kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আর মাত্র ১৫ দিন থাকছে ইলিশের মৌসুম

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১০:০৫



আর মাত্র ১৫ দিন থাকছে ইলিশের মৌসুম

এ বছর ইলিশের এই রমরমা মৌসুম থাকবে আর মাত্র ১৫দিন। এরপর ২২ দিনের জন্য ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হবে।

এই নিষেধাজ্ঞা চলবে আগামী ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত। ইলিশের মা মাছ রক্ষা এবং ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতেই প্রতিবছর এই সময়ে ইলিশ ধরা বন্ধ রাখা হয়। অন্যান্য বছরের চেয়ে এ বছর সময় কিছুটা বাড়ানো হয়েছে বলে জানায় মৎস্য অধিদফতর।
ইলিশের বাস সাগরে। কিন্তু ডিম ছাড়ার আগে নদীর মিঠাপানিতে আসে ঝাঁকে-ঝাঁকে ইলিশ। একটি মা-ইলিশ সর্বনিম্ন দেড় লাখ ও সর্বোচ্চ ২৩ লাখ পর্যন্ত ডিম দেয়।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১০ বছর আগেও দেশের মাত্র ২১টি উপজেলার নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ইলিশ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ১২৫টি উপজেলার নদীতে। বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ শতাংশই উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে। বাকি ইলিশ উৎপাদিত হয় প্রধানত ভারত ও মিয়ানমারে। আর দেশের নদীতে ধরা পড়া মোট মাছের ১১ শতাংশই ইলিশ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, ‘ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম ধরে গত বছর আশ্বিন মাসের প্রথম চাঁদের পূর্ণিমার দিন এবং এর আগের তিন দিন ও পরের এগারো দিনসহ মোট ১৫ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল। আর এ বছর আশ্বিন মাসের প্রথম চাঁদের পূর্ণিমার দিন এবং এর আগে চার দিন ও পরের সতের দিনসহ মোট ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ থাকবে। ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার সময় পার হওয়ার পরও মা ইলিশ সমুদ্রে ফিরে যাওয়ার পথে ধরা পড়ে। এ জন্যই এ বছর সময় ৭দিন বাড়িয়ে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকছে। এ সময়ে ইলিশ ধরা ঠেকাতে অভিযান চালানো হবে। সরকারের নির্দেশ অমান্য করলে শাস্তি অবধারিত বলে হুঁশিয়ার করেন তিনি। ’
তিনি বলেন, ‘এবার ইলিশ রক্ষায় সচেষ্ট থাকবে সরকার। অবৈধভাবে জাটকা নিধন রোধে কঠোর থাকার পাশাপাশি জেলেদের পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়া হবে। জাটকা নিধন রোধে ইলিশ ধরা জেলেদের জন্য ভিজিএফের মাধ্যমে খাদ্যদ্রব্য সরবরাহের সময় বাড়ানো হবে। একইসঙ্গে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে জাটকা মৌসুমে নদীতে ইলিশ মাছ ধরা অনেক কমে যায়। এর ফলেই এ বছর ইলিশের উৎপাদন যথেষ্ট বেড়েছে। ’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা-ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারায় এ ধারাবাহিক সফলতা এসেছে। পাশাপাশি সরকারের জাটকানিধন কার্যক্রম, মা-ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম, ইলিশের অভয়াশ্রম চিহ্নিতকরণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান, ইত্যাদি সময়োপযোগী কর্মসূচি ইলিশের সংখ্যা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মা-ইলিশ রক্ষায় ২০১১ সালে যেখানে এক হাজার ৪৪০টি অভিযান চালানো হয়েছিল, সেখানে ২০১৫ সালে চালানো হয় ৫ হাজার ২০৯টি অভিযান। এ কারণেই এ বছর ভালো সাইজের ইলিশ পেয়েছে দেশের মানুষ।
মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন নদীতে ইলিশ ধরা পড়লেও বিশেষ করে চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর হচ্ছে ইলিশ অধ্যুষিত জেলা। এই জেলাগুলোর আশপাশের নদীগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে তালা হয়েছে ইলিশের অভয়ারণ্য। সাগর থেকে ইলিশের ঝাঁক এসব জেলার আশপাশের নদীগুলোয় এসেই ডিম ছাড়ে। পদ্মাসহ চাঁদপুরের মেঘনা, ভোলার তেঁতুলিয়া, বরিশালের কীর্তনখোলা, পটুয়াখালীর পায়রা, আগুনমুখা, পিরোজপুরের বলেশ্বর এবং সন্ধ্যা নদীর মাছ সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, একটি মা-ইলিশের পেট থেকে দুই ফালি ডিম থেকে সর্বনিম্ন দেড় লাখ এবং সর্বোচ্চ ২৩ লাখ পর্যন্ত ডিম দেয়। ইলিশ কেবল আমাদের জাতীয় মাছই নয়, জাতীয় সম্পদও বটে। বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। ইলিশ উৎপাদনের সফলতা ধরে রাখার জন্য দেশের ১৫টি জেলায় ২ লাখ ২৪ হাজার ১০২টি জেলে পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে সরকার। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল প্রায় তিন লাখ টন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা বেড়ে সাড়ে তিন লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। ভোলা জেলার মনপুরা, ঢালচর, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া কালিরচর ও মৌলভীরচরকে ইলিশের বিশেষ প্রজনন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে প্রতিবছর ৫ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ আহরিত হয়। এর ৬০ শতাংশই আহরিত হয় বাংলাদেশে। সার্বিক প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় জিডিপিতে এর হিস্যা ১ শতাংশের সমপরিমাণ। গত কয়েক বছর ধরেই দেশে ইলিশের উৎপাদন তিন থেকে চার লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে ওঠানামা করছে। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। তবে ইলিশের গড় উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টনের মতো। এই হিসেবে প্রচলিত বাজারমূল্যে প্রতিকেজির গড় দাম কম করে ৬৫০ টাকা ধরা হলেও সংগৃহীত সাড়ে তিন লাখ টন ইলিশের সার্বিক বাজার মূল্য দাঁড়ায় ২২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। এই হিসেবে চলতি মৌসুমে ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ শুধু মা ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়ায় এর বাজার মূল্য দাঁড়াবে ১৫ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা।
মৎস্য অধিদফরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে ২ লাখ টনের কম ইলিশ উৎপাদিত হতো। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত হয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার টন। অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০০-০১ সালে ২ লাখ ২৯ হাজার ৭১৪ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। কিন্তু পরের অর্থবছরে উৎপাদন ৯ হাজার ১২১ টন কমে গেছে। ২০০২-০৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন আরও কমে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২ টনে নেমে আসে। এরপর জাটকা রা কর্মসূচিতে জোর দেয় সরকার। এতে উৎপাদন কিছুটা বাড়তে থাকে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৯২১ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। এরপর মা-ইলিশ না ধরার কর্মসূচি আরও জোরদার করলে ইলিশের উৎপাদন ৩ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়।
মৎস্য অধিদফতরের হিসাবে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ লাখ টনের বেশি ইলিশ উৎপাদন হয়। আর চলতি বছর উৎপাদন সাড়ে ৪ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।


মন্তব্য