kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন

ধর্ম যার যার, উৎসব সবার

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:২৫



ধর্ম যার যার, উৎসব সবার

ঈদের সময় এক খবর সংবাদমাধ্যমগুলো ফলাও করে প্রচার করে৷ খবরটা হলো, হবিগঞ্জে ঈদের জামাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে ৬০ হিন্দু৷ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এটা কি মোক্ষম দৃষ্টান্ত নয়?
এই ৬০ জন যুবকের মধ্যে কেউ আইনজীবী, কেউ চিকিৎসক, কেউ বা ছিল ছাত্র৷ হবিগঞ্জ পূজা উদযাপন পরিষদের বিভাগীয় সম্পাদক শঙ্খ শুভ্র রায় জানান, ‘‘আমরা একই শহরে বাস করি৷ দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিন্দু-মুসলমান সবার সাথে মিলে কাজ করতে হয়৷ তাই শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে তো আমরা নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে পারবো না৷''
এ বিষয়ে স্থানীয় সাংসদ মো. আবু জহির বলেন, ‘‘ধর্মীয় সম্প্রীতির একটি অসাধারণ উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে হবিগঞ্জে৷ এ উদ্যোগকে সবাই সমর্থন করেছেন৷ আমরা মুসলমানরাও দুর্গাপূজার সময় অনুরূপ দায়িত্ব পালন করছি৷''
বাংলাদেশে দুর্গাপূজার শুরু হয়ে গেছে৷ আর এই দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে আরেকটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির নজির সৃষ্টি হয়েছে যশোরে৷ শহরের লালদিঘি এলাকার পূজামণ্ডপে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখভালের জন্যে ইতোমধ্যে হিন্দু যুবকদের পাশাপাশি মুসলিম যুবকরাও কাজ করছেন৷ মো. রায়হান সিদ্দিকী ময়নার নেতৃত্বে কাজ করছে ১৭ জন মুসলিম তরুণের একটি স্বেচ্ছাসেবী দল৷
ময়নার ভাষায়, ‘‘হিন্দু-মুসলিম হচ্ছে ধর্মীয় পরিচয়, কিন্তু আমরা সবাই তো মানুষ৷ তাছাড়া উৎসব হচ্ছে সর্বজনীন৷ তাই উৎসবে সবাই শামিল হবে, এটাই যে স্বাভাবিক৷''
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দীপংকর দাস রতনের কথায়, ‘‘আমরা হিন্দু-মুসলিম...সকলে মিলে উৎসব ভাগ করে নিই৷ আমাদের নিরাপত্তায় মুসলিম যুবকরা এগিয়ে এসেছেন৷ ভবিষ্যতে আমরা আবারো তাদের পাশে দাঁড়াবো৷''
ঢাকার কমলাপুর বৌদ্ধ মন্দিরে রমজান মাসে গত ছ'বছর ধরে মুসলমানদের মধ্যে ইফতার বিতরণ করা হয়৷  রমজাসের প্রতি সন্ধ্যায় প্রায় ৫০০ মানুষ লাইন ধরে ইফতার নেন, যা বিতরণ করেন ভিক্ষুরা৷ মন্দিরের প্রধান শুদ্ধানন্দ মহাথেরো এটাকে দেখেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবতার কাজ হিসেবে৷

বাংলাদেশে ধর্মীয় উৎসব
অনেক সংকট আছে৷ দেশে আছে অনেক দুর্বৃত্ত, যারা নানা বাহানায়, নানা অজুহাতে ধর্মীয় উৎসবে বিভেদ খোঁজে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়৷ তারপরও ওপরের দু'টি উদাহরণই বলে দিচ্ছে, এটাই বাংলাদেশ৷ এটাই বাংলাদেশের মানুষের চিন্তা এবং চেতনার মূল সুর৷
বাংলাদেশে প্রধান উৎসব এখনো ধর্মীয় উৎসব৷ এর বাইরে বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং ২১শে ফেক্রয়ারি শহিদ দিবস জাতীয়ভাবে পালন করা হয়৷ মুসলানদের প্রধান দু'টি ধর্মীয় উৎসব ঈদ উল-ফিতর এবং ঈদ উল-আজহা৷ এর বাইরে মহরমের তজিয়া মিছিল অন্যতম৷

মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব
ঈদ উল-ফিতর অনেকটাই সর্বজনীন উৎসব৷ ঈদে পুরনো ঢাকায় যে আনন্দ মিছিল বের হয়, তাতে মুসলামান ছাড়াও সব ধর্মের মানুষ অংশ নেয়৷ ঐ শোভাযাত্রা অনেকটাই সামাজিক আনন্দ শোভাযাত্রায় পরিণত হয়েছে৷ ঈদে নতুন পোশাক পরার রেওয়াজ আছে৷ আসলে বাংলাদেশে একটা নতুন সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে আজকাল৷ আর তা হলো, ঈদে সময় যাদের সামর্থ থাকে, তা সে যে ধর্মের মানুষই হোক না কেন, নতুন পোশাক কেনার চেষ্টা করে৷ এছাড়া সব ধর্মের মানুষকে আমন্ত্রণ জাননো হয় খাওয়ার আয়োজনে৷
ঈদ উল-আজহায়ও চিত্র  মোটামুটি একই৷ এই যেমন, সামর্থবান মুসলমানরা গরুর বাইরে অন্য পশুর মাংসেরও ব্যবস্থা রাখেন অন্য ধর্মের অতিথিদের জন্য৷
বাংলাদেশে মহরমের তাজিয়া মিছিলের আয়োজন করে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ৷ এটা কারবালার শোকাবহ স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়৷ পুরনো ঢাকার হোসেন দালান এলাকা থেকে সবচেয়ে বড় তাজিয়া মিছিল বের হয় এ সময়, যার দর্শনার্থী হয় সব ধর্মের মানুষ৷ মহরম উপলক্ষ্যে মেলা বসে হুসেনী দালান, বখশীবাজার, ফরাশগঞ্জ ও আজিমপুরে৷ সেই মেলাও সর্বজনীন৷
ঈদ ই-মিলাদুন্নবী বা মহানবীর জন্মদিনেও বাংলাদেশের মুসলমানরা নানা আয়োজন করে থাকে৷ এর মধ্যে ঢাকায় জসনে জুলুস নামে রং-বেরঙের পতাকার ব্যানারে একটি আকর্ষণীয় মিছিল বের হয়৷

হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা৷ তবে এই পুজো শুধুমাত্র হিন্দু ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই৷ কারণ উৎসবেও অংশ নেয় সব ধর্মের মানুষ৷ প্রতিমা দেখা, পূজার প্রসাদ খাওয়াসহ সব আয়োজনেই থাকে সবার অংশগ্রহণ৷ এমনকি প্রতিমা বিজর্সনের সময়ও সবাই অংশ নেয়৷ পূজা উপলক্ষ্যে বসে মেলা, আয়োজন করা হয় নৌকা বাইচের৷ ঘোরদৌড়েরও আয়োজন হয় কোথাও কোথাও৷ আয়োজন করা হয় নাটক, যাত্রাপালা এবং গানের আসরের৷ এই সমস্ত আয়োজন সবাইকে এক করে৷ বলা বাহুল্য, পূজার উৎসবকে আরো বেশি সর্বজনীন রূপ দেয় এ সব আয়োজন৷
বাংলাদেশে সরস্বতী পূজা সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেন উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসহ স্কুল কলেজের খোলা চত্বরে বিদ্যাদেবীর এই পূজাও এক সর্বজনীন আয়োজন৷ শিক্ষার্থীরা সবাই মিলে এ আয়োজন সফল করে তোলে৷ লক্ষ্মী পূজায়ও হিন্দুরা আমন্ত্রণ জানায় সব ধর্মের মানুষকে৷ ধনের দেবী লক্ষ্মীকে কেউই আসলে অবহেলা করতে চান না৷ তারপর আসে কালীপূজা, যা সর্বজনীন মন্ডপে উদযাপন করা হয়৷
শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন জন্মাষ্টমীর মিছিল আরেকটি আকর্ষণ বাংলাদেশে৷ এই মিছিলের রঙে সবাই আকৃষ্ট হয়৷ আর দোল উৎসবে রং খেলায় মেতে ওঠে সব ধর্মের তরুণ-তরুণীরা৷ এছাড়াও আছে রথযাত্রা, আছে চৈত্র সংক্রান্তি৷ চৈত্র সংক্রান্তি অবশ্য এখন আবহমান গ্রাম বাংলায় একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে৷ পহেলা বৈশাখের আগের দিন, অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিতে, মেলা বসে গ্রামে গ্রামে৷
বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলে হিন্দুদের চড়ক উৎসব নামে আরেকটি ধর্মীয় উৎসব পালিত হয়৷ চড়কের সঙ্গে থাকে মেলা৷ চড়ক এবং মেলা দেখতে সব ধর্মের মানুষই ছুটি যায়৷

বৌদ্ধদের ধর্মীয় উৎসব
বৌদ্ধদের প্রধান উৎসব হলো বুদ্ধ পূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমা৷ বুদ্ধদেবের জন্ম, গৃহত্যাগ, বুদ্ধত্ব লাভ, পরিনির্বাণ – সবই বৈশাখী পূর্ণিমায় ঘটেছিল, তাই এ উৎসব বৌদ্ধদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব৷ এছাড়া বৌদ্ধদের প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস ওড়ানোর আকর্ষণ এড়াতে পারে না কোনো ধর্মের মানুষই৷ কয়েক বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে প্রবারণা পূর্নিমায় সব ধর্মের মানুষ মিলে ফানুস ওড়ায়৷ আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে প্রবারণা পালিত হয়৷ আর এই উৎসব শেষ হওয়ার পর প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে পালিত হয় চীবর দান উৎসব৷

খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসব
খ্রিষ্টানদের সবচেয় বড় ধর্মীয় উৎসব ক্রিস্টমাস বা বড়দিন৷ যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন উপলক্ষ্যে এই উৎসব এখন বাংলাদেশে সর্বজনীন রূপ পেয়েছে৷ তাই গির্জায় গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা, ভোজসভা এবং উপহার বিতরণে সব ধর্মের মানুষই অংশ নেয়৷ ঢাকার বড় বড় হোটেলে থাকে বড়দিনের বিশেষ আয়োজন৷ সাজানো হয় ক্রিসমাস ট্রি, থাকে স্যান্টা ক্লসও৷ শিশুরা স্যান্টা ক্লসের কাছ থেকে উপহার পেতে চায়৷ বাবা-মা তাদের শিশুদের নিয়ে সেখানে যান তাদের আনন্দ দিতে৷ অন্য ধর্মের কেউ কেউ ঘরেও ক্রিসমাস ট্রি সাজানয এছাড়া ইস্টার সানডেও পালিত হয় কোথাও কোথাও৷

আদিবাসীদের উৎসব
বাংলাদেশের আদিবাসীরা বাংলা নববর্ষে ‘বৈসাবি' নামে একটি উৎসব পালন করে৷ এটাও সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে৷ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রধান তিনটি আদিবাসী সমাজের বর্ষবরণ উৎসব এটি৷ ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুক বা বৈসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই এবং চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে বিজু নামে পরিচিত৷ বৈসাবি নাম হয়েছে এই তিনটি উৎসবের প্রথম অক্ষর গুলো নিয়ে৷ এই বৈসাবি উৎসবে অংশ নিতে সারাদেশ থেকে উৎসাহীরা যান পার্বত্য চট্টগ্রামে৷
এছাড়া ঢাকা, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে মুসলমানদের মর্সিয়া, কাসিয়া, নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে হিন্দুদের অষ্টমী স্নান, মৌলভীবাজারের মাধবপুর এবং সুন্দরবনের দুবলারচরে রাশ উৎসব ধর্মীয় সর্বজনীন উৎসবের উদাহরণ৷
ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসির মামুন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘বাঙালির চিরায়াত ঐতিহ্য হলো ধর্মকে যার যার জায়গায় রেখে উৎসবকে ভাগাভাগি করে নেওয়া৷ আমি এবার বাগেরহাটে পূজা দেখতে গিয়েছিলাম৷ সেখানে ৬৫ জন স্বেচ্ছাসেবকের মধ্যে ৬০ জনই মুসলমান৷ প্রতিমা দেখার একটা ঐতিহ্য আছে আমাদের৷ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই প্রতিমা দেখছেন৷ অংশ নিচ্ছেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে৷ তেমনি মুসলামনদের ধর্মীয় উৎসবেও অংশ নেন সব ধর্মের মানুষ৷''
বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি রানা দাসগুপ্ত ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘যে যার ধর্ম আচারনিষ্ঠভাবে পালন করেন৷ কিন্তু উৎসব ভাগাভাগি করেন নেন৷ পূজা অথবা ঈদ-কোরবানি – দু'টোতেই আমরা তা দেখে আসছি৷ কোনো কোনো গোষ্ঠী মাঝে মাঝে তাদের স্বার্থে এই সম্প্রীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় বা নিয়েছে – এ কথা সত্য৷ কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয় না৷ কারণ এখানে ধর্মের সঙ্গে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে৷''
বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রসঙ্গে শোলাকিয়ার ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বলেন, ‘‘ইবাদত-পূজা আর উৎসব – এ দু'টোকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না৷ ইবাদত ও পূজার বাইরে যে উৎসব, তা তো সবার৷ এটা মানবিকতা৷ আমরা সব ধর্মের মানুষ, আমাদের উৎসবে পরস্পরকে আপন করে নেবো – এটাই তো ধর্মের শিক্ষা৷ বাংলাদেশের ঐতিহ্যও তাই৷ কিন্তু কেউ কেউ দু'টি বিষয়কে যখন গুলিয়ে ফেলেন, তখনই সমস্যা হয়৷''
তবে এই তিনজনই মনে করেন, অপশক্তি কখনোই সফল হবে না৷ বাংলাদেশে ধর্মীয় উৎসবের যে সর্বজনীন ঐহিত্য, তা ম্লান করা যাবে না কখনোই৷


মন্তব্য