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নাট্য উৎসবে তিনি অন্যতম সংগঠক ছিলেন। মূলত এ উৎসবের মাধ্যমে তিনি নাট্যাঙ্গনে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থাতেই তিনি ঢাকা থিয়েটারের সদস্যপদ লাভ করেন। নব্বইয়ের দশকে হুমায়ুন ফরীদি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন।

আলোচিত সংশপ্তক নাটকে কানকাটা রমজান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বিখ্যাত হয়ে ছিলেন। কীর্ত্তনখোলা, মুন্তাসির ফ্যান্টাসি, কেরামত মঙ্গল (১৯৯০), ধূর্ত উই ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য মঞ্চায়ন। মঞ্চের পাশাপাশি টিভি অভিনয়েও হুমায়ুন ফরিদী ছিলেন ব্যাপক জনপ্রিয়। তার অভিনীত নাটকগুলো হলো নিখোঁজ সংবাদ, হঠাৎ একদিন, পাথর সময়, সংশপ্তক, সমুদ্রে গাংচিল, কাছের মানুষ, মোহনা, নীল নকশাল সন্ধানে (১৯৮২), দূরবীন দিয়ে দেখুন (১৯৮২), ভাঙ্গনের শব্দ শুনি (১৯৮৩), কোথাও কেউ নেই, সাত আসমানের সিঁড়ি, সেতু কাহিনী (১৯৯০), ভবের হাট (২০০৭), শৃঙ্খল (২০১০), জহুরা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, প্রতিধ্বনি, গুপ্তধন, সেই চোখ, অক্টোপাস, বকুলপুর কত দূর, মানিক চোর, আমাদের নুরুল হুদা।

সন্ত্রাস, দহন, লয়াকু, দিনমজুর, বীর পুরুষ, বিশ্ব প্রেমিক, আজকের হিটলার, দুর্জয়,শাসন, আঞ্জুমান, আনন্দ অশ্রু মায়ের অধিকার, আসামী বধু, একাত্তরের যীশু, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, ভালোবাসি তোমাকে, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, প্রবেশ নিষেধ, ভন্ড, অধিকার চাই, মিথ্যার মৃত্যু, বিদ্রোহী চারিদিকে, মনে পড়ে তোমাকে, মাতৃত্ব, টাকা, ব্যাচেলর, জয়, যাত্রা, শ্যামল ছায়া, দূরত্ব, চেহারা, আহা!, কি যাদু করিলা, মেহেরজান প্রভৃতি ছবিতে অভিনয় করে হুমায়ুন ফরিদীর চলচ্চিত্রে খ্যাতির পরিধি আরো প্রসারিত হয়।

বরেণ্য অভিনয় শিল্পী হুমায়ূন ফরীদি অভিনয় শুরু করেন সত্তরের দশকে ঢাকা থিয়েটারে। মঞ্চে 'শকুন্তলা' ছিল তাঁর অভিনীত প্রথম নাটক। ২০০৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন হুমায়ুন ফরীদি। নাট্যাঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। যদিও একুশে পদকের জন্য এবার দাবি তোলা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে তা দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিশ্চয়ই বিষয়টি বিবেচনা করবে।

 


মন্তব্য