kalerkantho


সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

শাহেদা ফেরদৌসী মুন্নী   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০১:০৮



সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা

শাহেদা ফেরদৌসী মুন্নী

পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে যুগ যুগ ধরে নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং নির্যাতন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। জাতিসংঘ নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বিলোপ করার জন্য নারী এবং পুরুষের বিভেদ রদ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তবে বৈষম্য বিরুদ্ধে লড়াই এবং সিডও বাস্তবায়নে জাতিসংঘের পাশাপাশি রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকদেরও সমান দায়িত্ব আছে। প্রতিটি ব্যক্তি, সমাজ এবং সর্বোপরি পুরো রাষ্ট্রের সচেতন হওয়া দরকার। আমাদের সমাজে প্রচলিত নারীর প্রতি নেতিবাচক ধ্যানধারণা, মনোভাব এবং আচার-আচরণ বদলাতে হবে। এবং এটি প্রথমে শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাই নারীদের বাদ দিয়ে কোনো টেকসই উন্নয়নই সম্ভব নয়। তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাদের স্বার্থেই।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের ‘নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ' বা 'সিডও' সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ, যে সনদটি নারীর অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক দলিল হিসেবে পরিচিত। সিডও সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে, স্বাক্ষরকারী সদস্য দেশগুলিকে প্রতি চার বছর পর পর সিডও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে জাতিসংঘের সিডও কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় সিডও কমিটি গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের ৬৫তম সিডও অধিবেশনে বাংলাদেশের ৮ম বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে। দেশের ৫৬টি মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় প্ল্যাটফরম সিটিজেনস্ ইনিশিয়েটিভস্ অন সিডও, বাংলাদেশ (সিআইসি-বিডি) বাংলাদেশে সিডও সনদ পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। ৬৫তম সিডও অধিবেশনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে সিআইসি-বিডি অংশগ্রহণ করে এবং ছায়া প্রতিবেদন পেশ করে। অধিবেশন শেষে সিডও কমিটি প্রদত্ত সমাপনী অভিমতের সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষ পরবর্তী ৪ বছরে যে সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সে বিষয়ে আগামী ২০২০ সালে ৯ম জাতীয় প্রতিবেদন জমা দেবে। 

তবে এর মধ্যেই ২০১৮ সালে সমাপনী অভিমতের নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে মধ্যবর্তী একটি লিখিত প্রতিবেদন প্রদান করার জন্যও কমিটি বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করেছে। সিডও কমিটি সরকারকে সুর্নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন, বৈষম্য বিরোধি আইন প্রণয়ন, নারীর উন্নয়নে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা, জনবল, কারিগরি ও আর্থিক সম্পদ নিশ্চিত করা এবং বৈবাহিক ধর্ষণসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন প্রণয়নের জন্য তাগিদ দিয়েছে এবং ২০১৮ সালে এই বিষয়ে অগ্রগতিসমূহ নিয়ে প্রতিবেদন পেশ করতে হবে। এখন সরকারের দায়িত্ব হলো পরবর্তী চার বছরে এই সমাপনী অভিমত তথা সিডও সনদ বাস্তবায়নে যথাসম্ভব উদ্যোগ নেয়া। পাশাপাশি নাগরিক সমাজের কাজ হলো সমাপনী অভিমত বাস্তবায়নে সরকারের সহায়ক ভূমিকা পালন করা এবং এটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা। 

বাংলাদেশ সরকার কয়েকটি ধারায় আপত্তি বা সংরক্ষণসহ ১৯৮৪ সালে সিডও সনদ স্বাক্ষর করেছে এবং এটি বাস্তবায়নে বার বার তাদের অঙ্গীকার পুর্নব্যক্ত করেছে। অথচ যথাযথ প্রচার-প্রচারণা এবং তথ্যের অভাবে এখনো দেশের অনেক সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি ও সংগঠন যাদের সিডও বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা, তাদের অনেকেই সিডও সম্পর্কে কিছু জানেই না। ঢাকায় এ নিয়ে কিছু আলোচনা বা কর্মসূচি পালিত হলেও তৃণমূলে এ সংক্রান্ত সচেতনতা ও উদ্যোগ কম। এ কারণে তৃণমূলে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সিডও বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি জোরালো দাবি উত্থাপিত হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে, সিডও সনদ ও জাতিসংঘের সমাপনী অভিমত সম্পর্কে জানা এবং এগুলি বাস্তবায়নে বিভিন্ন অংশীভাগীদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। এজন্য সিআইসি-বিডি প্ল্যাটফরম তৃণমূলে সচেতনতা সৃষ্টি এবং নাগরিক সমাজের কণ্ঠগুলোকে একত্রিত করার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও দৃশ্যমান কাজ করছে যাতে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নে তাদের পূর্বের অঙ্গীকার রক্ষা করার স্পৃহা এবং পরিবেশ তৈরি হয়। সেইসঙ্গে সিডও সমাপনী অভিমত বাস্তবায়নে করণীয় সম্পর্কে তৃণমূলের পরামর্শ ও মতামত তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়।

নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আমাদের দাবি হচ্ছে অবিলম্বে সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করতে হবে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। সংরক্ষিত দুটি ধারা হচ্ছে সিডও সনদের প্রাণ এবং দেশে নারী-পুরুষ বৈষম্যের মূল উৎপাটন করে নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠায় সিডও পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। নারীর প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের সংগ্রাম পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। নারীর প্রতি সংবেদনশীল মানসিকতা পোষণ করতে হবে। নারীর অধিকার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সকলকে সজাগ করে তুলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সম্মিলিত প্রয়াস চালাতে হবে। বাংলাদেশ এখনও সিডওর মৌলিক জায়গাগুলোতে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু একদিন নিশ্চয়ই কাঙিক্ষত সাফল্য অর্জিত হবে। সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সরকার ও বেসরকারি সংগঠন এবং জনমানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এগিয়ে যেতে হবে। দেশের প্রতিটি নাগরিকেরই ব্যক্তিগত এবং সাংগঠনিকভাবে স্ব স্ব অবস্থান থেকে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সেভাবে কাজ করলে একদিন মানবিক মূল্যবোধ এবং সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবেই । 

লেখক : শাহেদা ফেরদৌসী মুন্নী, সমন্বয়ক, স্টেপস্ টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট (সিটিজেনস্ ইনিশিয়েটিভস্ অন সিডও, বাংলাদেশ (সিআইসি-বিডি)-এর পক্ষে)

(নাগরিক মন্তব্য বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নন।)



মন্তব্য