kalerkantho


কী আশ্চর্য! রকেট কাঁদছে না, বাঁচাও বলে চিৎকার করছে না!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২৬ আগস্ট, ২০১৮ ২০:৩৬



কী আশ্চর্য! রকেট কাঁদছে না, বাঁচাও বলে চিৎকার করছে না!

পত্রিকায় প্রকাশিত সেদিনের ঘটনার ছবি

সব কিছু শান্ত হয়ে যায়। এর আগ মুহুর্ত পর্যন্ত সবই ইতিহাস। কে কোথায় হারিয়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই। সম্পর্ক নামের শব্দটির সাথে শ্যাওলার যথেষ্ট মিল আছে।

আন্দোলনও শেষ হয়। যে যার ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু কেউ কেউ ঘোর থেকে মুক্তি পায় না! যেমন পায়নি আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, বড় ভাই, ব্যাচমেটটা। তছনছ হয়ে গেছে, শুধু সে নিজে তো নয়, তার পরিবারও!

১৪ বছর আগে। মাত্রই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। কী সৌভাগ্য, সহপাঠী হিসেবে পেয়েছি যৌবন, শৈশবের কাছের বন্ধুকেও। কত স্বপ্ন, রোমাঞ্চ! কিন্তু সেদিন ৩ মার্চ, এলোমেলো হয়ে গেল সব। ক্যাম্পাস সেদিন উত্তাল। গেল সপ্তাহ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪, প্রিয় শিক্ষক হুমায়ূন আজাদ স্যারের ওপর হামলা হয়। এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত হই। বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদস্বরুপ প্রতিদিনই আন্দোলন চলছিল ক্যাম্পাসে। কিন্তু সেদিন ৩ মার্চ আন্দোলন একেবারে তুঙ্গে।

উন্মত্ত পশুর মতো আক্রমণ হলো বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর। আমার বন্ধু রকেটকে ঘিরে ধরল দশ-বারো জন পুলিশ। হাতের মোটা লাঠি দিয়ে পেটাতে লাগল অমানুষের মতো। সমানে চলল বুটের লাথি। সাথে মানুষসদৃশ্য পশুরীপি কতিপয় ছাত্র লাঠি, বাঁশ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে রকেটের ওপর।

রকেটের গাল বেয়ে রক্ত নামছে। দরদর করে। কান বেয়ে নামছে রক্ত। কী আশ্চর্য, রকেট কাঁদছে না!! বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে না। শুধু অবাক শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে। যেন ভাবছে! কেন মারছে আমাকে? আমি তো কেবল স্লোগানে কণ্ঠ মিলিয়েছিলাম। বলেছিলাম, বিচার চাই, বিচার চাই!! আর কিছু তো করিনি। বিচার চাওয়া কি অপরাধ?

আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাবান, সৃষ্টিশীল ছিল রকেট। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়েছিল। এসএসসিতে একটুর জন্য স্ট্যান্ড করেনি। এইচএসসিতেও দুর্দান্ত রেজাল্ট। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

খুব ভালো লিখত। অসাধারণ মঞ্চ নাটক করত। জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক পেয়েছিল উপস্থিত বক্তৃতা ও সাধারণ জ্ঞানে। বিতর্কে ছিল চ্যাম্পিয়ন।

নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সব আশা, সব স্বপ্ন তাকে ঘিরে। তার বাবা, আমাকেও যিনি রকেটের চেয়ে কম স্নেহ কোনোদিন করেননি; পৌর বাজারে সামান্য একটা সাইকেল গ্যারেজ চালাতেন। ছাত্রাবস্থায় রকেট এমন অনেক কিছু জানত, পড়ত; যা আমরা পড়িনি, জানিনি। তবে আমরা জানতাম, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে রকেট সবচেয়ে ভালো জায়গায় যাবে। সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে।

এর কিছুই হয়নি। রকেট আর ঢাকাতেই থাকলো না। চলে গেল রংপুরে! আমরা বন্ধুরা শত চেষ্টাতেও ঢাকায় ফেরাতে পারলাম না তাকে। এক তরফাভাবে ওকেই দোষ দিলাম। কেন ঠিকমতো ক্লাস করে না, পরীক্ষা দেয় না? কেন থাকে না ঢাকায়? বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পা দেয় না। কেন পড়ে থাকে রংপুরে!

অনেক বছর পেরিয়ে এসে বুঝেছি, মাত্রই পরিবার ছেড়ে ঢাকায় আসা, গায়ে কৈশোরের গন্ধ মেখে থাকা সদ্য তরুণকে বেদম মার মেরে পুলিশ নামের দানবের দল তার স্বপ্নময় মনোজগৎ চুরমার করে ফেলেছিল। রকেটের শরীরের ক্ষত শুকিয়েছে, মনের ক্ষত আজও শুকায়নি। শুকাবে না হয়তো কোনো দিনই।

সেদিন থেকে নিজেকেই অপরাধী লাগে। একই আন্দোলনে আমিও তো ছিলাম। স্লোগান দিয়েছি পাশাপাশি। আমার বড় ভাই, বন্ধু রকেট, দুজনের শার্ট আর স্বপ্ন বহুবার অদলবদল করা দুটি অভিন্ন সত্ত্বার আমরা দুই মানুষ, কী করে দুই রকমের জীবনযাপন করছি! আলোর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মহাকাশ ফুঁড়ে ছুটে চলার কথা ছিল তার। আজ রকেট অচেনা আঁধারে।

অথচ বাংলাদেশের এ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় লেখক হতে পারত। কিংবা নাট্যকার। আরও অনেক কিছু, অন্য কিছু। অপরাধী লাগে, রকেটের পাশে আরও বেশি করে না দাঁড়িয়ে, আমরা তাকে পরিহাস করেছি। ওর ভেতরটা বুঝতে চাইনি কেউ-ই। অথচ এই জীবন রকেটের প্রাপ্য ছিল না।

রকেটের বাবা মারা গেলেন এই সেদিন। আমি জানতাম, বড় ছেলেকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল তার! কী এক হাহাকার নিয়ে মারা গেলেন ঠিক রকেটের মতো দেখতে ছোটখাটো মানুষটা! ছেলেটা কতো কিছু হতে পারত...এই দীর্ঘশ্বাস হয়তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সঙ্গে ছিল তার।

রকেট, বন্ধু আমার, আমাদের কখনো ক্ষমা করিস না। আমরা তোর যোগ্য না।

এইচএম বাবুর ফেসবুক থেকে... 

(এই বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)



মন্তব্য