kalerkantho


তেহারী, নেহারি আর রিমু ...

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

২০ মার্চ, ২০১৮ ১১:২০



তেহারী, নেহারি আর রিমু ...

১.
রিমু আর বিপাশার স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে দুই-দুইটি তেহারী ঘর। আমারও প্রিয়, ওদেরও প্রিয় ছিলো এই দু’টি তেহারী ঘরের রান্না খাবার। আমি কিংবা আমরা তিনজনের কেউই রসিক ভোজন বিলাসী ছিলাম না কিন্তু স্বল্পাহারও উপভোগ্য ছিলো আমাদের কাছে। আর তাই কলেজ জীবনে শুক্রবাদ বাসকালে সোবহানবাগ মসজিন সংলগ্ন তেহারী ঘরে যেমন খাওয়া শুরু করি রিমুর সাথে, তেমনি আসাদ এভিনিউতে আমার বসবাস এবং বিপাশার কর্মস্থল হওয়াতে বিনা আয়োজনে আকস্মিকভাবেই আমরা মোহাম্মদপুর টাউন হলের শওকত তেহারী ঘরে তেহারী খেয়েছি নিত্য সদানন্দে। কীভাবে ভুলি এই সব দিনের দুর্দান্ত স্মৃতির শিহরণগুলি!

২.
তেহারী খাওয়া তো আসলে ছিলো উপলক্ষ্য, মূল লক্ষ্যই ছিলো আমাদের সুন্দর সময় যাপন, জীবনানন্দ উপভোগ। ছিলো তুমুল আড্ডাবাজির আসর জমিয়ে খাওয়ার পাশাপাশি কে বিল দেবে তা নিয়ে কৃত্রিম ঝগড়া। আহারে মধুর স্মৃতিগুলো আমার! বড় অসহায় লাগে ভাবলেই অতীতের সেইসব দিন! আমরা তিনজনই চাকুরিজীবি ছিলাম বলে বিল দিতে কেউই কখনো অলসতা দেখাইনি, বরং কে আগে বিল দেবো সেটা নিয়েই প্রতিযোগিতা চলতো। অথচ মনে পড়ে ১৯৯০ সালের সময়কার কথা। তখন আমি আর রিমু দু’জনেই কলেজের ছাত্র। রিমু বাপের হোটেলে, আর আমি ভাই-ভাবির পরম স্নেহাশিষে শিক্ষাজীবন যাপন করছি। ফলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা আমাদের কারোর কাছেই তেমন থাকতো না। চুরি বিদ্যাতেও ছিলাম অনভ্যস্থ। তবে রাজু ভাইয়ের মতোন বড় ভাই থাকলে এবং তার পকেটে ভুল করে ধন-দৌলত ধূলো-বালির মতোন জমে, ফুলে থাকলে, ‘পকেট মারিং’ করে ধরা পড়লেও বিপত্তির আশংকা না থাকায় সুযোগ পেলেই রিমুর নেতৃত্বে ‘মারিং এন্ড ইটিং’ প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ কখনো হাতছাড়া করেছি বলে মনে পড়ে না। রিমু ভাই মাফ ‘কইরে’ দিয়েন কিন্তু!
৩.
মনে পড়ছে, শুক্রবাদ বাসস্ট্যান্ডে একটি হোটেল ছিলো, যেখানে এখন ‘পূর্ব-পশ্চিম’ বইয়ের দোকান, সেটার নিচে একটি খাবারের হোটেল ছিলো। কতদিন সকালে যে রিমুর ‘পকেট মারিং’ পয়সায় সেখানে নেহারি আর তন্দুরি রুটি পেয়াজ-মরিচ সহযোগে খেয়েছি পরম তৃপ্তি সহকারে, তার হিসেব রাখিনি। স্প্রাইট, ফানটা, বোরহানিও কম প্রিয় ছিলো না আমাদের । বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বইবিক্রিসহ ছোটছোট নানা কাজের কারণে আমার যৎসামান্য প্রাপ্তি থেকেও তেহারী কিংবা নেহারি ভোজন বিলাসে ব্যয় করতে কার্পণ্য করিনি কখনো। আর তখন আমাদের জাতীয় শ্লোগান হয়ে উঠেছিলো, বিদ্রোহীর প্যারোডি- ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির, হয় তেহারী নয়ত নেহারি, বুভুক্ষু অস্থির।’

৪.
কলেজ জীবনে আমরা পাশাপাশি বসবাস করতাম বলেই স্মৃতির মেঘমালা বেশি জমছে, ভাসছে মনের আকাশে আজ অজস্র। এবার একটু (ভালো)বাসার কথা উল্লেখ না করে পারছি না। আমার বাসার ঠিকানা ৮৯ লিখতে গিয়ে আমি ৮১ই লিখতাম বেশির ভাগ সময়ে। ৯ আর ১ লেখার মধ্যে তেমন তফাত খুঁজে পাওয়া যেতো না হাতের লেখার দক্ষতার (চতুরতার!) কৌশল গুণে। তাছাড়া রিমুদের নিজস্ব বাসা, স্থায়ী ঠিকানা। আমারটা ভবঘুরে অস্থায়ী আস্তানা। একবার ৮১ তো সেটা বদলে পাশেই ১৩ তল্লাবাগ কিংবা আবার ৯৫ শুক্রবাদ। তবে সবগুলোই ছিলো রিমুদের বাসার আশেপাশেই, ওদের বাসাকে ঘিরে। এভাবেই আবাসস্থল পরিবর্তন হতো বলে রিমুদের বাসার ঠিকানা ব্যবহার করাটা নিরাপদও ছিলো। আমার জরুরি কাগজপত্রসহ অগ্রণী ব্যাংকের হিসাবের ঠিকানাটি পর্যন্ত ওদের বাড়ির ঠিকানা দেওয়া। এক্ষেত্রে আরেক প্রিয় বন্ধু সুমন জাহিদের কৃতিত্ব আমার চেয়ে অনেক বেশি বলেই স্বীকার করি। রিমুর সাথে, ওদের পরিবারের সাথে আমার, আমাদের এমনই একাত্মতার, রক্তের বন্ধনহীন পরম আত্মীয়তার সুসম্পর্ক ছিলো। সেই রিমু সব ছিন্ন করে চলে যেতে পারে, সেটা মান যায়? আমি মানি না, না …..

আবদুল্লাহ আল মোহনের ফেসবুক থেকে



মন্তব্য