kalerkantho


লোকচক্ষুর অন্তরালের ‘জিডি’গুলো...

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২০:০৬



লোকচক্ষুর অন্তরালের ‘জিডি’গুলো...

এটা মোটামুটি সকলেই জানেন যে বিভিন্ন থানাগুলোতে জিডি ও মামলা করা হয়, কিন্তু এর বাইরে একটি বিশাল অংশ রয়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। সেটি হচ্ছে ব্যক্তিগত অভিযোগ, যেটিকে আমরা প্রাইভেট পিটিশনও বলে থাকি। এই ব্যক্তিগত অভিযোগ যেহেতু জিডি অথবা মামলা আকারে আসে না, তাই এটির আইনগত ভিত্তি খুব জোরালো নয়! যদিও পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার উপর ভিত্তি করে এই ব্যক্তিগত অভিযোগ কখনো কখনো জিডি অথবা মামলায় রুপান্তরিত হতেও পারে।

কথা হলো জিডি, থানার মামলা ও কোর্টে মামলা করার সুযোগ থাকার পরও মানুষ কেন এই ব্যক্তিগত অভিযোগের সাহায্য নেয়? আর এই ব্যক্তিগত অভিযোগের বিষয়গুলোই বা কী থাকে?

আশ্চর্য হলেও সত্যি বেশিরভাগ বিষয় থাকে জমিজমা সংক্রান্ত, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত, পারিবারিক বিষয় সংক্রান্ত, প্রতারণা সম্পর্কিত আর কী নয়! মোট কথা সকল ধরণের সমস্যাই জায়গা করে নেয় এই ব্যক্তিগত অভিযোগের তালিকায়। অথচ এই প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য আদালতের দ্বার সবসময় উন্মোচিত, তা সত্ত্বেও বিজ্ঞ আদালতে না যেয়ে অনেক ভুক্তভোগী নানা কারণেই পুলিশের দ্বারস্থ হন!

এখন ব্যক্তিগত অভিযোগ নিয়ে খুব দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া একটু জটিলই বটে, তবুও অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক পুলিশিংয়ের অংশ হিসেবে এ বিষয়গুলো নিয়েও পুলিশকে সময় দিতে হয়। আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষ যদি হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক জায়গা থেকে সরে এসে সৌহার্দ্যপূর্ণ সমঝোতায় আসতে পারে, সেটি সমাজের জন্য যেমন ভাল তেমনি পেশাগত জায়গা থেকে পুলিশের জন্যও স্বস্তির!

জায়গা সম্পত্তির বিষয়ে বিভিন্ন চ্যানেল হয়ে ডিসি/এসপি অফিস, সার্কেল এএসপি/জোনাল এসি অফিস এমনকি থানায়ও বহু ব্যক্তিগত অভিযোগ এসে জমা হয়। অন্যান্য ব্যক্তিগত বিষয়ের চেয়ে এই সম্পর্কিত বিষয় একটু জটিল। কারণ যিনি সত্যিকারের ভুক্তভোগী তিনি চান সমাধান, আর প্রতিপক্ষ চায় ঝুলিয়ে রাখতে! এরকম দুই মেরুতে অবস্থানকারী দুটি পক্ষকে একটি স্বস্তির জায়গাতে এনে দাঁড় করানো প্রকৃত অর্থেই জটিল। তারা প্রায়শঃই মারামারি, হানাহানিতে জড়িয়ে পড়েন তাই প্রো অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের জায়গা থেকে আমাদের চেষ্টা থাকে একটা সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। ভুক্তভোগী চায় সমাধান হয়ে যাক, আর প্রতিপক্ষ চায় বিজ্ঞ আদালতে যেয়ে এর নিষ্পত্তি হোক। নিয়মভঙ্গকারী প্রতিপক্ষ এক্ষেত্রে খুব আইন মেনে চলতে চান। আর যেহেতু দেওয়ানী আদালতের বিষয়ে প্রমাণের দায় ভুক্তভোগীর আর পুলিশের করণীয়ও সেই অর্থে নেই; এই সুযোগটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে চান অসৎ উদ্দেশ্য পোষণ করা ব্যক্তি। মারামারি, হানাহানি নিরসনে যখন দুই পক্ষকে নিয়ে সামাজিকভাবে বসা হয় তখন আশ্চর্যজনকভাবে ভুক্তভোগী অল্প সময়ে সমাধান চেয়ে বসেন, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ চতুর হলে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন তারা এভাবে সমাধান চান না! তারপরও এরকম অনেক হানাহানি ও রক্তক্ষয়ী অবস্থা থেকে বের হয়ে হাজারেরও বেশি বিষয় সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছে শুধুমাত্র পুলিশের একটু এফোর্টের জন্য। দুই যুগ ধরে সমাধান না হওয়া বিষয়ও সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছে এরকম নজিরও রয়েছে। মাসে একেকজন ওসি, এএসপি, অ্যাডিশনাল এসপি, এসপি এরকম ব্যক্তিগত অভিযোগ দেখেন কম করে হলেও ৪০-৫০টি!

যে ঝামেলাটি হতে পারতো, যে হানাহানি হওয়ার আগেই রুখে দেয়া হলো, যে সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষিত হলো তা নিয়ে কারো কোনো কথা নেই। অনেক সময় একটি ধন্যবাদ প্রাপ্তিও বাড়াবাড়ি হয়ে যায়! বলি কি, পান থেকে চুন খসলেই এত গালাগাল আসে, কখনো তো দেখলাম না বছরের পর বছর ঝুলে থাকা সমস্যা সমাধানের পর একটি শুষ্ক ধন্যবাদ দিতে! হ্যাঁ, ব্যতিক্রম আছে অবশ্যই যেমনটি অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বলি ব্যতিক্রম উদাহরণ হতে পারে না!

আপনার পারিবারিক সমস্যা নিয়ে পারিবারিক আদালতে যাওয়ার কথা, আপনি চাচ্ছেন না যেতে কারণ কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করা আপনার পছন্দ নয়। এক কথায় শেষ করে দেয়া যায় আপনি 'পারিবারিক আদালতে যান'! নাহ তা আসলে করা হয় না, মনে হয় একটিবার দেখা যাক না কি হয়? অনেকের পারিবারিক সমস্যার সহস্র সমাধান নীরবে নিভৃতে হয়ে যাচ্ছে। কেউ খোঁজটুকুও রাখে না। সে কথা বলা হয়েও উঠে না। সেবাদাতার নিজেদের ব্র্যান্ডিং করার সময় থাকে না আর সেবাগ্রহীতার সে কথা বলার সময়টুকু থাকে না, কখনো থাকে না ইচ্ছাটুকুও!

সুখ শুধু এতটুকুই যে অনেকের সংসার ভাঙনের দ্বারপ্রান্ত থেকে টিকে গেছে! ঠিক একইভাবে প্রতারণা ও অন্যান্য বিষয়াদি সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় না হলে সুযোগ থাকলে মামলা গ্রহণ করা হয়।

আমাদের সমস্যা একটাই আমরা উপরিভাগ নিয়ে কথা বলতে ভালবাসি, অভ্যন্তরে ঢুকবার সময় কোথায়? নিজেদের নিয়ে আত্মসমালোচনা সে তো অভিধানে খুঁজে না পাওয়া এক অধ্যায় আমাদের কাছে।

প্রাইভেট পিটিশন তথা ব্যক্তিগত অভিযোগের বিষয়ে কত কাজ নীরবে নিভৃতে হয়ে যায়, কত দ্বন্দ্ব -সংঘাতের অবসান ঘটে যায় নিমিষেই, তার খোঁজটুকু কেউ রাখেন কি? না বলা সেই কথা প্রতিনিয়ত অব্যক্তই থেকে যায়...।

লেখক: সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (ডেমরা জোন)

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)



মন্তব্য