kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ক্যাবল অপারেটরের কর্মচারীকে গুলি

১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে গুলি করেন এএসআই শামীম

এস এম আজাদ   

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:৪৮



১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে গুলি করেন এএসআই শামীম

রাজধানীর বংশাল থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শামীম রেজা শুক্রবার সকালে তার থানা এলাকায়ই দায়িত্বরত ছিলেন। তাঁর বাসা খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়ার মেরাদিয়া এলাকায়।

পুরনো ঢাকার বংশাল, অর্থাৎ শামীম রেজার কর্মস্থল থেকে তাঁর বাসার দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী, কোনো পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালনের সময় সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে পারবেন না। এ ছাড়া দায়িত্ব পালন শেষে তাঁর অস্ত্রটি থানার মালখানায় রেখে যেতে হবে। অফিসাররা নিজের জিম্মায় অস্ত্র রাখতে পারবেন। তবে ওই অস্ত্রের ব্যবহারসহ সব বিষয়ে তিনি এককভাবে দায়বদ্ধ থাকবেন, যার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এসব বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা না করেই এ এস আই শামীম রেজা শুক্রবার দায়িত্ব পালনের সময় নিজ বাসায় যান। সেখানে ডিশের বকেয়া বিল চাওয়ায় ক্যাবল অপারেটর প্রতিষ্ঠানের কর্মীকে নিজের পিস্তল দিয়ে গুলি করেন। পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে শামীম রেজার অন্যায়ভাবে কর্মস্থল ত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এখন তাঁর বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারে বিষয়টির তদন্ত করছেন উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।  

এদিকে হত্যা চেষ্টা মামলায় গতকাল আদালতের নির্দেশে শামীমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে খিলগাঁও থানা পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগ ঘটনার তদন্ত তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে শামীম দাবি করছেন, আল-আমিনের সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় গুলি বের হয়ে গেছে। তবে আল-আমিন ও তাঁর স্বজনরা দাবি করছেন, বকেয়া বিল নিয়ে বাকবিতন্ডার এক পর্যায় এএসআই শামীম উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তখন তিনি আল-আমিনকে হত্যার উদ্দেশে গুলি করেন। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান ভুক্তভূগীরা। গুলিবিদ্ধ আল-আমিন এখন মেরাদিয়ায় তার বাসায় আছেন। স্বজনরা তাকে নিয়ে উত্কণ্ঠায় রয়েছেন।

ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মারুফ হোসেন সরদার কালের কণ্ঠকে জানান, ধর্তব্য অপরাাধের ঘটনায় মামলা এবং গ্রপ্তোর হওয়ার কারণে মামলার তদন্তই মূল বিষয়। তবে শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখতে তিন সদসস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে লালবাগ বিভাগ। ওই কমিটির প্রধান লালবাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মুরাদ আলী।

পুলিশের তদন্ত কমিটির সদস্য এবং বংশাল থানার ওসি নূরে আলম সিদ্দিক বলেন, শামীম রেজা ডিউিটির সময় এলাকা ছেড়ে গেছেন এবং গুলি করেছেন। এটা বড় অপরাধ, যা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে দ্রুত এ্যাকশান নেওয়া হয়েছে। অনেকেই অস্ত্র থানায় না রেখে সঙ্গে নিয়ে যান। তবে সেটার ব্যবহারের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। '

সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এএসআই শামীম রেজা পুলিশ প্রবিধান সম্পূর্ণরূপে অমান্য করেছেন। দায়িত্ব পালনকালে নিজ থানা এলাকার বাইরে কোনো কর্মকর্তা যেতে পারেন না। দায়িত্ব শেষে গেলেও জিডি করে উর্ধ্বতনদের জানিয়ে যেতে হয়। অস্ত্র নিয়ে নিজ থানা এলাকার বাইরে গেলেও অনুমতি লাগে। এছাড়া থানার মালখানায় অস্ত্র না রেখে নিজের কাছে রাখলে এর দায়-দায়িত্ব নিতে হবে সেই কর্মকর্তাকে।  

শামীম যা বলছেন : আমাদের আদালত প্রতিবেদক জানান, গতকাল হত্যাচেষ্টা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এ এস আই শামীম রেজাকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম প্রণব কুমার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

খিলগাঁও থানার ওসি কাজী মাইনুল ইসলাম বলেন, গতকালই শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। প্রাথমিক তদনে্ত শামীমের গুলিতেই আল-আমিন আহত হয়েছেন বলে প্রমাণ মিলেছে। এরপরও ব্যালাস্টিক পরীক্ষার জন্য অস্ত্র ও গুলি পাঠানো হয়েছে। এদিকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এএসআই শামীম রেজা দাবি করেন, আল-আমিন ও তার সহযোগীরাই তার ওপর চড়াও হয়েছিল। এসময় ধস্তাধসি্ততে তার অস্ত্র থেকে গুলি বের হয়ে যায়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বকেয়া ডিশ বিল নিয়ে বাকবিতন্ডা ছাড়া গুলির ঘটনার আর কোনো কারণ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।  

আতংকে আলআমিনের পরিবার : অন্যদিকে স্বজনরা জানান, গুলিবিদ্ধ আল-আমিনকে শুক্রবার রাতেই মেরাদিয়ার বাসায় নেওয়া হয়েছে। নন্দিপাড়ার দক্ষিণগাঁয়ের অংশের ৬ নম্বর রোডের বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন ঢাকা ইস্ট ক্যাবল ভিশনের কর্মচারী আল-আমিন। তাঁর গুলিবদ্ধি হওয়ার ঘটনায় ভয়ে আছে স্ত্রী আয়শা আক্তার বন্যা ও পাঁচ বছরের  মেয়ে আরমিন। আল আমিনের ভগ্নিপতি শহীদুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আল-আমিনের অবস্থা এখন একটু ভাল। তবে ভয়ের মধ্যে আছে সবাই। আইনের লোক হয়ে এএসআই শামীম যে কাজ করছে তাতে মনে হয়, তার খুটির জোর শক্ত। জানিনা পরে আবার কী করে! তবে আমরা তার কঠিন বিচার চাই। '

ইস্ট ক্যাবল ভিশনের আরেক কর্মচারী জাকির হোসেন বলেন, 'এ এস আই শামীম রেজা চার মাস ধরে ডিশ বিল পরিশোধ করেননি। টাকা চাইলে তিনি আমাদের ওপর রেগে গিয়ে লাইন কেটে দিতে বলেন। লাইন কেটে দিলে তার কাছে থাকা পিস্তল দিয়ে আমাদের দিকে গুলি চালান। আমরা স্বাক্ষী আছি, আরো সাক্ষী আছে। '

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার খিলগাঁও নন্দীপাড়ার মেরাদিয়া ৫ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়িতে বকেয়া ডিশ বিল চাওয়ার কারণে ঢাকা ইস্ট ক্যাবল ভিশনের কর্মচারী আল আমিনকে (২৬) গুলি করেন বংশাল থানার এ এস আই শামীম রেজা। এ সময় আল-আমিনের পিঠে গুলি লাগে। বংশাল থানা পুলিশ শামীমকে আটক করে খিলগাঁও থানায় হস্তান্তর করে। তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা করেছেন গুলিবিদ্ধ আল-আমিন।  


মন্তব্য