kalerkantho


স্বাধীনতা প্রশ্নে তিনটি উপধারা ছিল ছাত্রলীগে

মাজেদুর রহমান চাঁদ   

১৮ মার্চ, ২০১৮ ১৫:৩১



স্বাধীনতা প্রশ্নে তিনটি উপধারা ছিল ছাত্রলীগে

স্বাধীনতার কথাটা প্রকাশ্যে আসে ছাত্রলীগের মাধ্যমে, ১৯৬৪ সালের দিকে। বঙ্গবন্ধুর পরামর্শেই ছাত্রলীগ স্বাধীনতার ধারণা প্রচার শুরু করে। স্বাধীনতা প্রশ্নে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে তিনটি উপধারা ছিল : (১) ৬ দফার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পথে এগোনো; (২) নির্বাচন বর্জন করে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধমে স্বাধীনতা অর্জন এবং (৩) পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করা। নির্বাচন বর্জন করে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে ছিলেন সিরাজুল আলম খানের অনুসারীরা। পরবর্তীকালে তাঁরা সবাই শামিল হন জাসদে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন—এমন প্রত্যাশা নিয়ে অখণ্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী একটি ছোট গ্রুপও ছাত্রলীগে ছিল, আওয়ামী লীগে তো খন্দকার মোশতাকরা ছিলই। ৬ দফার মাধ্যমে জনগণের মাঝে ভিত গড়ে জনতার ম্যান্ডেট স্বাধীনতাসংগ্রামের দিকে এগোনোর পক্ষে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদসহ তাঁদের অনুসারীরা। আমি ছিলাম এঁদের সঙ্গে।

১৯৭১ সাল। আমি তখন ছাত্রলীগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা এবং নবাব আবদুল লতিফ হল শাখার ভিপি। ১ মার্চ অনার্স পরীক্ষা চলাকালীনই খবর ছড়িয়ে পড়ল, ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন। ছাত্ররা পরীক্ষা বাদ দিয়ে ‘কলম ছাড়ো, অস্ত্র ধরো—বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগান দিয়ে হল থেকে বেরিয়ে পড়ে। তারপর শহরে মিছিল বের হয় এবং মুসলিম লীগ নেতা আইনউদ্দিনের বাড়িতে হামলা চলে। রানীবাজার মোড়ে মিছিলে গুলি চালায় সেনাবাহিনী এবং চারজন শহীদ হন।

১৪ এপ্রিল রাজশাহীর চারঘাট হয়ে ভারতে চলে যাই। ওপারে মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি থানার সাগরপার গ্রামে থাকি চার-পাঁচ দিন। সেখান থেকে সাহেবনগরে এক পরিচিতজনের বাড়িতে আরো তিন দিন থাকি।  কলকাতা গিয়ে উঠি এএলএ হোস্টেলে। এমএলএ হোস্টেলে দেখি খুলনা থেকে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমএনএ মোহাম্মাদ মহসিনকে। তিনি আমাকে দেখে বলছিলেন, ‘তোমরা ছাত্ররা কি একখানা ত্যানা উড়িয়ে আমাদের বিপদে ফেললে। এখন এই কাঁকরযুক্ত চালের ভাত খেতে হচ্ছে।’ এই ব্যবসায়ী মোহাম্মাদ মহসিন আগরতলা মামলার আসামি ছিলেন, আবার বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রাজসাক্ষীও হয়েছিলেন। আগরতলা মামলাটি না চলার কারণে লোকটি পার পেয়ে যান এবং আওয়ামী লীগের মনোনয়নও পান।

কলকাতায় দেখা হয় আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে। তিনিই প্রথম খবর দেন ছাত্রলীগের কর্মীদের প্রশিক্ষণে যেতে হবে। মুজিব বাহিনী রাজশাহী অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান। সিরাজুল আলম খান জানতেন আমি তাঁর ধারার লোক নই। তাঁর সঙ্গে বিরোধ হলে ক্যাম্প ছাড়ি। ঘটনা বলি, রাজ্জাক ভাই আমাকে দ্রুত প্রশিক্ষণে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে বাহিনীসহ দেশে প্রবেশ করি সেপ্টেম্বর মাসে।

নওগাঁর আত্রাই এলাকায় তখন মুক্তিযোদ্ধা, মুজিব বাহিনী ও চীনাপন্থী পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির অহিদুর রহমানের গ্রুপসহ পাঁচ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা সক্রিয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আত্রাই নদী দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের একটি বড় গ্রুপ নৌকায় যাচ্ছিল। আমরা নদীর পার থেকে তাদের আক্রমণ করি। গুলিতে খান সেনাদের নৌকা ডুবে প্রায় অর্ধশত সেনার সলিল সমাধি ঘটে। এ ঘটনার পর পাকিস্তানি সেনারা চারদিক থেকে আমাদের ঘিরে ফেলে। আকাশ থেকে গুলি করতে থাকে। প্রবল আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধাদের সব কটি গ্রুপ আত্রাই নদীর পাড়ে জড়ো হতে থাকে। রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় না দেখে আমার সঙ্গে থাকা ওয়্যারলেস সেটে ভারতীয় ক্যাম্পে যোগাযোগ করে সাহায্য চাই। অল্প সময়ের মধ্যে ভারতীয় সেনারা সীমান্তে আক্রমণ করলে পাকিস্তানি সেনারা দ্রুত আমাদের ওপর আক্রমণ বাদ রেখে সীমান্তের দিকে চলে যায়। আমরা রক্ষা পাই। আমাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের আরেকটি যুদ্ধ হয় ভবানীগঞ্জে।

প্রথম দিকে চীনপন্থী আত্রাইয়ের অহিদুর রহমানরা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেও শেষের দিকে তারা ঘুরে দাঁড়ায়। অহিদুর রহমানের লোক কালু আমাকে ধরে নিয়ে আটকে রাখে। যে বাড়িতে ওরা আমাকে আটকে রেখেছিল ওই বাড়ির একটি ছেলে তখন মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণ নিয়ে কেবল ফিরেছে। সে আমাকে দেখে মুজিব বাহিনীর লোক হিসেবে চিনতে পারে। কারণ মুজিব বাহিনীর যোদ্ধাদের বিশেষ ধরনের একটি শার্ট দেওয়া হয়েছিল, শার্টে জলছাপ ছিল। ছেলেটি আমার কাছে মুজিব বাহিনীর কোড জানতে চায়। আমি কোড বলি ‘রুমিও আলফা হোসিও’। নিশ্চিত হওয়ার পর ছেলেটি আমাকে পালিয়ে আসতে সহযোগিতা করে। অহিদুর রহমানরা আমাদের আরো ২০ জন ছেলেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। যাহোক, সেখান থেকে আমি চলে আসি মান্দা থানার চকোলি গ্রামে। সেখান থেকে নিজ এলাকা বাগাতিপাড়ায় ক্যাম্প করি। এখানে মুজিব বাহিনীর আবদুর রাজ্জাক খান ক্যাম্প স্থাপনসহ যাবতীয় কাজে সহযোগিতা করে। ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাই।

লেখক : ১৯৭১ সালে ছাত্রলীগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতা। মুজিব বাহিনী রাজশাহী জেলা প্রধান

অনুলিখন : লায়েকুজ্জামান 



মন্তব্য