kalerkantho


চালের বাজারে 'চালবাজি'!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২২ জুলাই, ২০১৮ ১২:০১



চালের বাজারে 'চালবাজি'!

কোন পণ্যের দাম বাড়লে বেশিই ভোগান্তির মুখে পড়ে দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে যাদের 'নুন আনতে পান্তা ফুরায়' তাদের কথা বলাই বাহুল্য। সেইসব দরিদ্র লাখো মানুষ এখন দু'মুঠো ভাতের যোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। আর এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন পত্রিকা, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে। 

খবরে বলা হচ্ছে, হঠাৎ করেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালের দাম বেড়েছে। ক্ষেত্র বিশেষ প্রতিকেজি চালের দাম বেড়েছে ৩ থেকে ৪ টাকা। সে হিসাবে ৫০ কেজির বস্তায় দাম বেড়েছে ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। মূলত চালের মজুত, সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও রহস্যজনক কারণে চালের দাম বাড়িয়েছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ি সিন্ডিকেট। চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ে পরিচালিত সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা সমূহের অনুসন্ধানেও এরকম চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তারা এও বলেছে, চাল নিয়ে অসাধু চক্র ‘চাল বাজি’ করছে।
 
সরকারি হিসাবে দেশে চালের ঘাটতি ১০ লাখ টন। আমদানি হয়েছে চাহিদার প্রায় ৬-৭ গুণ বেশি,  ৮২ লাখ টন। সরকারি হিসাবে গত বছরের বন্যায় প্রায় ১০ লাখ টন চালের উৎপাদন কম হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরে সব মিলিয়ে ৩৭ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। আরো ৪৫ লাখ টন রয়েছে আমদানির প্রক্রিয়ায়। আমদানি শুল্ক  প্রত্যাহার ও ব্যাংক ঋণের সুবিধা নিয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা চাল আমদানি করছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল-বন্যায় সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরে ফসলহানি ঘটে। প্রকৃতির এ রোষে এসব অঞ্চলে চাল উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওর, শনির হাওরসহ প্রধান প্রধান হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে এ বছর বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টন। পাহাড়ি ঢল আর বন্যায় প্রায় ৫ লাখ টন চাল উৎপাদন কম হয়েছে। একই কারণে নেত্রকোনায় উৎপাদন কম হয়েছে ৩ লাখ টন। কিশোরগঞ্জে চাল উৎপাদন কম হয়েছে আড়াই লাখ টন। অর্থাৎ তিন জেলায় উৎপাদন কমেছে সাড়ে ১০ লাখ টনের মতো। 
মৌলভীবাজারসহ আরো দুই-তিনটি জেলায় অকাল বন্যা-ঢলে ২ লাখ টনের মতো চাল উৎপাদন কম হয়েছে। কয়েকটি জেলায় এ বছর বোরো ধান উৎপাদন কমেছে ব্লাস্ট রোগের কারণে। আবার কোনো কোনো জেলায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি হয়েছে। যেমন- সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, পাবনাসহ বোরো ধান উৎপাদনের জন্য পরিচিত জেলাগুলোতে ফসলহানির খবর মেলেনি। বলা যায়, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনাসহ কয়েকটি জেলায় ১২ থেকে ১৩ লাখ টন চাল উৎপাদন কম হয়েছে। এটাই ঘাটতি। যে দেশে এক বছরে প্রায় ৪ কোটি টন চাল, গম ও ভুট্টা উৎপন্ন হয়, সে দেশে এই ঘাটতি চালের বাজারকে অস্থির করে তুলতে পারে না। এমনি অবস্থায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখে দ্রুত অসাধু চাল সিন্ডেকেটদের বিরুদ্ধে এবং তাদের গুদামে শিগগিরই অভিযানে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। অসাধু চক্র চালের অবৈধ মজুত গড়ে তোলা এবং খোলা বাজারে চালের সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

এ ছাড়াও এ বছর দেশে বাম্পার ফলন হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এ বছর চালের উৎপাদন ৪ কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে। অথচ চালের দাম বাড়ছে। দেশের কৃষক যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পায় সেজন্য ৩৮ টাকা কেজি দরে মোটা চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কৃষকরা সরকার নির্ধারিত ৩৮ টাকা কেজি দরেই সরকারি গুদামে চাল সরবরাহ করছেন। মফস্বলের বাজারগুলোয় মোটা চালের দর ৩৮ টাকার বেশি নয়। এ ছাড়াও সেখানে সব ধরনের চিকন চালের কেজি ৪৮ থেকে ৪৯ টাকার বেশি নয়। অথচ রাজধানীতে চালের বাজারের চিত্র মফস্বলের বাজারের তুলনায় পুরোপুরি বিপরীত। 
রাজধানীতে প্রতি কেজি চিকন (মিনিকেট) চালের দর এখন সর্বনিম্ন ৬২ থেকে ৬৬ টাকা। এ ছাড়াও ৬৫ থেকে ৬৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে নাজিরশাইল চাল।

গত ৭ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে চালের আমদানি শুল্ক ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আগের ২৮ শতাংশে উন্নীত করার পর থেকেই রাজধানীতে চালের দাম বাড়ছে। ঈদের পর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকট।  

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকার সবসময় বাজার নিয়ন্ত্রণে মোটা চালের ওপর গুরুত্ব দেয়। সরু বা চিকন চালের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারকে তেমন ভাবিয়ে তোলে না। এই সুযোগে অসৎ ব্যবসায়ীরা রাজধানীতেই সব সময় চালের দাম বাড়ায়। এ ছাড়াও রাজধানীতে মোটা চালের তুলনায় চিকন চালের বিক্রি বেশি। তাই দাম বৃদ্ধির পর তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। এক ধরনের হুলস্থূল শুরু হয়। প্রকৃতপক্ষে দেশের চালের বাজারে কোনো অস্থিরতা নাই। ৫৬ লাখ টন চাল আমদানি করা হলো ২ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিয়ে। সেই ৫৬ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা রহস্য। সরকারি মহল বলছে, দেশে ধান, চালের বাম্পার ফলনও হয়েছে। বাম্পার ফলনের মধ্যেও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে না আসাটাও রহস্যের জন্ম দিচ্ছে। আর এর জন্য যারা দায়ী তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

অথচ বিশ্ববাজারে চালের বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। গত তিন সপ্তাহের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে চালের দাম প্রতি টনে ৩৫ থেকে ৪০ ডলার কমে গেছে। বিশ্ববাজারে প্রতি টন চালের দাম এখন  ৪০০ ডলারের নিচে। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দেশে বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে প্রায় দুই কোটি টন। আমন উৎপাদন হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টন। চলতি মাস পর্যন্ত এক বছরে আমদানি করা হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ টন চাল। সোয়া তিন কোটি টন চাহিদার বিপরীতে দেশে বছর জুড়ে চাল ছিল প্রায় চার কোটি টন। চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি থাকার পরও দাম না কমে কেন বাড়ছে, তার কোনো সদুত্তর কারো কাছে নেই। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে,সরকার দেশের নিম্ন,মধ্যম আয়ের মানুষসহ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।   

লেখক: মোতাহার হোসেন, সাংবাদিক ও কলামিস্ট 

(এই বিভাগে প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, কালের কণ্ঠ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়)

 



মন্তব্য