kalerkantho


তখন অনেক কিছুই ছিল না তবে সবকিছুই ছিল

জিহাদুল কবির   

২৩ মার্চ, ২০১৮ ১৬:২৩



তখন অনেক কিছুই ছিল না তবে সবকিছুই ছিল

আজ থেকে ৩২-৩৭ বছর আগে আমাদের ছেলেবেলা। মূল লেখাটি আনিসুল হকের, কিছুটা নিজের মত করে সংযোজন বিয়োজন করে নিজ জীবনের সাথে মিলিয়ে নসটালজিক হয়েছি। 

১৯৮৩-১৯৯০ সালে আমি বাগেরহাটের Karapara SC high school এ পড়তাম। সেই সময় আমাদের কী ছিল, কী করতাম আমরা, তা-ই বলছি। আমাদের সময়ে যাঁরা বড় হয়েছেন, তাঁরা মিলিয়ে দেখতে পারেন আপনাদের অভিজ্ঞতা আমারটার সঙ্গে মিলে যায় কি না।

১. হেঁটে দল বেঁধে স্কুলে যেতাম। কোনো ব্যাগ ছিল না। বইখাতাগুলো এক হাতে পেটের সঙ্গে ঠেকিয়ে স্কুলে যেতাম। সারা রাস্তা হাতের ঘামে নিচের লম্বা খাতাটা ভিজে যেত। বৃষ্টির দিন বড় কচুপাতা ব্যবহার করতাম।

২. আমরা বাঁধাই করা খাতা কিনতাম না। দিস্তা ধরে কাগজ কিনতাম। কাগজ লাল-সাদা মোটা সুতা দিয়ে নিজেরা সেলাই করে খাতা বানাতাম। খাতা সেলাই করার জন্য একটা মোটা ভোঁমরা ছিল।

৩. আমাদের স্কুলে কোন uniform ছিল না। যেমন খুশি তেমন পোষাক পরতাম। স্যান্ডেল/ জুতা/ খালি পায়ে স্কুলে যেতাম।

৪. আমরা স্কুলে কোনো দিন টিফিন নিয়ে যেতাম না, টিফিন দেওয়াও হতো না। পিপাসা পেলে বুক দিয়ে টিউবওয়েলের হাতল চেপে কলের মুখে হাত চেপে ধরে পেট ভরে পানি খেতাম।

৫. স্কুলে পেশাব পেলে আমরা স্কুলভবনের পেছনে দেয়ালের ধারে বসে পড়তাম।

৬. দাঁত মাজতাম কয়লা /দাতন দিয়ে।

৭. ভিসিআর নামের একটা জিনিস এসেছিল। ভিসিআর ভাড়া করে কারও বাড়িতে এনে হিন্দি ছবি চাঁদা দিয়ে দেখা হতো ।

৮. কারোরই টেলিফোন ছিল না। টেলিভিশন ছিল ২/১ টা ।

৯. বাসায় অতিথি এলে আমরা দোকান থেকে কিনে আনা ছোট ছোট গোল গোল বিস্কুট আর চানাচুর খেতে দিতাম। মেহমান বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই বিস্কুট ও চানাচুরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম। কোনো কারণে মেহমান আবার ফিরে এলে দেখতে পেতেন, এতক্ষণ যে শিষ্ট বালকদের বারবার অনুরোধ-উপরোধ করেও খাওয়ানো যাচ্ছিল না, আসলে তারা ততটা সুবোধ নয়, কিংবা ক্ষুধামান্দ্যেও ভুগছে না।

১০. ছোট ভাই বা বোন কোনো দিন নতুন বই, নতুন কাপড় পেত না। বড় ভাইবোনের পুরোনো কাপড় ও বই তাদের পরতে/পড়তে হতো।

১১. রেডক্রস থেকে গুঁড়া দুধ আর সয়া বিস্কুট আসত স্কুলে। আমরা মাঝেমধ্যে পেতাম। গুঁড়া দুধ দলা দলা হয়ে থাকত। আমরা সেই দুধ হাতে নিয়ে জিব দিয়ে চেটে খেতাম। তালুতে দুধ আটকে যেত।

১২. আমাদের চপ্পল ছিঁড়ে গেলে মুচির কাছে নিয়ে গিয়ে সেলাই করে আনতাম। কখনো বা ল্যাম্পের আগুনে ধরে রাবার গলিয়ে নিজেরাই সারাতাম। আবার কখনো নিজেরাই দুটি ছোট পেরেক বা আলপিন মেরে নিয়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল মেরামত করতাম।

১৩. আমাদের বাইরের ঘরে চৌকির নিচে পেঁয়াজ থাকত, আলু থাকত।

১৪. খুদ ফেলা হতো না। কাজেই খুদের পায়েস, খুদের জাউ, খুদের বিরিয়ানি, বউখুদি-নানা ধরনের গালভারী নামের খাবার আমাদের মাঝেমধ্যেই খেতে হতো।

১৫. আমাদের কলমের পেটে কালি ভরতে হতো। কালির দোয়াত কেনা আমাদের একটা কাজ ছিল। তবে সবার লেখাপড়া শুরু হতো স্লেট-পেনসিলে কখনও তালপাতাতে কয়লা দিয়ে কালি বানিয়ে।

১৬. আমাদের অনেক বাচ্চাই মাথায় সর্ষের তেল মাখত। শ্যাম্পু জিনিসটা আমাদের শৈশবে ছিল না। তিব্বত সাবান ব্যবহার করলেও প্রতিবেশীরা ঈর্ষা করত।

১৭. আমাদের শৈশবে ৪ আনায় সিঙ্গেল পাঁপড়, ৪ আনায়/ আট আনায় লাল রঙের আইসক্রিম/দুধমালায় আইসক্রিম পাওয়া যেত।

তখন অনেক কিছুই ছিল না তবে সবকিছুই ছিল।

লেখক : পুলিশ সুপার, পাবনা 



মন্তব্য