kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পর্নোগ্রাফির ফাঁদে পড়ছে মেয়ে শিশুরা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ২০:৫১



পর্নোগ্রাফির ফাঁদে পড়ছে মেয়ে শিশুরা

মেয়েটি এখন মানসিকভাবে অসুস্থ। কোনো কিছু মনে রাখতে পারে না।

পাঁচ বছর ধরে তার লেখাপড়া বন্ধ। পরিবারের লোকজন চেষ্টা করছেন তাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে। এতে যে সমস্যার সুরাহা হবে এমন কথাও ভাবেন না পরিবারের লোকজন। তাকে নিয়ে সবাই এখন দুঃচিন্তায় রয়েছেন। অথচ একসময় এ মেয়েটিই সবাইকে মাতিয়ে রাখতো।
মেয়েটির নাম সুমি। এটি তার ছদ্মনাম। তার জীবনের দুর্ঘটনা শুরু ২০১১ সালে। তেজগাঁওয়ের সিভিল এভিয়েশন উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীতে পড়া সুমির ঘনিষ্ঠ সময়ে কিছু ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয় তারই ছেলে বন্ধু আতিকুল ইসলাম ইমন। সব কিছু তছনছ হয়ে যায় তার এবং তার পরিবারের। তার মা ছেলেটির বিরুদ্ধে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করেন। এ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়ে আতিকুল এখন কারাভোগ করছে।
তার কারাভোগের বিষয়টি সুমি ও তার পরিবারের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও তাদের জন্য সেই দুর্ঘটনাটি এখনো পীড়াদায়ক,যা কারাভোগেরই সামিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশ বলছে, এ ধরণের অভিযোগ প্রায়ই আসছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সে-ই ছেলেটিও অনেকটা অপ্রাপ্ত বয়স্ক।  হয়তো না বুঝেই তারা ‘ডিফারেন্ট কিছু’ করতে গিয়ে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সময়ের ছবি বা ভিডিও তুলেছে, পরে যা নেটে বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু ছেলেটির পরিণতি যাই হোক মেয়েটি ও তার পরিবার সামাজিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। অনেকেই মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। এতে যে ভালো ফল দিচ্ছে, তা নয়। আবার কোন কোন মেয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে।  
বিপর্যন্ত সুমির পরিবার : সম্প্রতি সুমির বাবার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন তিনি বারবার চোখ মুছছিলেন । তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে অন্তত সাত বার বাসা পাল্টিয়েছি। অন্য ছেলে-মেয়েদের স্কুল বদলাতে হয়েছে। পরিবারের অন্য আত্মীয়-স্বজনেরা আমার বাসায় প্রায় আসেন না। আমার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে অন্য স্বজনেরা তাদের ছেলেমেয়েদের মিশতে পর্যন্ত দেন না।
সুমির ব্যবসায়ী বাবা আরো বলেন, তবে একটাই সান্ত¦না শেষ পর্যন্ত ইমনের সাজা হয়েছে। ইমন এখন যাবজ্জীবন দন্ড ভোগ করছে। কিন্তু আমার মেয়েটার জীবনটা তো শেষ হয়ে গেছে। মানসিকভাবে ও অসুস্থ। কিছুই মনে রাখতে পারে না। পড়ালেখা তো পাঁচ বছর ধরেই বন্ধ। আমরা এখনো চিকিৎসা করাচ্ছি। ওর এক নানা থাকে আমেরিকায়। ওকে সেখানে পাঠানোর চেষ্টা করছি ।
পুলিশের নথি থেকে জানা যায়, গত ২০১১ সালে ২৪ এপ্রিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলাটি দায়ের করেন মেয়েটির মা। সেখানে বলা হয়, সুমি যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়তো তখন ২০১০ সালের ২ নভেম্বর বিকেলে মহাখালির মার্কেট গলির একটি ভবনের তৃতীয় তলায় সুমিকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে আতিকুল ইসলাম ইমন। ধর্ষণের দৃশ্য মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোনে ধারণ করে রাখে ইমন। এরপর বিভিন্ন সময় সেই দৃশ্য ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে সুমিকে আরো কয়েকবার ধর্ষণ করে সে। এর কিছুদিন পর থেকে সুমি ইমনের ডাকে সাড়া না দিলে ইমন ধর্ষণের দৃশ্যটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। বিষয়টি পরিবারের নজরে আসার পরে সুমির মা মামলা করে।
এ রকম আরো ঘটনা : সুমির মতো এ রকম ঘটনার শিকার হচ্ছে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে অনেক শিশু কন্যাকে যেমন, গত ২০১৪ সালে কুমিল্লার বরুড়ায় নবম শ্রেণীর এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করার পর তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এরপর থেকেই মেয়েটির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। মেয়েটির পরিবার প্রায় একঘরে। আর মেয়েটিকে গ্রামছাড়া হতে হয়েছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বখাটে অলিউল্লাহ স্কুলে যাওয়ার পথে মেয়েটিকে জাপটে ধরে রাস্তায় ফেলে দেয়। এরপর সে মেয়েটির মুখে আঘাত করে। সে দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করে অলিউল্লাহর সহযোগীরা। এরপর ১৪ অক্টোবর সকালে মেয়েটি অসুস্থ বাবার জন্য ওষুধ আনতে বাইরে বের হয়। এ সময় অলিউল্লাহ মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। এ দৃশ্যও অলিউল্লাহর সহযোগীরা মুঠোফোনে ধারণ করে। পরে তারা ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়।
গত বছর একই ধরনের ঘটনার শিকার হয় লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরফলন ইউনিয়নের এক স্কুলছাত্রী। মেয়েটিরও পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মেয়েটির বাবা মামলা করলে কমলনগর থানার পুলিশ মূল অভিযুক্ত মেয়েটির বন্ধু সোহাগ হোসেনসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে।  
পুলিশ জানায়, প্রেমের ফাঁদে ফেলে মেয়েটির সঙ্গে খোলামেলা দৃশ্য মুঠোফোনের ক্যামেরা ধারণ করে সোহাগ ও তাঁর সহযোগীরা। এরপর তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। এরপর থেকে পরিবারটিকে সবাই উপেক্ষা করে।
চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা চরহরিরামপুর ইউনিয়নের চরসালেপুর গ্রামের এক স্কুলছাত্রী ‘ম’কে ভুট্টা ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে স্থানীয় বখাটে উজ্জ্বল খান, শুকুর আলী সিকদার, সিরাজ শেখ ও তাদের সহযোগীরা। সে দৃশ্য মুঠোফোনে ধারণ করে তারা ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়। এরপর থেকে এ ছাত্রীর পরিবারে নেমে আসে সামাজিক বিপর্যয়। প্রায় একঘরে হয়ে যায় তারা।
পুলিশ ও র‌্যাবের শীষর্ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, তাদের জানা মতে দেশে মেয়েদের পর্নোগ্রাফিতে পরিণত করার আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ২০০১ সালে। কক্ষের মধ্যে ভিডিও ক্যামেরা চালু করে মেয়েদের অজান্তে তাদের খোলামেলা ঘনিষ্ট দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করে তাদেরই ছেলে বন্ধু ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় মামলা হলেও কেউ শাস্তি পায়নি। এ ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত প্রবাসী বাংলাদেশী সুমন মামলার আগেই দেশ থেকে পালিয়ে যায় । কিন্তু ঘটনার শিকার মেয়েগুলোর সামাজিক ও ব্যক্তি জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । প্রথম প্রথম তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলাটির বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও পরে তারা আর কোনো যোগাযোগ করেননি।
গত সেপ্টেম্বরে বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের শিশু পরিস্থিতি’ নামের একটি প্রকাশনা সংস্থার সমন্বয়ক আব্দুল্লা আল মামুন লিখেছেন, স্কুলগামী শিশুদের একটি বড় সংখ্যা (প্রায় ৭৭ ভাগ) নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখছে। ১ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে আব্দুল্লা মামুন গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঢাকার স্কুলগামী শিশুদের ৭৭ শতাংশ নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখছে। তাদের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি পর্নোগ্রাফির চেয়ে অ্যামেচার পর্নোগ্রাফি বেশি জনপ্রিয়। আর যাদের ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ছে তাদের বেশির ভাগের বয়সই ১৮-এর নীচে। তিনি বলেন, গবেষণায় এ ধরনের পর্নোগ্রাফি তৈরির পেছনের কারণ জানার চেষ্টা করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, প্রধানত সামাজিকভাবে হেয় করতে এবং ব্ল্যাকমেইল করতে এ ধরনের ভিডিওগুলো করা হয়। সমাজে মেয়েটির অথবা ছেলেটির পরিবারকে খাটো করতে, অর্থ লোভে অথবা নানা ধরনের যৌন শোষণে বাধ্য করতে বা বারবার যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে এ ভিডিওগুলো করা হচ্ছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ভিডিও তৈরির বিষয়টি মেয়েটি জানে না। আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে নারী-পুরুষের অগোচরে তৃতীয় একটি পক্ষ লুকিয়ে ভিডিও করেছে।
অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ার কারণে এসব ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, শিশুরা সমাজ থেকে শেখে। যখন তারা দেখে অপরাধীর সাজা হচ্ছে না, তখন তারা নিজের জীবনে সে ওই অপরাধীকে অনুকরণ করার চেষ্টা করে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য অভিভাবকদের উচিৎ তাদের ছেলে ও মেয়েদের ওপর নজরদারি করা। তারা কাদের সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এসবই অভিভাবকদের জানতে হবে। এবং এ ধরনের ঘটনা ঘটালে কী পরিণতি হতে পারে সে বিষয়ে ছেলেমেয়েদের সতর্ক করতে হবে। বিশেষ করে মেয়েরা যেনো এ ধরণের ফাঁদে না পড়ে সে জন্য তাদের সচেতন করা যেতে পারে।  
তিনি আরো বলেন, স্কুল বা কলেজে সময়ে স্কুল কলেজের পোশাক পরিহিত ছেলেমেয়েদের আড্ডা দিতে পুলিশ নিরুৎসাহিত করে। এ ক্ষেত্রে স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ একেবারে নির্বিকার। কিন্তু স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষকেও সচেতন হতে হবে। - বাসস।

 


মন্তব্য