kalerkantho


জনগণকে ছেড়ে আত্মগোপন করতে অস্বীকার করেছিলেন বঙ্গবন্ধু

কানাই চক্রবর্তী    

২৬ মার্চ, ২০১৬ ২৩:০১



জনগণকে ছেড়ে আত্মগোপন করতে অস্বীকার করেছিলেন বঙ্গবন্ধু

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন বাঁচাতে জনগণকে ছেড়ে আত্মগোপন করতে অস্বীকার করেছিলেন। যদিও এটিই প্রথম ঘটনা নয়।

এর আগেও তিনি এভাবে জীবনে ঝুঁকি নিয়েছেন। ২৬ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক জান্তা তাকে গ্রেফতার করে।
৩০ মার্চ প্রকাশিত লন্ডনভিত্তিক ইংরেজী ‘ দৈনিক ডেইলি টেলিগ্রাফে “পাকিস্তানে আন্দোলন গুড়িয়ে দিয়েছে ট্যাংক” শিরোনামে প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ কথা বলা হয়।
২৫ মার্চের কালো রাতে একজন সহকর্মীর ফোন পেলেন বঙ্গবন্ধু। এই সহকর্মী তাকে পালিয়ে যাবার পরামর্শ দেন। তিনি জানান, রাত ১০টা থেকে তিন ব্যাটালিয়ন সৈন্য ঢাকা ঘিরে ফেলেছে। এর মধ্যে এক ব্যাটালিয়ন সাজোয়া যান, এক ব্যাটলিয়ান পদাতিক ও এক ব্যাটালিয়ন গোলন্দাজ সৈন্য রয়েছে।
বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তবে তিনি বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে অস্বীকার করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর সেই সহকর্মীকে বললেন, তিনি যদি বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান, তাহলে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকে খুঁজে বের করতে সারা ঢাকা শহর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেবে।
পত্রিকাটির প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত এম-২৪ ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ সমগ্র ঢাকা মহানগরী ঘিরে ফেলে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশ করে এবং ক্যাম্পাসে ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরীর সামনে অবস্থান নেয় এবং এখান থেকে আবাসিক হল এলাকায় কামানের গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। একই সময় সৈন্যরা রাজারবাগ পুলিশ লাইন এলাকায় প্রবেশ করে। এখানে প্রথমে ট্যাংক থেকে গোলা নিক্ষেপ করা হয়।
বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের একটি গ্রন্থেও এ বর্ণনা পাওয়া গেছে । তিনি লিখেন, ২৫ মার্চ রাত ১১টায় ঢাকা শহরে পাকিস্তানি আর্মিকে ট্যাংক বহরসহ নেমে পড়তে দেখে তিনি তাড়াতাড়ি শেখ মুজিবের বাসায় টেলিফোন করেন। এ সময় হাজি মের্শেদ নামে এক লোক টেলিফোন ধরেন। তিনি হাজি সাহেবকে বলেন, শেখ মুজিবকে অন্যত্র পাঠিয়ে দিতে।
মওদুদ আহমদ রাত ১২টা ৫০ মিনিটে আবারো টেলিফোন করেন। এবারও টেলিফোন ধরেন হাজি মোর্শেদ। হাজি সাহেব তাকে (মওদুদ ) জানান বঙ্গবন্ধু পালাতে অস্বীকার করেছেন। মওদুদ আহমদ এরপর রাত ১টা ১০ মিনিটে আবারও টেলিফোন করেন। এবার আর কেউ টেলিফোন ধরেননি।
এই হাজি মোর্শেদ সম্পর্কে ড. মোহাম্মদ হান্নান তার ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থে বিস্তারিত লিখেছেন। এই হাজি গোলাম মোর্শেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাসার এক ঘনিষ্ঠজন। বঙ্গবন্ধু যখন ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা শহর ছেড়ে চলে যেতে বলেন, তখন সবাই চলে গেলেও গোলাম মোর্শেদ বঙ্গবন্ধুর বাসায় অবাধ্যের মত থেকে যান। বিভিন্নজন টেলিফোন করে বঙ্গবন্ধুকে সরে যেতে বললে, বঙ্গবন্ধু তাদের জানান, তাহলে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকে খুঁজে বের করতে প্রয়োজনে সমগ্র ঢাকা শহর জ্বালিয়ে দেবে। তিনি শেষ পর্যন্ত পালাতে পারবেন না, সুযোগ পেয়ে ওরা তাঁকে হত্যাও করতে পারে।
হাজি গোলাম মোর্শেদ পরবর্তী সময়ে ড. হান্নান কে জানিয়েছেন, রাত ১১টা থেকে বঙ্গবন্ধুর বাসায় অসংখ্য টেলিফোন আসে এবং সবগুলো টেলিফোন তিনি নিজেই রিসিভ করেছেন। প্রায় সকলেই একই রকম বার্তা বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠাতে চেষ্টা করে, সেটা হলো, পাকিস্তানি সৈন্যরা ট্যাংক কামানসহ রাস্তায় নেমে পড়েছে, বঙ্গবন্ধু যেন তাঁর বাসভবন ত্যাগ করেন।
হাজি মোর্শেদ আরো বলেন, ‘কিন্তু রাত ১১টার পরে বলধা গার্ডেন বা তার কাছাকাছি কোন এক জায়গা থেকে এক অজ্ঞাত পরিচিত এক ব্যাক্তি টেলিফোন করে বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চায়, ‘ম্যাসেজটি পাঠানো হয়ে গেছে, বেতার যন্ত্রটি কোথায় লুকাবেন । ’
ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই তথ্য থেকে ধারণা করা যায় ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত বার্তা সারাদেশে পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন সোর্স ও পয়েন্ট প্রস্তুত রেখেছিলেন।
সাংবাদিক সাইমন ড্রিং এর লেখা একটি নিবন্ধে বলা হয়, পাকিস্তানের সৈন্যদের অপর একটি ইউনিট বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ঘিরে ফেলে। এ সময় বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারছিলেন যে কোন মুহূর্তে তাঁর বাড়ি আক্রান্ত হবে। তিনি বাড়ির গৃহকর্মীদের এবং তাঁর নিরাপত্তা কর্মী ছাড়া বাড়ির সকলকে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেন।
এক প্রতিবেশীর উদ্ধৃতি দিয়ে এতে বলা হয়, রাত ১টা ১০ মিনিট একটি ট্যাংক, একটি সাজোয়া যান এবং এক ট্রাক সৈন্য রাস্তার উপর নামে এবং বাড়ি লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে থাকে। একজন পাক সেনা কর্মকর্তা সামনে এগিয়ে গিয়ে ইংরেজীতে বঙ্গবন্ধুকে নেমে আসতে বলেন।
পাক সেনা কর্মকর্তা বলেন, শেখ ইউ সুড কাম ডাউন। শেখ মুজিব বাড়ির বেলকুনিতে বেরিয়ে এসে জবাবে বললেন, ইয়েস। আমি প্রস্তুত, তবে গুলি করার কোন প্রয়োজন নেই। আপনারা আমাকে প্রয়োজনে টেলিফোনে ডাকতে পারতেন। আমি চলে যেতাম। এরপর পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা বাড়ির বাগানে হেঁটে আসেন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ইউ আর আন্ডার এরেস্ট। তারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেলেন। এ সময় তিনজন গৃহকর্মী, একজন সহযোগী ও তাঁর একজন দেহরক্ষী সঙ্গে ছিল।


মন্তব্য