kalerkantho


প্রিয় সানজিদা হক বিপাশা, কোনোদিন ভাবিনি তোর জন্য কাঁদবো

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ মার্চ, ২০১৮ ২১:২৯



প্রিয় সানজিদা হক বিপাশা, কোনোদিন ভাবিনি তোর জন্য কাঁদবো

প্রিয় সানজিদা হক বিপাশা, কোনোদিন ভাবিনি তোর জন্য কাঁদবো। আজ (১২.৩.২০১৮) অফিসে কাঁদলাম সহকর্মীদের থেকে লুকিয়ে।

কাঠমাণ্ডুতে বিধ্বস্ত উড়োজাহাজযাত্রীদের তুইও একজন!- অন্তর্জাল সংবাদপত্রে তুইসহ তিনজনের এই ছবি-খবর দেখে আমি অসাড় হয়ে পড়েছিলাম; মোহাম্মদ খানকে দ্রুত ফোন করে জানলাম, ওই তিনজনের দুজন তোর বর আর সন্তান। তোর আর ছেলের খোঁজ মিলছে না! বর মারাত্মক আহতাবস্থায় হাসপাতালে! এরপর আর কথা বলতে পারিনি- বুক উথলে উঠল কান্না।

তোর সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেনি, বৈরিতাও হয়নি কোনোদিন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে-ক্লাসে দেখা হলে ‌'কেমন আছিস?', 'ভালো আছিস?', 'কী খবর?', ‌'ভালো থাকিস'- এমন কুশল-সমাচারই হতো বেশি। তবু আজ কত স্মৃতি ভিড় করছে মনে। সাহসী ছিলি তুই। তোর কপালের সূর্যজ্বলা টিপ ভালো লাগতো। ভোলবার নয় তোর হাসিমাখা মুখ। কোনো কোনো দিন লুকিয়ে দেখেছি তোর হাসি- নির্ভেজাল বলে। কোনোদিন তোকে অযথা রাগতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

সবশেষ তোর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লোকপ্রশাসন বিভাগের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শিক্ষার্থী পুনর্মিলনীতে। তোর কপালে সেই বিখ্যাত লালটিপ! সেই হাসি! তোর, আমার, শামিমা আক্তার খনা, মোহাম্মদ খান আর নওশিদের গায়ে লাল রঙের পোশাক! আমাদের সাথে হাসিমুখে আরো অনেক সহপাঠী- এই ছবিটি এখন ফেসবুকে ভাসছে, খনা শেয়ার করেছে (আরো অনেকেই বিভিন্ন ছবি শেয়ার করেছে, করছে)। ছবিটি আমাদের আনন্দিত করছে, কাঁদাচ্ছেও।

২.
যখন উড়ো্জাহাজটি ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ছিটকে পড়লো, তাতে আগুন ধরে গেল- তোর জীবনই শঙ্কায়, আহা, তবু হয়তো তুই তোর আরেক আত্মা- ছেলেকে রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলি।
গতকাল রাতে সংবাদপত্রে সর্বশেষ চোখ বুলালাম, দেখলাম, জীবিতদের তালিকায় তোরা নেই! আমি আরেকবার ভেঙে পড়লাম। কাল রাতে আমি একদম ঘুমাতে পারিনি-
তোর জন্য বুকে তীব্র ব্যথা, আমার সামনে বারবার ভেসে উঠছিল তোর ছবি।
দেশিনামপ্রীতি আছে আমার; তাই জানলাম যখন তোদের সন্তানের নাম ‌অনিরুদ্ধ, খুব খুশি হয়েছিলাম আমি। তোর ছেলে তোর মতোই ভুবনজয়ী হাসি পেয়েছিল।

কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তোদের- বিপাশা, শুভ্রা, ছন্দা, রোদেলা, নাহিদ আর আরেকজনের যেৌথ ছবি ফেসবুকে দেখে ভালো লাগছিল, ভাবছিলাম, এখনো তোদের বন্ধুত্ব ফুরায়নি!-
পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়।
ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।
আয় আর একটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়।
মোরা সুখের দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়।

এই স্মৃতি, এই ছবিগুলো- তোর পরিবারের বাইরে- হয়তোবা তোর এই বন্ধুদেরই আজ সবচে’ কাঁদাচ্ছে। সম্ভবত নাহিদের কানাডা চলে যাওয়া উপলক্ষে তোরা একসঙ্গে হয়েছিলি।

আমার রাগও হচ্ছিল ছবিগুলো দেখে, কেন হচ্ছিল তা জানাবো একদিন কড়া করে নাহিদকে।

অনেক বছর আগে একদিন মোহাম্মদপুর ডাকঘরের সামনে দিয়ে তুই হেঁটে যাচ্ছিল, আমিও ছিলাম ওই পথে। আমার কি যে হলো, কী এক সংকোচ ঘিরে ধরল আমাকে- আমি আড়ালে চলে গেলাম; আজ বড় আফসোস, কেন আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম না দুটো কথা তোর সাথে!

তোদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন, সিঙ্গাপুর সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরেছেন; সাবেক সহপাঠী-সহকর্মী-দেশবাসী শোকার্ত। হায়, কেন এমন অকাল মৃত্যু আসে!

ভালো থাকিস।

- রোকনুদ্দৌলাহ চালাষ (বালার্ক চালাষ)
২৮ ও ২৯ ফাল্গুন ১৪২৪। ১২ ও ১৩ মার্চ ২০১৮। ঢাকা।



মন্তব্য