kalerkantho


পাকিস্তানি সেনাদের সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত রাখা হতো

মনিরুজ্জামান, নরসিংদী    

১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৬:০৭



পাকিস্তানি সেনাদের সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত রাখা হতো

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জিনারদীর যুদ্ধ ছিল নরসিংদীতে সংঘটিত শেষ যুদ্ধ। ২১ জন পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সেদিন শত্রুমুক্ত হয়েছিল নরসিংদী। ১২ ডিসেম্বরের সেই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন নৌ সৈনিক সিরাজ উদ্দিন (নেভাল সিরাজ)। ওই সময় সিরাজ উদ্দিনের পাশে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী সাব ইউনিট বা থানা কমান্ডার মুহাম্মদ ইমাম উদ্দিন। যুদ্ধ শেষে সিরাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে নরসিংদীতে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে পাঁচদোনা এলাকায় বিজয় মিছিল বের করা হয়েছিল। 

১৯৭১ সালে নরসিংদীতে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা আর পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণ নিয়ে গত শনিবার দুপুরে কথা হয় মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ ইমাম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর নরসিংদী সদর ব্যতীত জেলার সব এলাকা সম্পূর্ণভাবে মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনী নরসিংদী শহরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। প্রথম থেকেই নরসিংদীর মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা এত ব্যাপক ছিল যে একটু সময়ের জন্যও পাকিস্তানি সৈন্যদের বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হতো না। সারাক্ষণ তাদের ব্যতিব্যস্ত রাখা হতো। যেদিন কিছুই করা সম্ভব হতো না, সেদিনও অন্তত তাদের বাংকারে কাউকে না কাউকে পাঠানো হতো গুলি ছুড়ে আসার জন্য। এর ফলে পাকিস্তানি সেনারা দিশাহারা হয়ে দিন-রাত গুলি ছুড়তে থাকত।’

ইমাম উদ্দিন বলেন, ‘এমনিভাবে সাফল্য-ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে চলে আসে ১১ ডিসেম্বর। সেদিন শিবপুরের মজনু মৃধার নেতৃত্বে নরসিংদী শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি উড়িয়ে দেওয়া হয়। এরই মধ্যে আমাদের কাছে খবর আসে-আখাউড়া ও ভৈরবের যুদ্ধ শেষ করে ভারতের মিত্রবাহিনীর সদস্যরা সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। এতে আমাদের মনোবল অনেক বেড়ে যায়। তার পরের দিন অর্থাৎ ১২ ডিসেম্বর সকালে সংঘটিত হয় নরসিংদীর শেষ যুদ্ধ।’

মুক্তিযোদ্ধা ইমাম উদ্দিন বলেন, ‘‘ওই দিন সকাল ৯টার দিকে আমরা ভাটপাড়া এলাকায় অবস্থান করছিলাম। তখনই আকস্মিকভাবে খবর আসে, পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাঁচদোনা থেকে বহ্মপুত্র নদের পাড় ধরে জিনারদী রেলস্টেশনের দিকে এগোচ্ছে। তখন আমরা দৌড়ে গিয়ে জিনারদী পাটুয়া এলাকায় পজিশন নিই। যত দূর মনে পড়ে তখন সকাল পৌনে ১০টা। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ১০টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর ২১ জনের একটি দল পাটুয়া এলাকার মোল্লা বাড়ির পাশে বাঁশবাগানের কাছে আসে। সিরাজ ভাই নির্দেশ দেন ‘ফায়ার’। আমরা গুলি চালাতে থাকি। গুলির আওয়াজ পেয়ে পাকিস্তানি সেনারাও পজিশন নিয়ে নেয়। ঘণ্টাব্যাপী এই যুদ্ধে তাদের দুজন গুলিবিদ্ধ হয়। ওই সময় তাদের মাঝখান থেকে ৮-১০ জন দাঁড়িয়ে যায় আত্মসমর্পণ করতে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একে একে সবাই আত্মসমর্পণ করে ফেলে। পরে আমাদের কয়েকজন দৌড়ে গিয়ে প্রথমেই তাদের অস্ত্রগুলো নিয়ে নেয়। তারপর কমান্ডার সিরাজ ভাইয়ের নির্দেশে রশি এনে পাকিস্তানি সেনাদের পেছন দিক থেকে হাত বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় নেহাব গ্রামে। যাওয়ার পথে মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয়। তখন পাকিস্তানি সেনাদেরও বাধ্য করা হয় ‘জয় বাংলা’ বলতে। প্রথমে বলতে না চাইলেও হাতিয়ারের বাঁট দিয়ে যখন মারা হলো তখন ভাঙা কণ্ঠে বলল, ‘জে বাংগা’।”

ইমাম উদ্দিন বলেন, ‘ওই দিন সিরাজ উদ্দিনের নেতৃত্বে আমি, আবদুল হাকীম নরসিংদীতে সর্বপ্রথম বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে পাঁচদোনা এলাকায় বিজয় মিছিল বের করি। ওই মিছিলের খবর পেয়ে শেখেরচর মাধবদী এলাকায় মনির, মান্নান, মোতালিব পাঠানের নেতৃত্বে বিজয় মিছিল বের করা হয়। ওই দিন বিকেলে ৪নং গার্ড রেজিমেন্ট ও মিত্রবাহিনীর ৩১১ মাউন্টেন ব্রিগেড নরসিংদীর চরাঞ্চলে পৌঁছে। ১৩ ডিসেম্বর তারা ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। আর আমরা ওই ২১ জন পাকিস্তানি সেনার মধ্যে আহত দুজনকে মেরে ফেলি। আর বাকিদের ২০ ডিসেম্বর নেহাব গ্রামের স্কুল মাঠে জনগণের সামনে এক অনুষ্ঠানে হাজির করি। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে ১৯ জানুয়ারি মেজর হায়দারের মাধ্যমে ঢাকার রমনা থানায় হস্তান্তর করি।’



মন্তব্য