kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২০:৪৩



বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক

সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের সুপারিশ করেছে।
একই সাথে শিক্ষক নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে প্রার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য যাচাই করার জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুপারিশ করেছে মন্ত্রণালয়।


শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে এসব সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু এ ধরনের সুপারিশ এরই মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
যে প্রশ্নটি বেশ জোরালো হয়ে উঠছে তা হলো - প্রার্থী যোগ্য হলেও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে তাকে বাদ দেয়ার সুযোগ তৈরি হবে কিনা?
তাছাড়া সরকারের রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে একমত নয়, এমন প্রার্থী যোগ্য হলেও তাকে পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে অযোগ্য করার সুযোগ তৈরি হবে কিনা?
এ ধরনের আশংকা অনেকের মাঝেই আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো: মজিবুর রহমান মনে করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটির আসল উদ্দেশ্যে কী তার উপর বিষয়টির ভালো-মন্দ নির্ভর করবে। এসব সুপারিশ নিয়ে মি: রহমানের কিছু আশংকা রয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষার বিষয়টিকে তিনি অপ্রয়োজনীয় মনে করেন । তার আশংকা হচ্ছে, এর মাধ্যমে কোন প্রার্থীকে বঞ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মি: রহমান বলেন, "যাদেরকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে, তারা কিন্তু লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেই এ পর্যায়ে এসেছে। বরং আমি প্রেফার করি, লিখিত পরীক্ষার বদলে তার ক্লাসরুমের পারফর্মেন্স দেখা জরুরী। একটা ডেমো ক্লাস নিয়ে প্রার্থীর পারফরমেন্স দেখা দরকার। "
শিক্ষক নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকশনের যে সুপারিশ এসেছে সেটিকে ভালোভাবে দেখছেন না মি: রহমান। পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে কোন প্রার্থী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে পারে বলেও তিনি আশংকা করেন।
মি: রহমান বলেন,"পুলিশ ভেরিফিকেশনের বিষয়টা যখন আসে, তখন দেখা যায় যে তার বাড়ি কোথায়, গ্রাম কোথায় এ জিনিসগুলো খুঁজবে। রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতের যারা আছে, পুলিশ ভেরিফিকশনের নামে তাদের বাদ দেবার একটা আশংকা তৈরি হবে। "
মি: রহমানের বর্ণনায়, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, শিক্ষকতা পেশার প্রতি প্রার্থীর ভালোবাসা এবং তার বিশ্লেষণী ক্ষমতা। এ বিষয়গুলোর প্রতি জোর দেয়া জরুরী বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করছে, মৌখিক পরীক্ষার পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হলে মেধা যাচাই করা সহজ হবে এবং অনিয়মের সুযোগ কমে আসবে।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য কিনা সে বিষয়টি পরিষ্কার নয়। তাছাড়া এ সুপারিশ বাস্তবায়ন না করলে কী হবে সে ব্যাপারেও সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তারা নিজস্ব পদ্ধতি অনুযায়ী এ নিয়মগুলো চালু করবে বলে মন্ত্রণালয় আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য থাকাকালীন নিয়োগের সময় লিখিত পরীক্ষা সেবার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
কিন্তু নানা কারণে সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক মান্নান বলেন, " আমি যখন ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরীতে ঢুকেছিলাম তখন কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়েছিল। পরে শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এটি উঠিয়ে দেয়া হয়। "
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হবার জন্য আবেদন করেছেন তানজিলুত তাসনুবা। আর কিছুদিন পরেই তাকে শুধুই মৌখিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। কোন লিখিত পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষার উদ্যোগকে তিনি সমর্থন করতে পারছেন না।
তানজিলুত তাসনুবা বলেন,"যদি এমন হয় যে, আমি পাঁচটা প্রশ্নের উত্তর দেব, তাহলে আমি অবশ্যই এর পক্ষে নই। একজন শিক্ষককে নিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচটা বা তিনটা প্রশ্নের উত্তর দেবার চেয়ে জরুরী হলো সে কিভাবে শিক্ষকতা করবে। যদি এমন কোন ব্যবস্থা করা যেতো যার মাধ্যমে যে একজন প্রার্থী টিচিং স্টাইল এবং পড়ানোর ক্যাপাসিটি যাচাই করে দেখা। "
তিনি মনে করেন, শিক্ষক নিয়মের ক্ষেত্রে যদি অনিয়ম থেকে থাকে তাহলে সেটি শুধুই লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে দূর করা যাবেনা।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি লিখিত পরীক্ষা চালু করা হয়, তাহলে ক্ষতিটা কোথায়?
গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সময় কোন কোন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
এমন অভিযোগও এসেছে যে, প্রার্থী যদি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক হয় তাহলে তার যোগ্যতার ক্ষেত্রেও ছাড় দেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, যে শিক্ষার্থী তার অনার্স ও মাস্টার্সে সবচেয়ে ভালো ফলাফল করে তাকে শিক্ষক হিসেবে বাছাই করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময় শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিলেন বর্তমান উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান।
তিনি মনে করেন, লিখিত পরীক্ষায় অনেক সময় যোগ্য প্রার্থী বাদ পড়ে যাবার ঝুঁকি থাকে।
অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, "দেখা গেল, দশজন আবেদনকারীর মধ্যে কেউ কারও জিপিএ ৪.৯০ কারও ৪.৮০ আবার কেউ হয়তো জিপিএ ৫। যিনি ভালো জিপিএ পেয়েছেন তিনি হয়তো এক ঘন্টা বা ত্রিশ মিনিটের একটি পরীক্ষায় কোন কারণে খারাপ করলো। তখন সে পরীক্ষার অজুহাতে তাকে যদি বাদ দেয়া হয়, সেটা ভালো ম্যাসেজ (বার্তা) নয়। "
তবে কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
সব আবেদনকারী ফলাফল যদি একই মানের হয়, সেক্ষেত্রে একটি লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে কিছু আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে অধিকতর যোগ্য প্রার্থীদের জন্য মৌখিক পরীক্ষার আয়োজন করা যেতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতিতে অনিয়মের সুযোগ আছে বলে যে অভিযোগ রয়েছে সেটি মানতে নারাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য।
তিনি বলেন, বর্তমান পদ্ধতিতে শুধু মৌখিক পরীক্ষার উপর ভিত্তি করে শিক্ষক নিয়োগ হয় না। এক্ষেত্রে প্রতিটি আবেদনকারীর একাডেমিক রেকর্ড পর্যালোচনা করা হয় বলে উপ-উপাচার্য উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, "একটা কমপিটেন্ট বডি আবেদনকারীদের একাডেমিক রেকর্ড মূল্যায়ন করে। আবেদনকারীদের একাডেমিক রেকর্ডের পূর্ণাঙ্গ কাগজ-পত্র বিশেষজ্ঞরা যাচাই বাছাই করে। "
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবার যে পদ্ধতি সেখানে সবাই আবেদনের জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড অনুযায়ী যারা ভালো ফলাফল (প্রথম শ্রেণীর সমান) করে তারাই আবেদন করতে পারে।
অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, "ভালো ফলাফলের অধিকারী বা এক নম্বর-দুই নম্বর হওয়া - সেটার জন্য মাপকাঠি নির্ধারিত থাকে। তারা পাঁচ-ছয় বছর যেখানে পড়াশুনা করে সেখানে অনার্স এবং মাস্টার্স পরীক্ষার মাধ্যমে ভালো শিক্ষার্থী মূল্যায়িত হয়। "
তবে শিক্ষক নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা হলে গুনগত মান বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান। লিখিত পরীক্ষা চালু হলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে বলেও তিনি মনে করেন।
অধ্যাপক মান্নান বলেন, "যখন শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ হয়, তখন দেখা যায় নানা ধরনের চাপ থাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে। লিখিত পরীক্ষা চালু হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ধরনের চাপ থেকে মুক্ত হবে। লিখিত পরীক্ষায় ভালো না করলে সুপারিশ করার জোর থাকবে না। "
তবে পুলিশ ভেরিফিকেশন যেন স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হয় এবং সেখানে যাতে কোন দুর্নীতি প্রবেশ না করে।


মন্তব্য