kalerkantho


নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও বাংলাদেশ

সাদিয়া বিনতে শাহজাহান    

৮ মার্চ, ২০১৯ ১১:৩২



নারী শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও বাংলাদেশ

প্রতীকী ছবি

ছমিরন খাতুনের বয়স ৩৭। তিন বছর ধরে চট্টগ্রামের সিইপিজেডের একটি গার্মেন্টে বোতাম সেলাই এর সেক্টরে কাজ করেন। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা, কখনো কখনো রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয় তাকে। হিসেব করলে দেখা যায়, দিনে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করেন তিনি। বিশ্রাম তো নেই, সব সপ্তাহে ছুটিও পান না। ছুটি নিলে মজুরি কাটা হয়। ছমিরনের মজুরি পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে কম। অথচ ছমিরন পুরুষ শ্রমিকদের চেয়ে কাজ কম করেন না। 

ছমিরনের মতো অনেক নারী শ্রমিকের একই অবস্থা। শুধু গার্মেন্টশিল্পেই না, অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও এমন হচ্ছে। তারা শ্রমের ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না। ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমজীবী মানুষ তাদের অধিকার আদায়ে জন্য একজোট হয়ে লড়েছিল। অথচ, সময়টি দীর্ঘ হলেও আজ পর্যন্ত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও কল্যাণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বড় বড় ও প্রতিষ্ঠিত কিছু কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করলেও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মালিক বা শ্রমিক, কেউই তাদের দায়-দায়িত্ব ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারী শ্রমিকদের অবদান অতি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের নারীরা এখন- সব জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ চোখে পড়ে। মোট কথা, সমগ্র অর্থনীতিতে নারীর অবদান দৃশ্যমান। অথচ, প্রায় অনেক কর্মক্ষেত্রে নারী এখনও অনিরাপদ। পুরুষ সহকর্মী ও কর্মক্ষেত্রের মালিকপক্ষ হতে প্রায় নারী শ্রমিকদের যে যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়, সে কথা আজ কে না জানে?

নারীদের শ্রমের বিনিময়ে কিছুটা পাওনা আদায় হলেও শ্রমিক হিসেবে পুরুষের সমান বা আন্তর্জাতিক মানের কোনো কাঠামোতেই তাদের গণনা করা হয় না। অথচ নারীরা আদ্যোপান্ত শ্রমজীবী, তা সেটা বাড়ির ভেতরে এবং বাইরে। নারী জন্মের পর থেকেই তার জীবনের অংশ হিসেবে তাকে বাধ্যতামূলক গৃহস্থালির কাজ শিখে রাখতে হয়। না হলে তার শ্বশুরবাড়ি ঠাঁই হবে না। কারণ চাকরি বাইরে হোক আর না হোক, শ্বশুরবাড়িই তার আসল কর্মস্থল যেখানে তার চাকরিটা একদম পুরোপুরি জন্মগতভাবে স্থায়ী। তাই নারীরা কখনোই বেকার নয়। এ বিষয়টা যদিও অনেক নারীরাই অনুধাবন করার ক্ষমতা রাখে না। তাইতো আমাদের গৃহিণী মা-বোনেরা বলেন, আমিতো কিছু করি না, কেবল সংসার সামলাই। বিষয়টা তারা এমনভাবে বলে যেন সংসারে শ্রম দেওয়া এটা কোনো কাজের মধ্যে পড়ে না। 

তবুও নারী শ্রমিকদের যখন পথে-ঘাটে লাঞ্ছিত, অবহেলিত ও ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত হতে দেখি তখন তাদের এই মৌলিক বিষয়গুলো আপনাআপনি সামনে চলে আসে। অথচ নারীদের প্রতি সহমর্মিতার মনোভাব কি আমাদের আদৌ জন্মেছে? শ্রমিকের প্রধান হাতিয়ার তার শরীর। এখানে মাথার চেয়েও হাত পা ঠিক থাকা অধিক জরুরি।  প্রতিটি শ্রমিকই যেন একেকটা জীবন্ত মেশিন। এ প্রসঙ্গে বলা যায় নারীর শরীর বিশ্ব অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রজননক্ষমতার জন্যে। অন্যদিকে নারী শ্রমিকদের প্রজননসেবা দেওয়ার নাম করে নারী শ্রমিকদের প্রজননক্ষমতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপের উদ্যোগ নিচ্ছে বিজিএমইএ। বিজিএমইএর এই চুক্তির আওতায় পোশাকশিল্পে কর্মরত এ নারী শ্রমিকদের উন্নত পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং সরাসরি পরিবার পরিকল্পনা উপকরণাদিকে সহজলভ্য করা হবে। এ সেবা চুক্তির সুফল কি নারী শ্রমিক পাবে নাকি সন্তান জন্মদান থেকে বিরত রেখে মালিকপক্ষকে শ্রমের যোগান দিয়ে লাভবান করা হচ্ছে। এ নারীদের নিজের ইচ্ছায় পদ্ধতি গ্রহণ আদৌ সম্ভব হবে কিনা সেটা কেবল প্রশ্নই রয়ে যায় কারণ চুক্তি হচ্ছে বিজিএমইএ তথা মালিকপক্ষ গোষ্ঠীর সাথে, কোনো শ্রমিক সংগঠনের সাথে নয়। এ থেকেই বোঝা যায় নারী শ্রমিক শুধু শ্রম বিক্রি করছে না, তারা শরীরের নিয়ন্ত্রণও হারাচ্ছে।

দেশের নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রকৃত নিরাপত্তার জন্য তাদের কাজের পরিবেশ থেকে শুরু করে মজুরি- সব ক্ষেত্রে নারী কর্মীর অধিকার ও কল্যাণে সুনজর প্রয়োজন। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, শ্রমিকের অধিকার ও কল্যাণ বা সেবা কম পেয়ে থাকে। অথচ নারী শ্রমিকরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারী ও শিশু শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শ্রমিক কলকারখানায়, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মে নিয়োজিত থাকলে প্রচলিত বিধিমোতাবেক সুযোগ-সুবিধা ও কাজের পারিশ্রমিক পায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে একজন নারী শ্রমিকের বেলায় প্রচলিত বিধি-বিধান মানা হয় না। ফলে কর্মপরিবেশ থেকে শুরু করে মজুরি প্রদানসহ সব ক্ষেত্রেই নারী শ্রমিকরা এক ধরনের বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকে। এ বিষয়ে রাষ্ট্র, সমাজ ও সমাজের মানুষের আরো তৎপর ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

প্রতিবছর ১ মে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে শ্রমিকদের দিবস। ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে মহান মে দিবস পালন করা হয়। এদিন সরকার সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করলেও শুধু এই এক দিন শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণের কথা ভাবলে চলবে না। বাকি দিনগুলোতেও এসব শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের কষ্টের কথা ভাবতে হবে। দিবসটি পালন সত্ত্বেও সত্যিকার অর্থে এখনো অনেক শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত। বিশ্বের অনেক দেশে এমনকি আমাদের দেশেও গৃহকর্মের কাজকে তেমন অর্থে কোনো পেশাভিত্তিক কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। কম-বেশি প্রতিটি বাড়িতে বা বাসায় গৃহকর্মী রয়েছে। তাদের কর্মঘণ্টা নির্ধারিত নয়। গৃহকর্মীদের বিশ্রামের সময় বা সপ্তাহে কোনো দিন ছুটি ভোগ করবে, সে বিষয়ে আমরা ভাবি না। তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হলে এসব বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।

দেশের পোশাকশিল্পে কর্মরত ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিকের অধিকাংশই নারী। এই বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে তাদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তা শ্রম আইনে যুক্ত করা প্রয়োজন। নারী শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার আলোকে কাজ করার সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে এবং প্রতিটি নারীর জন্য সুস্থ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে।

(ফ্রান্সপ্রবাসী লেখিকা ও সমাজকর্মী)



মন্তব্য