kalerkantho


মিজারুল কায়েস : জন্মদিনে স্মরণ অনুষ্ঠানের আলোয়

আবদুল্লাহ আল মোহন    

২ এপ্রিল, ২০১৮ ১৯:৩৬



মিজারুল কায়েস : জন্মদিনে স্মরণ অনুষ্ঠানের আলোয়

আজ ২ এপ্রিল, অকাল প্রয়াত প্রিয় কায়েস ভাইয়ের জন্মদিন। মিজারুল কায়েস, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সুপ্রিয় ব্যক্তিত্ব কায়েস ভাই, আমাদের মাঝে ছিলেন, আছেন, থাকবেনও সবসময়- চেতনায়, জীবনের নানা ঘটনার মাঝে, স্মৃতির আলোকিত অঙ্গণে। অফুরাণ প্রাণবন্ত মানুষ, মানবিক মানুষ, মুক্তচিন্তার যুক্তিবাদী সাহসী মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের ও বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত চেতনায় ঋদ্ধ মানুষ, সুরুচির উৎকৃষ্ঠ মহাপ্রাণ, আপাদমস্তক বাঙালি তথা 'বিশ্ব মানব হবি যদি, কায়মনে বাঙালি হ, শ্বাশত বাঙালি হ'-বাণীর বিরল উদাহরণ, শিল্প চৈতন্যে 'নন্দন গুরু' কায়েস ভাইয়ের স্বজনদের সম্মিলনে এক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছিল ৩১ মার্চ, শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফেন্দিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে।

স্মরণানুষ্ঠানে মিজারুল কায়েসের সহধর্মিণী নাঈমা কায়েস, তাদের দুই কন্যা মানসী, মাধুরীসহ তার পরিবারের সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীরা উপস্থিত ছিলেন, আরো ছিলেন দেশের শিল্প-সংস্কৃতি জগতের বরেণ্য ব্যক্তিত্বরাও।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সভাপতিত্বে স্মরণসভায় স্মৃতিচারণায় অংশ নেন মিজারুল কায়েসের সহধর্মিণী নাঈমা কায়েসসহ নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, রাজশাহী কলেজের অধ্যাপক গোলাম কবির, মিজারুল কায়েসের সহোদর মেজর জেনারেল (অব.) ইমরুল কায়েস, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লন্ডন শাখার পরিচালক খাদিজা হালিম, মিজারুল কায়েসের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে আইএফসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার, শেখ আবদুল বাতেন, সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব কবি কামাল চৌধুরী, এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ, সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত মিজানুর রহমান প্রমুখ।

এই আয়োজনের আরেকটি বিশেষ পর্ব ছিল কেন্দ্রের চিত্রশালায় মিজারুল কায়েস সংগৃহীত উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মের সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনীর উদ্বোধন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বিভিন্ন শিল্পীর সৃজিত ছাপচিত্র ঠাঁই পায় প্রদর্শনীতে। স্মরণসভা শেষে কেন্দ্রের গ্যালারিতে আয়োজিত চিত্রকলা প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন অতিথিরা, যেখানে মিজারুল কায়েসের সংগ্রহে থাকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আঁকা বিভিন্ন শিল্পীর ছাপচিত্র স্থান পেয়েছে। এই আয়োজনটি নাঈমা কায়েস বলেন, 'এই এক্সিবিশনে আপনারা কায়েসকে খুঁজে বের করতে পারবেন। প্রত্যেক বছর তার শিল্পমনের এমন সব ভাবনা নিয়ে আমরা নানা আয়োজন করবো।'

আজ ২ এপ্রিল কায়েস ভাইয়ের জন্মদিন। ১৯৬০ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আর তিনি প্রয়াত হন ব্রাজিলের স্থানীয় সময় ২০১৭ সালের ১০ মার্চ সকালে। ব্রাজিলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত অবস্থায় ৫৬ বছর বয়সে অচেনালোকে চলে যান মিজারুল কায়েস। কিন্তু তিনি জীবন্ত হয়ে আছেন আমাদের স্মৃতিতে, জীবনে নানাভাবে। স্মরণ অনুষ্ঠানে বক্তাদের সবাই সাবেক পররাষ্ট্র সচিব, শিল্পবোদ্ধা-সমালোচক, 'নন্দনগুরু'  মিজারুল কায়েসের কূটনৈতিক, শৈল্পিক অবদানগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণের দাবি জানান। মিজারুল কায়েসের স্মৃতি সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগের জোর দাবি উপস্থাপন করেন কবি কামাল চৌধুরী, নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারসহ সবাই।

স্মরণ আয়োজনে স্মৃতিচারণাকালে কূটনীতি বা শিল্প-সাহিত্যের নানা উদ্যোগে সাবেক কূটনীতিক মিজারুল কায়েসের চিন্তাধারা কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তার সহধর্মিনী নাঈমা কায়েস বলেন, 'কায়েস সবসময় চিন্তা করত, হোয়াট ইজ পসিবল, হোয়াট ক্যান বি ডান। কখনো কারো বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ করতে পছন্দ করতেন না। সজ্জন মানুষটি সবসময় চাইতেন নতুন প্রজন্ম তার চিন্তাধারা ব্যবহার করবে। সবার কাছে অনুরোধ, আপনারা সবাই কায়েসের মূল্যবোধ ও চিন্তাধারা ব্যবহার করবেন, কাজে লাগাবেন।' পারিবারিক সম্পর্কের বাইরে মিজারুল কায়েস শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন বলেও জানান তিনি। ইসলামাবাদের মডেল স্কুল, ঢাকার রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুল, রাজশাহী কলেজ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন, সেসব কথাও শোনান নাঈমা কায়েস। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, কায়েসের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল সে সত্যিকারের একজন ভালো মানুষ ছিলে।' 

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সভাপতির বক্তব্যে অকালপ্রয়াত প্রিয় ছাত্র মিজারুল কায়েসকে ছেলের মর্যাদা দিতেন উল্লেখ করে বলেন, 'কায়েসের মধ্যে অমিত শক্তি ছিলে, ছিল একটি শিশুর মন। অপরিমেয় শক্তি থেকে উৎসারিত ছিল ওর সবার প্রতি অগাধ ভালোবাসা। কায়েসের অসীম প্রাণশক্তি ছিল যা বাঙালি জীবনে খুবই কম, ব্যতিক্রম। কায়েসের শূন্যতা আমি নীরবে বহন করছি। কায়েস চলে যায়নি, কায়েস আমাদের মাঝেই বেঁচে আছে, আমাদের জীবনের মধ্যেই আছে সে। কায়েস প্রয়াত কোনো মানুষ নয়, প্রচণ্ড রকম জীবন্ত মানুষ, যে মানুষ জীবন্ত পিপাসা নিয়ে সমগ্র পৃথিবীকে, জীবনকে খুঁজে বেরিয়েছে সে কখনো মৃত হতে পারে না। কায়েস তাই চিরদিনের হোক।' মিজারুল কায়েসের সহোদর মেজর জেনারেল (অব.) ইমরুল কায়েস আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, 'আমি গর্বিত বোধ করি কায়েসের অগ্রজ হিসেবে।' ছোটভাইয়ের 'ঘাউড়ামি'র নানা অজানা স্মৃতি উল্লেখ করে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, 'অসম্ভব মেধাবী কায়েস সব জিনিস সহনীয় করে নিতে পারতো।' 

আলোচনায় অংশ নিয়ে নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, 'কায়েসের মতো মেধাবী মানুষ আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। থিয়েটারের জন্য আমেরিকান নাটক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট'র অনুবাদ করেছিলেন কায়েস; 'মুক্তি' নামের নাটকটি মঞ্চস্থ করি আমরা। পরে নাটকটি লন্ডনেও মঞ্চস্থ হয়েছিল তার সহযোগিতায়। কথা ছিল আরো একটি নাটক তিনি অনুবাদ করবেন, তা আর হলো  না।' সরকারি চাকরিতে মিজারুল কায়েসের ব্যাচমেট সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব কবি কামাল চৌধুরী বলেন, 'কায়েস যা বলত, তা গভীর অবলোকনের চোখ দিয়ে দেখে তারপর বলত। বহুমাত্রিক মানুষটি পরিপার্শ্ব সম্পর্কে ভালোভাবে জানত। কূটনৈতিক দায়িত্বে বা শিল্প-সাহিত্যে তিনি তার মেধা, সৃজনের ছাপ রেখে গেছেন। তিনি যদি তাঁর কাজ নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন, তবে তা হতো বাংলাদেশের অসাধারণ সম্পদ।' 

মিজারুল কায়েসের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে আইএফসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার তাঁর স্মৃতিচারণাকালে অকালে প্রিয় বান্ধব হারানোর নানান স্মৃতিচিত্র তুলে ধরেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, 'সত্যিকার অর্থেই কায়েস ছিলেন বিশ্বমানব, তার মনন উৎকর্ষতা এতটাই সমৃদ্ধ ছিলেন যে তাঁর সঙ্গে আর কারোর তুলনা মেলা ভার। জীবনকে অট্টহাসি দিয়ে ভালোবাসতে জানতেন, অন্যদের জীবনানন্দে বাঁচতে উদ্দীপ্ত করতেন। কায়েস ভাইয়ের আরেক বন্ধু শেখ আবদুল বাতেন বলেন, 'কায়েস জীবনের সবকিছুতেই অসাধারণত্ব ধারণ করতেন, সেই বিশেষ গুণের অধিকারী ছিলেন।'  বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লন্ডন শাখার পরিচালক খাদিজা হালিম কায়েস ভাইয়ের লন্ডনের কেন্দ্র প্রীতির স্মৃতিচারণ করেন এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ইংরেজ কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর 'ড্যাফোডিল' কবিতা পাঠ করে শোনান।

বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা মিজারুল কায়েস ২০০৯ সালের ৮ জুলাই থেকে ২০১২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে রাষ্ট্রদূত পদে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ২০১২ সালে ৯ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে হাই কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, মালদ্বীপে হাই কমিশনার হিসেবে কাজ করেন। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মহাপরিচালক হিসেবে সার্ক, দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়া, অর্থনৈতিক বিষয়াবলী, আনক্লস ও বহিঃপ্রচার অনুবিভাগের দায়িত্বও পালন করেন। জাপান, জেনেভা, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের মিশনেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল কমিশনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

রবীন্দ্রপ্রেমী হিসেবে পরিচিত মিজারুল কায়েসের শিল্পকলা ও চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও চিত্র প্রদর্শনীতে বিচারকের ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সদস্য ছিলেন তিনি। মানিকগঞ্জের তেওতায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত জমিদারবাড়িতে তিনি নন্দন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার স্বপ্ন বুনেছিলেন। সেই স্বপ্নবীজের অংকুরিত মহীরুহ হয়ে ওঠার প্রত্যাশা করতেই পারি প্রিয় কায়েস ভাইয়ের জন্মদিনে আমরা। সেটাই হবে তাঁর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে বড় স্মৃতিচিত্রণ, প্রেমের জলছবি।

লেখক: আবদুল্লাহ আল মোহন
সহকারী অধ্যাপক
সরকারি ভাষাণটেক কলেজ, কাফরুল, ঢাকা 



মন্তব্য