৮ মার্চ ডেভিড লুসাক বলেছিলেন-332490 | জাতীয় | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


৮ মার্চ ডেভিড লুসাক বলেছিলেন পাকিস্তান ভেঙে যাচ্ছে

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৫ মার্চ, ২০১৬ ১৮:২০



৮ মার্চ ডেভিড লুসাক বলেছিলেন পাকিস্তান ভেঙে যাচ্ছে

দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান যে ভেঙে যাচ্ছে এবং সামরিক জান্তাদের হস্তক্ষেপের ফলে জিন্নাহর সৃষ্ট এই রাষ্ট্রটির মৃত্যু যে অনিবার্য তা একাত্তরের মার্চের প্রথম সপ্তাহেই ভবিষ্যদ্বাণী বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পরদিনই অর্থাৎ '৭১-এর ৮ মার্চ লন্ডনের 'ডেইলি টেলিগ্রাফ' পত্রিকায় প্রকাশিত 'পুরাতন পাকিস্তানের ইতি' শিরোনামে একটি রিপোর্টে তিনি এই মন্তব্যটি করেন।

ঢাকা থেকে পাঠানো এই রিপোর্টে তিনি বলেন, অসংখ্য মানুষের রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ইসলামিক ধ্যানধারণার ওপর ভিত্তি করে ভারত বিভাগ ও পাকিস্তানের সৃষ্টি এবং গত কয়েক দশকে অযোগ্য নেতৃত্ব ও ক্ষমতালোভী সামরিক জান্তাদের হস্তক্ষেপের ফলে জিন্নাহর সৃষ্ট রাষ্ট্রটির মৃত্যুবরণ অনিবার্য।

সংসদ অধিবেশন ডাকা না ডাকা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি লেখেন, গত দুই সপ্তাহে রাজনীতি যেভাবে ঘুরপাক খেয়ে অগ্রসর হচ্ছে তাতে সাময়িকভাবে এটাকে ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব হলেও ১২০ মিলিয়ন পাকিস্তানির বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের ৭০ মিলিয়ন শোষিত দীন-দরিদ্র বাঙালির ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকারাছন্ন।

রিপোর্টে আরো মন্তব্য করা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের স্বীকৃত জননেতা শেখ মুজিব কোনো রক্তপাত ব্যতীত বর্তমান রাজনৈতিক সমস্যা দূরীকরণে সচেষ্ট হলেও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মার্শাল ল কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট নাজেহাল হতে হয়। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম রাষ্ট্রের দুই নেতার মধ্যে যেকোনো সমঝোতাই হোক না কেন, দুটি দেশকে একটি দেশে পরিণত করার সম্ভবনা খুবই কম। পাকিস্তানের জন্য এটিই এখন নিরেট সত্য কথা।

সোহরাওয়াদী উদ্যানে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণের মাত্র একদিন পরই লুসাক লিখেন 'এখন এটা দুটি জাতির দেশ। দুটি জাতির আচার-আচরণ, খাদ্য ও ভাষা এক নয়। তাই ধর্মের বন্ধন দুটি জাতিকে একীভূত করে রাখতে পারেনি।'

রিপোর্টের শেষ অংশে ডেভিড লুসাক মন্তব্য করেন, কোন আধুনিক জাতি সামাজিক অর্থনৈতিক ও কৃষ্টিগত ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলে কোনও কর্মকাণ্ডই পরিপূর্ণভাবে কার্যকরী করা সহজ নয়। পাকিস্তানি নেতারা দেশে স্থায়ী ভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে কারণে দেশটিকে (পাকিস্তান) দুটি আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত করা ব্যতিত এ সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান দেখা যায়না। পাকিস্তানের তখনকার পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি লিখেন বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাতে মনে হয় নেতাদের পূর্বস্থানে ফিরে যাওয়ার সম্ভবনা ক্ষীণ।

পশ্চিম পাকিস্থান ১৯৪৭ সালের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে প্রকতৃপক্ষেই একটি কলোনি হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। বর্তমানে প্রথমবারের মত তারা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিজেদের অধিকার ফিরে পেয়েছে বলে লুসাক তার রিপোর্টে উল্লেখ করেন।

পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন পরিস্থিতির জন্য লুসাক ইয়াহিয়া খানকে দায়ি করে বলেন, জাতির এমন একটা সংকটময় মুহূর্তে ইয়াহিয়া খানের অসংযত কথাবার্তা পূবর্ পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করে তোলে। জাতীয় সংসদের ১ মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা রেডিওতে প্রচার হলে তা নিয়ে সবাই সন্দেহ প্রকাশ করে।

তৎকালিন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্সের কাছে কিসিঞ্জারের ঘনিষ্ট সহকারি জোসেফ সিসকোর পাঠানো একটি বার্তায়ও পাকিস্তানের অখন্ডতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছিল। বার্তাটির উপসংহারে স্পষ্ট করে লেখা ছিল, পাকিস্তানের উভয় অংশের অখন্ড থাকার সম্ভবনা প্রায় শূন্য। দুয়ের মধ্যে রিকনসিলিয়েশনের সুযোগ স্পষ্টতই মুছে গেছে। বিশিষ্ট সাংবাদিক মিজানুর রহমান খানের একটি লেখা থেকে জানা গেছে, একাত্তরের ২ মার্চ সিসকো রজার্স এর কাছে এই বার্তাটি পাঠান।

এবারের বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক কবি আবুল মোমেন ডেভিড লুসাকের এই রিপোর্ট প্রসঙ্গে জানান, এটা ঠিক একাত্তরের প্রথম দিক থেকে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হতে থাকে। বিশেষ করে ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদের অধিবেশন বন্ধ করে দেয়ার পর সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে উঠে। এমতাবস্থায় ৭ মার্চের জনসভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর বাঙ্গালির গন্তব্য স্পষ্ট হয়ে যায়।

আবুল মোমেন বলেন, সেই সময়ের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে অনেকেই প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। সাংবাদিক ডেভিড লুসাকের মন্তব্য পরবর্তী সময়ে সত্য প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, লুসাক অভিজ্ঞ সাংবাদিক ছিলেন। তার পরিস্থিতি অনুধাবন করার ক্ষমতা ভাল ছিল।

শুধু লুকাস নয়, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে ও পরে অনেক বিদেশি সাংবাদিক বাংলাদেশ থেকে এ ধরনের রিপোর্ট করেছিলেন উল্লেখ করে আবুল মোমেন বলেন, এসব রিপোর্টে বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের মুক্তযুদ্ধের যৌক্তিকতা যেমন জোরালো হয়েছে তেমনি আন্দোলনরত বাঙালিরাও উদ্দীপ্ত হয়েছে।

মন্তব্য