kalerkantho


আমার স্মৃতিতে দুঃসহ ২১ আগস্ট

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২১ আগস্ট, ২০১৮ ১৫:৩৫



আমার স্মৃতিতে দুঃসহ ২১ আগস্ট

এমনই কিছু ছবি বলে দেয় সেই দিনটির ভয়াবহতার কথা

তখন আমি স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিডিপিতে কাজ করি। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও আমার কর্মজীবনের প্রথম গুরু প্রয়াত বীর মুক্তযোদ্ধা আশরাফ-উল-আলম টুটু ভাইয়ের উৎসাহে কাজের পাশাপাশি লেখালেখিতে মনোনিবেশ করি। অফিসের বিভিন্ন গবেষণা প্রকাশনায় কন্ট্রিবিউট করতে থাকি, মাঝেমধ্যে স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায়ও উন্নয়ন ইস্যুতে কিছু প্রবন্ধ লেখা শুরু করি। ইতিমধ্যে, খুলনাঞ্চলকে অধিকাংশ মিডিয়া খুনের নগরী বা রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে আখ্যায়িত করে। যদিও খুলনাঞ্চল ছাপিয়ে রক্ত-নদীর ধারা বইতে শুরু করে সমগ্র বাংলাদেশে। পত্রিকার পাতা উল্টালেই লাশের মিছিলে চোখ আটকে যেত, এক অজানা সঙ্কটে প্রতিদিন সকালে অন্তর কেঁদে উঠতো। 

এরইমধ্যে দক্ষিণ বাংলার দিকপাল তথা খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদেরও সদস্য অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমামকে ২০০৩ সালের ২৫ আগস্ট খুলনা নগরীর শামসুর রহমান সড়কস্থ নিজ বাসভবন থেকে রিক্সায় করে আদালতে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীরা গুলি ও বোমা হামলা চালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। মুহূর্তের মধ্যে সারাদেশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মঞ্জুরুল ইমাম হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই  ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রথিতযশা সাংবাদিক মানিক সাহাকে খুলনা প্রেসক্লাবের মাত্র ৫০ গজ দূরে সন্ত্রাসীরা বোমা মেরে হত্যা করে।

এর কয়েক মাস পর ২০০৪ এর ৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত গাজীপুর-২ আসনের সাংসদ আহসানউল্লাহ মাস্টারকে নিজ এলাকা গাজীপুরের টঙ্গীর নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক জনসভায় সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। এহেন বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর উন্নয়ন ইস্যুতে আমার যৎসামান্য প্রবন্ধ লেখার গতি শ্লথ হয়ে আসে, সন্ত্রাসের আগ্রাসন তখন কলম কামড়ে ধরে।

পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে দিন দিন লেখার ধরনও বদলাতে থাকে। স্থানীয় পত্রিকা ছেড়ে কয়েকটি প্রবন্ধ স্থান করে নেয় তৎকালীন বহুল জনপ্রিয় ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য়। মাথার ওপরে ছাদের মতো থাকা শ্রদ্ধেয় ভাইজান (বর্তমান ডিআইজি হাবিবুর রহমান) তখন সরকারের রোশানলে পড়েছেন। তিনি প্রতিনিয়ত আমাকে লেখালেখিতে উৎসাহ যোগাতেন, এমনকি আমাকে ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বর বাড়ি সংলগ্ন বিচিত্রা অফিসে নিয়ে গিয়ে ভারপ্রাপ্তে সম্পাদক বেবী মওদুদ আপার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর আমি বিচিত্রায় নিয়মিত লেখা পাঠাতে শুরু করি। কিন্তু রক্তের দাগ শুকায় না। খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জন্মভূমি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক সাংবাদিক হুমায়ূন কবীর বালু ২০০৪ সালের ২৭ জুন নিজ পত্রিকা অফিস তথা বাসার সামনেই সন্ত্রাসীদের বোমার আঘাতে নিহত হন। 

এনজিওতে যুক্ত হবার সুবাদে প্রায়ই খুলনা-ঢাকা করতে হতো। এনজিও ব্যুরোর কাজের জন্য ২০০৪ সালের ১৮ আগস্ট রাতের গাড়িতে ঢাকা আসি। পরদিন ১৯ আগস্ট খুব ভোরে বাস থেকে নেমে এজিবি কলোনীতে আমার চাচার বাসায় যাই। নির্ধারিত কাজ শেষে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বিচিত্রা অফিসে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বেবী মওদুদ আপার সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করি ও রাতের গাড়িতে আবার খুলনা ফেরার বিষয়টি অবহিত করি। বলতে গেলে খুলনা ফেরার জন্য তাড়াও ছিল, কারণ ২১ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য সন্ত্রাস বিরোধী গণসমাবেশে কি কর্মসুচী আসে না আসে বা খুলনা যেতে ঝামেলা হয় কি না। বেবী আপা বললেন, 'তুমি শুধু পরিবেশ নিয়ে লিখছো কেন মাহবুব? পারলে রাজনীতিকেও একটু ফোকাস করো'। তখন মনে হলো, ২১ তারিখের সমাবেশের পরেই যাই। 

২০ আগস্ট অর্থাৎ শুক্রবার সারাদিন চাচাতো ভাই আলমগীর ভাইয়ার সাথে দাবা খেলে কাটালাম। অনেক রাতে ঘুমানোর জন্য শনিবার অর্থাৎ ২১ আগস্ট বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠি। সম্মেলনে যেতে অনেক দেরী করলাম। ভাবলাম এতটুকু পথ হাঁটতে হাঁটতে চলে যাব। তাই হলো। আরামবাগ, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা মোড়ে দেখলাম অসংখ্য মানুষের ভীড়। আমি অলস মনে জিপিও'র দিকে মানুষের ভীড় ঠেলে এগুতে থাকলাম। কে বক্তব্য রাখছেন সে ব্যাপারে তখনো আমার কোনো কৌতুহল আসেনি, ইতিমধ্যে বিকাল ৫টার বেশি বাজতে চলেছে। আমার ইচ্ছে ছিল সামনে এগিয়ে যাওয়ার। মানুষের ভীড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছিলামও। কিন্তু হঠাৎ মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো! একের পর এক বিকট শব্দে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আশপাশ কেঁপে উঠলো। অসংখ্য মানুষ দিগ্বিদিক ছুটোছুটি করছে। প্রতিটি মানুষের জীবন বাঁচানোর সে কি হৃদয়বিদারী আর্তনাদী দৌড়। কী হচ্ছে কিছু না বুঝে অন্যদের মত নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য আমিও নিরাপদ গন্তব্যের অন্বেষায় ছুটতে থাকলাম। হয়তো পা ফসকে পড়ে গেলে হাজার হাজার মানুষের ভীড়ে পদদলিত হয়ে মরে যেতে পারতাম। আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া সেদিন ওই মৃত্যুকূপ পর্যন্ত যেতে পারিনি।

এরপর কোনমতে জান নিয়ে বাসায় এসে বিভিন্ন মিডিয়ার সূত্রধরে হামলার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি। সেদিন একটি বিষয় ভেবে সত্যিই অবাক হয়েছিলাম যে, এই  গভীর ষড়যন্ত্রের নায়কেরা ৭৫-এর ১৫ আগস্টের লক্ষ্যকে শতভাগ বাস্তবায়নের জন্য একটি দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দলের প্রধান, তথা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনাকে চিরতরে হত্যা করার নীলনকশাকে এতটা নির্মমভাবে সাজাতে পারে? তাও আবার সন্ত্রাস বিরোধী সমাবেশে এমন পৈশাচিক গ্রেনেড হামলা চালিয়ে! কোনো দলের নেতাকর্মীদের ওপর এমন নিন্দনীয় আঘাত এ জাতি কোনদিনই প্রত্যাশা করে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, হত্যার রাজনীতি কখনোই কারো পক্ষে প্রশংসা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে না। 

পরিশেষে, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। এই উক্তির অর্থ অনেক বড় ও ব্যাপক যা কোনো ক্ষুদ্রজ্ঞানে সহজে অনুমেয় নয়। তবে ৭১-এ আমরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে এদেশের স্বাধীনতার লাল-সূর্যটিকে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম মাত্র, কিন্তু আমাদের জাতীয় জীবনে সত্যিকার অর্থে এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত মুক্তির স্বাদ মেলেনি। কারণ ৭১-এর পরাজিত শক্তি এবং ৭৫-এর সংঘবদ্ধ কুচক্রীমহল একইসূত্রে গাথা। তারা এই দেশে আরেকটি ১৫ আগস্ট সৃষ্টির অদম্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেই। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে যার অন্যতম প্রমাণ বললে সত্যের অপলাপ হবে না। 

লেখক: এম এম মাহবুব হাসান,
ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক 

(এ বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)



মন্তব্য