kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আজহা

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:০৬



রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আজহা

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসব আমেজে মঙ্গলবার সারাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা ঈদ নামাজ ও পশু কোরবানির মধ্যদিয়ে পালন করবে ধর্মীয় দ্বিতীয় বৃহত্তম এ উৎসব।

হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আত্মত্যাগ ও অনুপম আদর্শের প্রতীকী নিদর্শন হিসেবে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছর আগে থেকে শুরু হয় কোরবানির এ প্রচলন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে উদ্যত হয়েছিলেন। ওই অনন্য ঘটনার স্মরণেই ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির এ রেওয়াজ চালু হয়।

মহান আল্লাহপাকের প্রতি আনুগত্য এবং তাঁরই রাহে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের এ ঐতিহাসিক ঘটনার ধারাবাহিকতায় মুসলিম বিশ্বে কোরবানী ও ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়ে আসছে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় দ্বিতীয় বৃহত্তম এ উৎসব উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পবিত্র ঈদ-উল-আযহার মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে বিভেদ-বৈষম্যহীন সুখী-সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ধর্মের নামে অপব্যাখ্যা দিয়ে বা প্রলোভন দেখিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল যাতে সমাজে বিশৃংঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকার আহবান জানিয়েছেন।  

ঈদের দিন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন।

ধর্মীয় এ উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দও দেশবাসীকে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

এ উপলক্ষে রবিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত চার দিনের সরকারি ছুটি চলছে। তাছাড়া শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় দেশবাসী টানা ছয় দিনের ছুটি ভোগ করছে।

লম্বা এ ছুটির কারণে নগরীর লাখ লাখ বাসিন্দা গ্রামের বাড়িতে আপনজন ও আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ঈদের খুশি ভাগাভাগি করতে ইতোমধ্যে রাজধানী ছেড়ে গিয়েছেন এবং অনেকে আজও যাচ্ছেন।

রেলওয়ে স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল ও বাস টার্মিনালগুলোতে এ কারণে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে আসন না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে এসব বাহনের ছাদে উঠে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন।

ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ে, বিআরটিসি, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডাব্লিউটিসি), বাংলাদেশ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য বেসরকারি পরিবহন সংস্থা বিপুলসংখ্যক যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

পবিত্র এ দিনটিকে উৎসবের আমেজ দিতে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়ক দ্বীপসমূহে জাতীয় ও ঈদ মোবারক খচিত পতাকা দিয়ে সুশোভিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সকল সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা ও ঈদ মোবারক খচিত পতাকা উত্তোলন এবং নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারী ভবনগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের সকল কারাগার, সরকারি হাসপাতাল, ভবঘুরে কল্যাণ কেন্দ্র, বৃদ্ধাশ্রম, শিশুসদন, ছোটমনি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র, সেফ হোম্স, দুস্থ কল্যাণ কেন্দ্র এবং শিশু ও মাতৃসদনে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।

হজরত ইব্রাহিম (আ.) নিজ পুত্রকে কোরবানি দেয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহপাকের নির্দেশে তিনি জীবদ্দশায় প্রতি বছরই পশু কোরবানির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার আনুগত্যের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)ও এ আদর্শ অনুসরণ ও বহাল রাখতে আদিষ্ট হন। তিনিও তাঁর জীবদ্দশায় প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন এবং তাঁর উম্মতদের জন্য এ আদর্শ ও প্রথা অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে গেছেন।

এ আদর্শ অনুসরণের লক্ষ্যে গোটা মুসলিম জাহানের পাশাপাশি বাংলাদেশেও ঈদ উদযাপনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে পশু কোরবানি দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন।  

কোরবানির পশু কেনার জন্য গত কয়েক দিন যাবত গাবতলী পশু হাটসহ রাজধানী ও আশপাশের অস্থায়ী পশু হাটগুলোতে ক্রেতাদের বেশ ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। ইতোমধ্যে অনেকে কোরবানির পশু ক্রয় করেছেন। যারা এখনও কেনেননি, তারা সাধ্য ও সামর্থের মধ্যে পছন্দের গরু, ছাগল বা অন্য কোন হালাল পশু ক্রয় করতে হাটে হাটে ঘুরছেন। পশুর বাজার এবার বিক্রেতারা বেশ ভাল দাম পাচ্ছে বলে জানা গেছে।

পবিত্র এ উৎসব উপলক্ষে দৈনিক পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও বিনোদনমূলক বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

যথাযোগ্য মর্যাদা ও আনন্দ উৎসবের মধ্যদিয়ে ঈদ উদ্যাপনের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্থানীয় পর্যায়ে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো দেশব্যাপী ঈদ উদ্যাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তাছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসসমূহে সরকারি কর্মসূচির আলোকে ঈদুল আজহা উদ্যাপনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে চার শতাধিক ঈদ জামাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিট কর্পোরেশন এলাকায় জাতীয় ঈদগাহ’র প্রধান জামাতসহ ইদুল আজহার ২২৯টি এবং উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১৮০টি জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

জাতীয় ঈদগাহে সকাল সাড়ে ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে। এদিকে, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের উদ্যোগে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল ৮টায় ঈদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পর্যায়ক্রমে ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ৭টায়, দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টায়, তৃতীয় জামাত সকাল ৯টায়, চতুর্থ জামাত সকাল ১০টায় এবং পঞ্চম ও শেষ জামাত সকাল পৌনে ১১টায় অনুষ্ঠিত হবে।  

দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য মুসুল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিশেষ ট্রেন ও বাস চলাচল করবে।

এদিকে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত স্থানগুলোতে পশু কোরবানির জন্য নগরবাসীকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সেই সাথে উভয় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোরবানীর পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণের বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।  
দুই সিটি কর্পোরেশনের ১০ হাজার ৫৪৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বর্জ্য অপসারণে নিয়োজিত থাকবে। ঈদের দিন বেলা দু’টোর পর থেকে পরের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সকল বর্জ্য অপসারিত হবে বলে ঢাকার দুই মেয়র সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) কোরবানির বর্জ্য অপসারণে ২ লাখ ১০ হাজার চটের বস্তা ও পচনশীল পলিব্যাগ বিনামূল্যে বিতরণ করেছে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নগরীর বর্জ্য অপসারণে পর্যাপ্ত জনবল, যন্ত্রপাতি, মালামাল, পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নগরবাসীকে দ্রুত পরিচ্ছন্ন নগরী উপহার দিতে ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। কোরবানির বর্জ্য অপসারণে ডিএসসিসির ৫৭টি ওয়ার্ডে ৭ হাজার ৩০৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাঠে থাকবে। তারা ডিএসসিসির ১৪টি অস্থায়ী পশুর হাটের বর্জ্য অপসারণেও কাজ করবে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) বর্জ্য পরিস্কারের জন্য ৩ হাজার ২৩০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাঠে থাকবে। ঈদে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য ডিএনসিসি দুটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। কোরবানি দেয়ার জন্য ডিএনসিসি ৬৪৮টি স্থান নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ১৯৬টি স্থানে মাওলানা ও কসাইসহ যাবতীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পশু জবাইয়ের পর ফিনাইল ও স্যাভলন মিশ্রিত পানি দিয়ে প্রতিটি স্থান দ্রুত পরিস্কার করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। দ্রুত পশুর বর্জ্য অপসারণের সুবিধার্থে উত্তর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে দুই লাখ পলিব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া এলাকায় এলাকায় মাইকে প্রচার ও সাড়ে পাঁচ লাখ লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।


মন্তব্য